ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির চিফ অব স্টাফ আন্দ্রি ইয়ারমাকের বাসায় তল্লাশি করেছে দেশটির দুর্নীতি দমন সংস্থা। জাতীয় দুর্নীতি দমন ব্যুরো (নাবু) জানিয়েছে, আদালতের অনুমোদন নিয়েই এ তল্লাশি চলছে এবং বিস্তারিত পরে জানানো হবে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।
ইয়ারমাক ও জেলেনস্কিকে কোনও অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়নি। তবে জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের দুর্নীতি কেলেঙ্কারি ছড়িয়ে পড়েছে, যা সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। ইয়ারমাক রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় কিয়েভের প্রধান আলোচক। সমালোচকদের চাপে তার পদ হুমকির মুখে।
৫৪ বছর বয়সী ইয়ারমাক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন যে নাবু এবং বিশেষ দুর্নীতি দমন প্রসিকিউটর অফিস (স্যাপ) তার বাসায় অভিযান চালাচ্ছে। তিনি বলেন, সংস্থাগুলো তার বাসায় পূর্ণ প্রবেশাধিকার পেয়েছে এবং তার আইনজীবীরা সেখানে আছেন।
তিনি তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তাকে কোনও মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে নাম উল্লেখ করা হয়নি।
তল্লাশির ঘটনাটি এসেছে অত্যন্ত অস্বস্তিকর সময়। সপ্তাহের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী সচিব ড্যান ড্রিসকল কিয়েভে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তত্ত্বাবধানে যুক্তরাষ্ট্র যে খসড়া শান্তি পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে, তার মধ্যেই মার্কিন কর্মকর্তারা আগামী সপ্তাহে মস্কোও যাবেন।
শান্তি পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান বিতর্কিত বিষয় হচ্ছে পূর্বাঞ্চলীয় ডনেস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণাধীন অংশ রাশিয়াকে হস্তান্তরের দাবি। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বৃহস্পতিবার বলেন, ইউক্রেন সেনারা না সরে গেলে আমরা তা সামরিক শক্তি দিয়ে অর্জন করব। সম্প্রতি কিছু ভূখণ্ড দখলকে সামনে রেখে তিনি দাবি করেন, রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রা প্রায় ঠেকানো অসম্ভব।
ইয়ারমাক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তার প্রভাবশালী ভূমিকা তুলে ধরেন। দ্য আটলান্টিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জেলেনস্কি যত দিন প্রেসিডেন্ট থাকবেন, ভূখণ্ড ছাড়ার প্রশ্নই আসে না। তিনি কোনও ভূখণ্ড হস্তান্তর করবেন না।
এদিকে মাসজুড়ে ইউক্রেনে চলমান ব্যাপক দুর্নীতি কেলেঙ্কারি সরকারের অবস্থান দুর্বল করে তুলেছে। জ্বালানি খাতে ১০ কোটি ডলার আত্মসাতের অভিযোগে শীর্ষ সরকারি ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। নাবু ও স্যাপ জানায়, রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো, বিশেষ করে পারমাণবিক শক্তি কোম্পানি এনারহোআটমকে কেন্দ্র করে ঘুষ ও প্রভাব বিস্তারের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তারা উদঘাটন করেছেন।
দেশে এ তদন্তকে স্বাগত জানানো হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইউক্রেনের আলোচনাস্থান ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দায়িত্বশীলরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে রুশ কর্মকর্তারা শান্তি আলোচনায় দুর্নীতির অভিযোগকে জোরালোভাবে সামনে তোলায় এই উদ্বেগ বেড়েছে। ইউক্রেন ইইউ-সদস্যপদ প্রার্থী এবং সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে তাদের দুর্নীতি দমন অঙ্গীকার নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়।
এর মধ্যে ইয়ারমাকের জনপ্রিয়তা তলানিতে। নিজের দলের এমপিসহ বিভিন্ন দলের আইনপ্রণেতারা তাকে বরখাস্তের দাবি তুলেছেন। সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ নাগরিক তার পদত্যাগ চান। ইতোমধ্যে একাধিক সন্দেহভাজন গ্রেফতার হয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে জনগণের ক্ষোভ তীব্র হয়েছে। রুশ হামলায় জ্বালানি অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় দেশজুড়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে মানুষকে।
বৃহস্পতিবারের সাক্ষাৎকারে ইয়ারমাক স্বীকার করেন, তার ওপর চাপ অসীম। তিনি বলেন, এ ঘটনা খুবই বড়। রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
এ কেলেঙ্কারিতে সম্পর্কিত না থাকলেও এবং সব অভিযোগ অস্বীকার করলেও তিনি নিজেকে এর প্রভাব থেকে দূরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।
ইতোমধ্যে জেলেনস্কি দুই মন্ত্রীকে বরখাস্ত করেছেন এবং তার এক সাবেক ব্যবসায়িক সহযোগী তিমুর মিনদিচ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। মিনদিচ ছিলেন কোয়ার্টাল ৯৫ স্টুডিওর সহ-মালিক। এই কোম্পানি থেকেই জেলেনস্কির অভিনয় জীবন শুরু হয়েছিল।