প্যারিসের, শার্ল দ্য গোল বিমান বন্দর থেকে বেরিয়ে টের পেলাম ইউরোপের ঠান্ডা কেমন। বাংলাদেশের কনকনে শীত নয়। তার চেয়ে অনেক বেশি। গা হিম হয়ে যাওয়ার উপক্রম। এই প্রথম আমার ইউরোপ আসা। ঠান্ডার কথা ভেবেই ঢাকার নিউমার্কেট থেকে একটা জ্যাকেট কিনেছিলাম। সেটি গায়ে জড়িয়ে এসেছি। কিন্তু এমন গায়ে হুল ফোটানো ঠান্ডায় জ্যাকেটটি যেন তার নামের কার্যকারিতাই হারিয়েছে। শার্ল দ্য গোল বিমান বন্দরের আন্ডার গ্রাউন্ডেই মেট্রো স্টেশন। টিকিট কেটে ট্রেন খুঁজে পেতে, কিছুটা বেগ পেতে হলো। আমাদের মেট্রো ট্রেনের মতোই। ট্রেনটির থামার স্টেশনগুলো শো করছে স্ক্রিনে।
ট্রেন চলছে। প্যারিসের সকাল সাতটা। হঠাৎ মিউজিকের শব্দ কানে এলো। দেখলাম গেটের কাছেই একজন চল্লিশোর্ধ্ব পুরুষ মিউজিকের তালে তালে গান শুরু করেছে। পুরুষটির গানের প্রত্যুত্তরে একজন কুড়ি পেরোনো সোনালি চুলের মেয়ে গান করছে। আমাদের দেশের পালা গানের মতোই। একজন থামলে অন্যজন গায়। মিউজিক চলছে। কয়েকটি স্টেশন পেরোলো ট্রেন। কিছু যাত্রী নামল আর কিছু উঠল। সুন্দর পরিষ্কার জামা-জুতোয় এমন গানের সাওয়ারি আমার আগে দেখা হয়নি। গান থামল। পুরুষ লোকটি মিউজিক বন্ধ করে একটি টিনের কৌটা—আমাদের দেশের কনডেন্স মিল্কের কৌটা যেমনটি হয়—নিয়ে যাত্রীদের সম্মুখে ঘুরছে। অনেকেই ডোনেট করল। আমার কাছে এলে পকেটে থাকা—ট্রেনের টিকিট কেনার সময় কিছু কয়েন আমাকে ফেরত দিয়েছিল—কয়েনগুলো সব গায়কের কৌটায় দিয়ে দিলাম। কয়েনগুলো কত ইউরো বা সেন্ট তা আমার ধারণা ছিল না। তবে গায়ক লোকটির চেহারা দেখে মনে হলো সে একসাথে অনেক কয়েন পেয়ে খুশি হয়েছে। ইউরোপের দেশগুলো এশিয়া-আফ্রিকার অনেক দেশকে খয়রাতির দেশ মনে করে থাকে। প্রথম ইউরোপ এসে খয়রাত দিতে পেরে আমারও বেশ ভালো লাগল।
হোটেল পোরটে দ্য ভারসেলেসে পৌঁছে লিফটে ঢুকে বেশ অবাক হতে হলো। এত ছোট্ট লিফট এই প্রথম দেখলাম। তিনজন গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়ালে ও স্বাস-প্রশ্বাসের কাজটি উপর দিকে সম্পন্ন করতে হবে। যাহোক আমার জন্য বারাদ্দকৃত কক্ষটি বেশ পরিপাটি। কোনো নতুন দেশে গেলে হোটেল উঠে ফ্রেশ হয়ে আশপাশটা দেখার জন্য আমি বেরিয়ে পড়ি। প্যারিসেও তাই হলো। হোটেলের কাছেই সীন নদী। হাঁটা পথ। সীন নদীর উপর ব্রিজ পেরিয়ে একটি ডিপার্টমেন্টাল শপ থেকে কিছু কেনাকাটা করে হোটেলের রিসিপশনে ফিরেই দেখি কথাসাহিত্যিক ও অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে। হোটেলের নিয়ম কার্য সারছেন। বলে রাখি—সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার এবং আমি পেন ইন্টারন্যাশনাল-এর রাইটার্স ফর পিস কমিটির তিন দিনব্যাপী কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার জন্য প্যারিসে এসেছি। লন্ডনে স্যারের ছেলে থাকেন। তাই স্যার বাংলাদেশ থেকে লন্ডন হয়ে ট্রেনে প্যারিস এলেন। আর আমি ইস্তাম্বুল হয়ে প্যারিসে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার পেন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট এবং আমি সেক্রেটারি জেনারেল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিনিধিরা এসেছেন। আমার ফ্লোরেই পাশের কক্ষটি স্যারের জন্য বরাদ্দ ছিল। লাগেজ নিয়ে সেই ছোট্ট লিফটে স্যারকে কক্ষে নিয়ে গেলাম। মনজুর স্যার বললেন—‘আমি ফ্রেশ হয়ে নিই। আমাদের প্রোগ্রাম তো বিকেলে, গুগলে দেখলাম কাছেই আইফেল টাওয়ার চলো ঘুরে আসি। ফেরার পথে লাঞ্চও সেরে নিলাম।’
স্যারের কথামতো সায় দিলাম। কিছুটা সময় পর স্যার বেরোনোর জন্য ইন্টারকমে ফোন দিলেন। আমি বেরিয়ে স্যারের কক্ষের দরজায় গিয়ে টোকা দিলাম। স্যার বেরিয়ে এলেন। আমার গায়ে জ্যাকেট দেখে বললেন—এত ঠান্ডায় পাতলা জ্যাকেট গায়ে তুমি বেরোবে কী করে? আর কিছু আনোনি?
বললাম—‘স্যার কোট এনেছি। ওটা কনফারেন্সে যাওয়ার জন্য আলাদা করে রেখেছি।’ তৎক্ষণাৎ স্যার নিজের জ্যাকেট ও মাফলার এনে আমার হাতে দিলেন। বললেন—‘ধরো, এগুলো পড়ে নাও। লন্ডেনে আমার এক ছাত্র আমাকে একটি ওভার কোট দিয়েছেন। ওটা বেশ আরাম।’
মনজুর স্যার তাঁর জ্যাকেট ও মাফলার আমার দিকে এগিয়ে দিলেও আমি নিতে সংকোচ করছিলাম। অতপর স্যার জোর করেই আমার হাতে দিয়ে বললেন—‘যাও চেঞ্জ করে আসো।’
স্যারের জ্যাকেট ও মাফলার নিয়ে নিজের কক্ষে এলাম। চেঞ্জ করতে বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান অধ্যাপক, কথাসাহিত্যিক এবং পণ্ডিত ব্যক্তি। তাঁর গায়ের জামা আমি গায়ে দেবো, এটা কী করে হয়। কিন্তু এমন ঠান্ডার এই দেশে নিজেকে বাঁচাতে হলে গায়ে জড়াতেই হবে। যাক, আমার পাতলা জ্যাকেট রেখে স্যারের জ্যাকেট গায়ে জড়িয়ে স্কুল জীবনে পঠিত সেই সুখী মানুষের গল্পটি মনে পড়ে গেল—
গল্পটি অনেকটা এমন। এক রাজার খুব অসুখ হয়। দেশের নামকরা বদ্যি-কবিরাজের ঔষধেও রোগ সারল না। তখন এক দরবেশ এসে রাজাকে বললেন—‘তিনি যদি একজন সুখী মানুষের গায়ের জামা নিজের গায়ে জড়াতে পারেন তাহলে তাঁর রোগ সেরে যাবে।’ দরবেশের যেমন পরামর্শ, রাজা তাঁর উজির-নাজিরকে আদেশ করলেন একজন সুখী মানুষের গায়ের জামা খুঁজে আনতে।
উজির-নাজির পুরো রাজ্যে খুঁজেও কোনো সুখী মানুষ পেলেন না। অতঃপর অনেক খোঁজাখুঁজির পর বনের মধ্যে একজন কাঠুরিয়াকে পাওয়া গেল যে কাঠ কেটেই সুখী। তার একটিমাত্র জামা। সেই জামাটি অনেক মোহরের বিনিময়ে রাজার জন্য নেয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলো।
একজন সুখী মানুষের জামা গায়ে দিয়ে যদি অসুস্থ মানুষ সুখী হতে পারে তাহলে একজন পণ্ডিত ব্যক্তির জামা গায়ে জড়িয়ে আমিও পণ্ডিত হতে পারি। এমন ভাবনায় আনমনে হাসলাম মনজুর স্যারের জ্যাকেট গায়ে জড়িয়ে নিলাম। হোটেল থেকে বেরিয়েই স্যার দেখতে পেলেন যে আমার মাথা ঢাকার কিছু নেই। মাফলার গলায় প্যাঁচানো। হোটেলের পাশেই একটি দোকানে ঢুকে পড়লেন স্যার। বললেন—‘একটা ক্যাপ কিনে নাও। না হয় ঠান্ডা বাতাসে হাঁটতে পারবে না।’
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68fc4ff3a3a9d" ) ); ক্যাপের গায়ে পঁচিশ ইউরো ট্যাগ দেখে আমি রীতিমতো ভড়কে গেলাম। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় পঁচিশ শ’ টাকা। যে ক্যাপ বাংলাদেশে মাত্র এক-দেড় শ’ টাকায় পাওয়া যায়। আমার গড়িমসি দেখে স্যার বুঝতে পারলেন বাংলাদেশের টাকার সাথে ইউরো তুলনা করে আমি ক্যাপ কিনতে চাইছিনা। স্যার বললেন—‘আরে কিনে নাও। টাকার কথা ভাবলে ঠান্ডায় মারা যাবে।’
অতঃপর ক্যাপটি কেনা হলো। সেই ক্যাপটি এখনো আমার কাছে সযতনে আছে।
তারপর সীন নদীর তীর ধরে দু’জনে হাঁটছি। ছবি তুলছি। আমি স্যারের ছবি তুলছি। স্যার আমার ছবি তুলছেন। সীন নদীর উপর ব্রিজে দাঁড়িয়ে যখন আমরা একে অন্যের ছবি তুলছিলাম তখন একটি মজার ঘটনা ঘটলো। পথচারী উনিশ-কুড়ি বছরের একটি মেয়ে দাঁড়ালো। আমাদের দু’জনকে একসাথে দাঁড়াতে বলে আমার মোবাইল নিয়ে আমাদের দু’জনের একসাথে বেশকয়েকটি ছবি তুলে দিল। স্যার ও আমি দু’জনেই খুব খুশি হলাম। কারণ সেলফি ছাড়া আমাদের দু’জনের সুন্দর ছবি তুলতে পারছিলাম না। প্যারিসের মেয়েটির উপলব্ধি দেখে আমরা অবাক হলাম। ফিরে যাওয়ার সময় ধন্যবাদ দিলাম।
সীন নদীর তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমরা স্ট্যাচু অফ লিবার্টির রেপ্লিকার সামনে এসে দাঁড়ালাম। ছবি তুললাম। আসল স্ট্যাচু অব লিবার্টি নিউইয়র্কের লিবার্টি আইল্যান্ডে হাডসন নদীর তীরে অবস্থিত। এটি একটি বিশাল নিওক্লাসিক্যাল ভাস্কর্য যা ফ্রান্স ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রেকে উপহার হিসেবে দিয়েছিল। আর সীন নদীর মাঝখানে অবস্থিত স্ট্যাচু অফ লিবার্টির রেপ্লিকা ১৮৮৯ সালে আমেরিকানরা ফরাসি বিপ্লবের শতবর্ষ পূর্তিতে ফ্রান্সকে উপহার দিয়েছিল।
স্ট্যাচু অফ লিবার্টির রেপলিকাটি আইফেল টাওয়ারের কাছেই। ইতোমধ্যে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি বাতাস ঠান্ডা বাড়িয়েছে। মনজুর স্যার ও আমি আইফেল টাওয়ারের চারপাশ হাঁটলাম। ছবি তুললাম। এখানে অনেক দর্শনার্থী। কিন্তু দয়ালু মেয়েটার মতো কেউ আমাদের ছবি তুলে দিল না। আমি মনজুর স্যারের ছবি তুলছি। তাতে কোনো সমস্যা নাই কিন্তু স্যারের মতো একজন পণ্ডিত, খ্যাতিমান মানুষ হাঁটু গেড়ে, বিভিন্ন অ্যাংগেলে আমার ছবি তুলছেন এটি আমার কাছে অস্বস্তিকর মনে হচ্ছিল। তারপর স্যার বললেন—‘বেশ ঠান্ডা লাগছে। চলো কফি খাই।’ কাছেই রেস্টুরেন্ট ছিল। দু’জন গেলাম। মগভর্তি চমৎকার কফি খেলাম।
পেন ইন্টারন্যাশনাল-এর রাইটার্স ফর পিস কমিটির কনফারেন্সে মনজুর স্যার বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট নিয়ে চমৎকার বক্তব্য দিলেন। তিন সেশনে নানান বিষয়ে আলোচনা, মন্তব্য ও সিদ্ধান্ত হলো। কনফারেন্সের ফাঁকে সময় বের করে আমরা ল্যুভর মিউজিয়াম, নটরডেম ক্যাথেড্রল, আর্ক দ্য ট্রিডম্ফ ঘুরে দেখলাম।
কনফারেন্সের শেষ দিন আমরা মোটামুটি ফ্রি ছিলাম। স্যারকে বললাম—‘স্যার চলেন। ভিক্টর হুগোর বাড়ি দেখে আসি।’
স্যার বললেন—‘চলো। যাই।’
সীন নদীর তীরে আমাদের দেশের টং চা-দোকানের মতো সারি সারি বই দোকান দেখছি আর হাঁটছি। থেমে থেমে মনজুর স্যার বই দোকানিকে ভিক্টর হুগোর বাড়ির পথ জিজ্ঞেস করছেন। আমরা ভিক্টর হুগো বললেও ফরাসীরা উচ্চারণ করছিল ভিক্টর উগো। অনেকটা হাঁটা হলো। স্যার রণে ভঙ্গ দিতে চাইলেন কবার। চলো ফিরে যাই। এভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বললাম—‘স্যার এতটা যখন হেঁটেছি আর কিছুটা হাঁটি।’ স্যার আমার কথা রাখলেন। পুরোনো প্যারিস শহরের অলি-গলি পেরিয়ে আমরা ভিক্টর হুগোর বাড়ির গেটের সামনে গিয়ে দেখলাম একখানা নোটিশ ঝুলছে। রিকনস্ট্রাকশন চলছে। প্রবেশ নিষেধ। যাক তারপর ও দ্য হাঞ্চব্যাক অফ নটরডেম (১৮৩১) ও লা মিজারেবল (১৮৬২) খ্যাত বিখ্যাত ফরাসি রোমান্টিক লেখক নাট্যকার, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিবিদ ভিক্টর হুগোর (২৬ ফেব্রুয়ারি ১৮০২-২২ মে ১৮৮৫) বাড়ির গেটের সামনে ছবি তুলে ফিরে এলাম।