গাজায় যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে ইসরায়েল ও হামাস সম্মত হয়েছে। এর আগে মিসরে তিন দিন ধরে তীব্র পরোক্ষ আলোচনার পর যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘এর মানে হলো, খুব শিগগির সব জিম্মি মুক্তি পাবেন, আর ইসরায়েল তাদের সেনাদের এক সমঝোতাকৃত সীমারেখায় ফিরিয়ে আনবে। এটি একটি শক্তিশালী, টেকসই ও চিরস্থায়ী শান্তির প্রথম ধাপ।’ তবে তিনি এই প্রথম ধাপের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পরিকল্পনার প্রথম ধাপ অনুমোদনের জন্য বৈঠকে বসবে। এরপর পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভাও ভোট দেবে।
কী কী বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে
ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি অনুমোদন করলে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। ইসরায়েলি গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, এটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হতে পারে। যদিও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, অনুমোদনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধবিরতি শুরু হবে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, তারা এমনভাবে পিছু হটবে, যাতে গাজার প্রায় ৫৩ শতাংশ অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। হোয়াইট হাউজ গত সপ্তাহে যে মানচিত্র প্রকাশ করেছে, সেটি অনুযায়ী এটি ইসরায়েলি প্রত্যাহারের তিন ধাপের প্রথম ধাপ।
এরপর ৭২ ঘণ্টার কাউন্টডাউন শুরু হবে, যার মধ্যে হামাসকে জীবিত থাকা ২০ জিম্মিকে মুক্তি দিতে হবে। পরে ২৮ জন মৃত জিম্মির মরদেহ ফেরত দেওয়া হবে। যদিও এতে কত সময় লাগবে তা পরিষ্কার নয়।
এর বিনিময়ে ইসরায়েল কারাদণ্ডপ্রাপ্ত প্রায় ২৫০ জন ফিলিস্তিনি আজীবন বন্দি ও গাজা থেকে আটক ১,৭০০ জনকে মুক্তি দেবে বলে এক ফিলিস্তিনি সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে। তাদের পরিচয় এখনও স্পষ্ট নয়। তবে হামাস যে তালিকা দিয়েছে তাতে ইসরায়েলিদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার দায়ে বহুবার আজীবন সাজাপ্রাপ্ত কয়েকজন উচ্চপ্রোফাইল বন্দিও রয়েছেন।
ইসরায়েলি মুখপাত্রের মতে, সবচেয়ে আলোচিত বন্দিদের একজন, মারওয়ান বারঘুতি এই বিনিময়ে মুক্তি পাচ্ছেন না।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি ইসরায়েলি জিম্মির মরদেহের বিনিময়ে ইসরায়েল ১৫ জন গাজাবাসীর মরদেহ ফেরত দেবে।
জাতিসংঘ-সমর্থিত বিশেষজ্ঞদের দ্বারা আগস্টে নিশ্চিত হওয়া দুর্ভিক্ষের মুখে থাকা গাজায় শত শত ট্রাক মানবিক সহায়তা নিয়ে প্রবেশ করবে।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68e7f5a0d7b63" ) );
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক সহায়তা পৌঁছানো হবে। তবে ফিলিস্তিনি সূত্র জানায়, প্রথমদিকে প্রতিদিন অন্তত ৪০০ ট্রাক প্রবেশ করবে, যা ধীরে ধীরে বাড়বে।
এরপর কী হবে
যদি প্রথম ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তাহলে ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপগুলোর বিস্তারিত নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। যদিও এই ধাপগুলোর বেশ কিছু বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।
পূর্ণ প্রস্তাবে বলা হয়েছে, যদি দুই পক্ষই এতে একমত হয়, তবে যুদ্ধ ‘তাৎক্ষণিকভাবে শেষ হবে।’
প্রস্তাব অনুযায়ী, গাজাকে নিরস্ত্র করা হবে এবং সব সামরিক, সন্ত্রাসী ও আক্রমণাত্মক অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে।
এতে আরও বলা হয়েছে, গাজা একটি অস্থায়ী প্রশাসনিক কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হবে, যা ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদদের সমন্বয়ে গঠিত হবে এবং ‘বোর্ড অব পিস’ নামে একটি তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা এর তদারকি করবে। এই বোর্ডের নেতৃত্বে থাকবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং এতে যুক্ত থাকবেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার।
পরবর্তীতে গাজার প্রশাসন হস্তান্তর করা হবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে, যখন সেটি সংস্কার সম্পন্ন করবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, হামাস গাজার শাসনে কোনোভাবেই ভবিষ্যতে জড়িত থাকবে না—না সরাসরি, না পরোক্ষভাবে।
যেসব হামাস সদস্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে রাজি হবে, তাদের সাধারণ ক্ষমা দেওয়া হবে। অন্যরা চাইলে নিরাপদে অন্য দেশে যেতে পারবে। কোনও ফিলিস্তিনিকে জোর করে গাজা ছাড়তে বাধ্য করা হবে না। তবে যারা যেতে চাইবে, তারা পরবর্তীতে ফিরে আসতে পারবে।
একটি ‘ট্রাম্প অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা’ গঠন করা হবে, যাতে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে গাজা পুনর্গঠন ও অর্থনীতি সচল করার কাজ হবে।
পরবর্তী ধাপগুলোতে জটিলতা কোথায়
তবে পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে বহু মতবিরোধ দেখা দিতে পারে।
হামাস আগে জানিয়েছে, তারা অস্ত্র সমর্পণ করবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
গত সপ্তাহান্তে পরিকল্পনার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় হামাস নিরস্ত্রীকরণের কথা উল্লেখ করেনি, যা ইঙ্গিত দেয় তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।
এদিকে ইসরায়েল পরিকল্পনাটি পূর্ণাঙ্গভাবে মেনে নিলেও, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা শাসনে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কোনও ভূমিকা থাকবে না।
হামাসও বলেছে, তারা ‘একতাবদ্ধ ফিলিস্তিনি আন্দোলনের’ অংশ হিসেবে গাজার ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে ভূমিকা আশা করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের মাত্রা। ইসরায়েল বলেছে, প্রথম ধাপে তারা গাজার প্রায় ৫৩ শতাংশ অংশে নিয়ন্ত্রণ রাখবে। হোয়াইট হাউজের পরিকল্পনায় পরবর্তী পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ কমে ৪০ শতাংশ এবং তারপর ১৫ শতাংশে নামার কথা বলা হয়েছে।
শেষ ধাপ হবে একটি ‘নিরাপত্তা বলয়’ যা ‘যতক্ষণ না গাজা পুনরায় কোনও সন্ত্রাসী হুমকি থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়’ ততক্ষণ বজায় থাকবে।
এই অংশের ভাষা অস্পষ্ট এবং পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হয়নি—যা নিয়ে হামাস অবশ্যই স্পষ্টতা চাইবে।
সূত্র: বিবিসি