ইসরায়েলি দখলকৃত পশ্চিম তীরে এখন বসবাস করছেন প্রায় ২৭ লাখ ফিলিস্তিনি। দীর্ঘদিন ধরে এ ভূখণ্ডকে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কেন্দ্রে পরিণত করার স্বপ্ন দেখা হয়েছে, যা গাজার সঙ্গে মিলিয়ে দুই রাষ্ট্র সমাধানের ভিত্তি গড়তে পারে। কিন্তু কয়েক দশক ধরে বসতি সম্প্রসারণ, নতুন সড়ক নির্মাণ, সামরিক ঘাঁটি ও নিয়মিত সহিংসতার কারণে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ দিন দিন অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক মহলের অধিকাংশ দেশ এখনও দুই রাষ্ট্র সমাধানকে সমর্থন করলেও বাস্তবে পশ্চিম তীরের ভূরাজনীতি অন্যদিকে এগোচ্ছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68d17e3aad849" ) );
বসতি নির্মাণের গতি ও ইসরায়েলি সরকারের ভূমিকা
১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে পশ্চিম তীরে বসতি গড়ে তোলা শুরু করে ইসরায়েল। তারপর থেকে প্রায় পাঁচ লাখ ইসরায়েলি স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস শুরু করেছেন। এসব বসতি শুধু সংখ্যা নয়, আয়তনেও ক্রমেই বেড়েছে। বর্তমান ইসরায়েলি জোট সরকারকে ইতিহাসের সবচেয়ে সেটলারপন্থি বা বসতি-সমর্থক সরকার হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন এ সরকার সম্প্রতি বিতর্কিত ই-ওয়ান পরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছে। এটি কার্যকর হলে পশ্চিম তীর কার্যত দুই ভাগ হয়ে যাবে এবং পূর্ব জেরুজালেমকে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে দাবি করার সুযোগ হারিয়ে যাবে।
ফিলিস্তিনি সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এ পরিকল্পনার কারণে প্রায় ২ হাজার ৫০০ বেদুইন বাস্তুচ্যুত হবেন। পাশাপাশি নতুন সড়ক নির্মাণ তাদের নিকটবর্তী শহর আল-আইজারিয়া থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে।
জমি হারানো থেকে চলাফেরায় বাধা
পশ্চিম তীরের সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জন্য বসতি সম্প্রসারণ শুধু রাজনৈতিক ইস্যু নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনের অংশ। অনেকে আর তাদের আদি জমিতে যেতে পারেন না। ৮০ বছর বয়সী তারেক শিহাদে বলেন, তিনি একসময় জমিতে জলপাই গাছের যত্ন নিতেন, পশুপালন করতেন। কিন্তু গত দশ বছর ধরে সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীরা পরিবারটিকে জমিতে যেতে বাধা দিচ্ছে। তার ১৭ বছর বয়সী নাতি একই ভূমি থেকে বঞ্চিত হয়ে বড় হচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থা বিটসেলেম বলেছে, পশ্চিম তীরের গ্রামগুলোতে কৃষকদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অভিযোগ করেছে, ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী প্রায়ই প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
আইনের বৈষম্য: একই ভূখণ্ডে দুই ধরনের বাস্তবতা
পশ্চিম তীরের এরিয়া সি, যা পুরো পশ্চিম তীরের প্রায় ৬০ শতাংশ, সম্পূর্ণ ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে। এখানে কোনও বাড়িঘর নির্মাণ বা উন্নয়ন কাজের জন্য ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়, অথচ অনুমোদন প্রায় কখনোই দেওয়া হয় না। অন্যদিকে, একই জমিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ঘোষণা করে সেখানে বসতি স্থাপনকারীদের জন্য নতুন আবাসন প্রকল্প চালু করা হয়।
একই ভূখণ্ডে বসবাস করলেও ফিলিস্তিনিদের ওপর সামরিক আইন প্রযোজ্য, আর ইসরায়েলি নাগরিকেরা উপভোগ করেন পূর্ণ নাগরিক অধিকার। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, এটি এক ধরনের বৈষম্যমূলক দ্বৈত আইনব্যবস্থা, যেখানে একই এলাকায় দুই জনগোষ্ঠীর জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা বিদ্যমান।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68d17e3aad888" ) );
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও নতুন স্বীকৃতির ঢেউ
গাজায় সামরিক অভিযানের কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও পর্তুগাল আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারসেন আগাবেকিয়ান শাহিন একে ‘অপরিবর্তনীয় পদক্ষেপ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে এ পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ইসরায়েলের জন্য ‘নিরাপত্তা হুমকি’। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও একই সুরে মন্তব্য করেছেন।
জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত এ বছরের জুলাইয়ে রায় দিয়ে বলেছে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখল অবৈধ এবং বসতি দ্রুত প্রত্যাহার করা উচিত। কিন্তু ইসরায়েলি সরকার নিজের অবস্থান ও নীতির কোনও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়নি।
দেয়াল, সড়ক ও চেকপোস্ট: ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কৌশল
২০০০-২০০৫ সালের মধ্যে ইসরায়েল পশ্চিম তীরজুড়ে কংক্রিটের দেয়াল ও কাঁটাতারের বেড়া তৈরি করে। নিরাপত্তার অজুহাতে নির্মিত এ বাধাগুলো ফিলিস্তিনিদের অনেক শহর ও গ্রামকে বিচ্ছিন্ন করেছে। পাশাপাশি নতুন মহাসড়ক কেবল ইসরায়েলি নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত, ফলে ফিলিস্তিনিদের যাতায়াত আরও জটিল হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা ওসিএইচএ বলেছে, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে পশ্চিম তীরে চলাচলে অন্তত ৮৫০টি পৃথক বাধা রয়েছে চেকপোস্ট, গেট ও সড়ক অবরোধ মিলিয়ে। যুদ্ধ শুরুর আগে এই সংখ্যা ছিল ৫৬৫।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68d17e3aad8b4" ) );
সহিংসতা ও মানবিক সংকটের নতুন চক্র
২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পর থেকে গাজায় যুদ্ধের পাশাপাশি ইসরায়েল পশ্চিম তীরে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে, বিশেষ করে শরণার্থী শিবিরগুলোতে। এতে আবারও হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ১৯৪৮ সালের পর তৈরি হওয়া অনেক শিবির এখন ঘনবসতিপূর্ণ নগরে পরিণত হয়েছে এবং সেগুলোই দমননীতির নতুন লক্ষ্যবস্তু।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেছেন, এসব অভিযানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হুমকি কমানো হয়েছে। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এ অভিযানে অসংখ্য বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ইতিহাস
১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের বিভাজন পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের জন্য নির্ধারিত ভূমির বড় অংশ যুদ্ধে হারিয়ে যায়। ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল পশ্চিম তীর ও গাজা দখল করে। এরপর শুরু হয় বসতি নির্মাণ। ১৯৯০-এর দশকের ওসলো চুক্তি পশ্চিম তীরের নিয়ন্ত্রণ সাময়িকভাবে ভাগ করার কথা বললেও বাস্তবে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ স্থায়ী হয়েছে।
আজকের পশ্চিম তীর তাই এক জটিল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি—একদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি ও প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে বসতি সম্প্রসারণ ও বাস্তবভিত্তিক দখলনীতি।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এখনও মনে করে, দুই রাষ্ট্র সমাধানই একমাত্র কার্যকর পথ। জরিপ বলছে, ফিলিস্তিনিরা এখনও এ সমাধানকে সমর্থন করেন। তবে ইসরায়েলের বসতি নীতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই সমাধানের সুযোগ প্রতিদিনই ক্ষীণ হচ্ছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, পশ্চিম তীরের নতুন বসতি, বিচ্ছিন্ন গ্রাম ও শহর, কঠোর চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং আইনগত বৈষম্য মিলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।