দেবী দুর্গা ও দুর্গা পূজা : শাস্ত্রীয় আখ্যান ও ইতিহাস

দেবী দুর্গা ও দুর্গা পূজা : শাস্ত্রীয় আখ্যান ও ইতিহাস

’আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক-মঞ্জীর;ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা;প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা।’মহালয়ার ভোরে বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্যের (বাণীকুমার নামে অধিক পরিচিত) লেখা মহিষাসুরমর্দিনী স্ত্রোত্র বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ভরাট কণ্ঠে শোনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় বাঙালির দুর্গাপূজা। কিন্তু দুর্গা পূজা কি শুধুই বাঙালির পূজা?  ইতিহাস মোটেই তা বলে না বরং এটি সর্বসনাতনীর পূজা। যদিও নামে, আচার অনুষ্ঠানে বা ঐতিহাসিকতায় আছে ভিন্নতা। দেবী দুর্গা কাশ্মীরে ও দক্ষিণ ভারতের একাংশে অম্বা বা আম্বিকা নামে পূজিত হয়, গুজরাটে হিঙ্গুলা ও রুদ্রাণী নামে, উত্তর প্রদেশে কল্যাণী নামে, বিহার ও ঝাড়খণ্ড অঞ্চলে উমা, তামিলনাডুতে কন্যাকুমারী নামে পূজিত হয় বাঙালির মা দুর্গা।দেবী দুর্গা আদ্যাশক্তির আরেক রূপ। এই অদ্যাশক্তির ভেতর বিদ্যা ও অবিদ্যা দুই আছে। অবিদ্যা মুগ্ধ করে রাখে আর বিদ্যা মানুষকে নিয়ে যায় ভক্তি, দয়া ও প্রেমের পথে। বেদাগমের শিবপ্রোক্ত আদ্যাস্ত্রোতে মহাদেব শিব বলেছেন, 'ত্বং কালী তারিণী দুর্গা ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী’। তন্ত্রেও দুর্গা, কালী, জগদ্ধাত্রীকে আদ্যাশক্তি মহামায়ার রূপ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। যদিও ঋগ্বেদে দেবী দুর্গার উল্লেখ নেই কিন্তু যজুর্বেদে অম্বিকা দেবীর নাম পাওয়া যায় আর উপনিষদে আছে উমা নামের উল্লেখ। দেবীর দুর্গা নামের পিছনে আছে নানা পৌরাণিক ব্যাখ্যা। শব্দকল্পদ্রুমে পাওয়া যায় মহাবিঘ্ন, ভববন্ধন, কুকর্ম, শোক, দুঃখ, নরক, যমদণ্ড, মহাভয়, অতিরোগ এই সকলকে হনন করেন যে দেবী তিনি দুর্গা নামে পরিকীর্তিতা। আবার চণ্ডী ও স্কন্দ পুরাণে বলা আছে, দুর্গম নামে এক অসুরকে বধ করেন তাই তিনি দুর্গা। লোক প্রচলিত মত দেবী মানবকুলের দুর্গতি হরণ বা নাশ করেন, তাই তিনি দুর্গতিনাশিনী দুর্গা। মার্কণ্ডেয় পুরাণে দেবীকে কালী, দুর্গা, চামুণ্ডা, পার্বতী, কৌষিকী, বিন্ধ্যবাসিনী, রক্তদন্তিকা, শাকম্ভরী, ভীমা ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়েছে। দেবীকবচে এক দুর্গার নয়টি নাম পাওয়া যায়। এই নয় নামের কায়ব্যূহ মূর্তিকে একত্রে বলে নবদুর্গা। আবার চন্ডীতে আছে দেবী দুর্গা তিনটি ভিন্ন রূপে তিন ভিন্ন অসুরকে বধ করেন। মহিষাসুরকে বধ করেন দেবী দুর্গারূপে। বামনপুরাণ, মার্কণ্ডেয়পুরাণ, দেবীভাগবত থেকে জানা যায় মহিষাসুর তিনবার তিনকল্পে রম্ভাসুরের ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন আর তিনবারেই দেবী দুর্গার তিনটি রূপ দ্বারা নিহত হোন। প্রথমবার অষ্টাদশভুজা দেবী উগ্রচণ্ডারূপে, দ্বিতীয়বার ষোড়শভুজা ভদ্রাকালী এবং তৃতীয়বার দশভুজা দুর্গারূপে দেবীর হাতে মহিষাসুর নিহত হোন। কালিকা ও বামনপুরাণ বলে তৃতীয়বার দেবী আশ্বিনমাসের কৃষ্ণাচতুর্থীতে হিমালয়ের কাত্যায়ন মুনির আশ্রমে দেবতাদের মিলিত তেজ থেকে আবির্ভূত হোন। সেই তেজে কাত্যায়ন মুনির তেজও মিলিত হয়েছিল এবং দেবী কাত্যায়ন মুনির কন্যাত্ব স্বীকার করেছিলেন তাই দেবীর আরেক নাম কাত্যায়নী। অসুর মধুকৈটভকে বধের জন্য দেবী আবির্ভূত হোন মহাকালী রূপে আর শুম্ভ-নিশুম্ভ অসুরকে বধ করেন তিনি কৌষিকীরূপে। এই কৌষিকী আসলে জয়দুর্গা পঞ্চদেবতা যার পূজা প্রচলন করেছিলেন আচার্য শংকর। দেবী দুর্গার প্রতিটি সন্তান এক একটি শক্তির প্রতীক। কার্তিক ক্ষাত্রশক্তি, গণেশ গণশক্তি বা শ্রমশক্তি, সরস্বতী জ্ঞানশক্তি, লক্ষ্মী ধনশক্তির প্রতীক। মা দুর্গা মর্তে আগমনকালে এই চারশক্তি সঙ্গে নিয়ে আসেন।দেবী দুর্গার উদ্ভব নিয়ে বিভিন্ন পুরাণে ভিন্ন ভিন্ন উপাখ্যান আছে। দেবীমাহাত্মের উপাখ্যানটি অধিক প্রচলিত। ব্রহ্মার বরে পরাক্রমী মহিষাসুরকে বধ করতে সকল দেবতার মিলিত তেজে দেবী দুর্গার উদ্ভব হয় ধরায়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে আছে, দুর্গাপূজার প্রথম প্রবর্তক কৃষ্ণ, দ্বিতীয় বার দুর্গাপূজা করেন স্বয়ং ব্রহ্মা আর তৃতীয়বার দুর্গাপূজার আয়োজন করেন মহাদেব শিব। আবার দেবী ভাগবত পুরাণ অনুসারে, ব্রহ্মার মানস পুত্র মনু ক্ষীরোধ সাগরের তীরে দুর্গার আরাধনা করে বর লাভে সফল হোন। কিন্তু যে শ্রীরামের দুর্গাপূজা নিয়ে আলোচনা সর্বত্র সেই মূল বাল্মীকির রামায়ণে দুর্গাপূজার কোনো অস্থিত্ব নাই। দুর্গাপূজার অস্তিত্ব পাওয়া যায় কৃত্তিবাসী রামায়ণে।দেবী দুর্গা বা দুর্গা পূজার প্রাচীনত্ব নিয়ে সহজ আলোচনা সম্ভব নয়।  কিছু ঐতিহাসিক বলেন দুর্গা পূজা বৈদিক রুদ্রযজ্ঞের এক নবরূপ। রুদ্রযজ্ঞের অগ্নিই পরবর্তীতে দুর্গা  হোন। বৈদিকযুগে শরৎকালে নতুন বছর গণনা শুরু হতো এবং সেই সময় রুদ্রযজ্ঞ করা হতো। আজও দুর্গাপূজা শরৎকালেই হয়। আবার কেউ কেউ বলেন, দুর্গা পূজা প্রাচীন শারদোৎসব। আম্বিকা বলতে শরৎকালকে বোঝায়। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে শরৎকালে আম্বিকা দেবীর পূজার উল্লেখ আছে। তবে বৈদিকপূর্ব হরপ্পা সভ্যতার সময়েও দেবী দুর্গাকে পাওয়া গেছে মাতৃকা রূপে। খ্রিষ্টপূর্ব যুগের চন্দ্রকেতুগড় সভ্যতাও এই মাতৃকা উপাসনার ঐতিহ্য বহন করতো। সেই সময়কালে চার সহচর/সহচরী পরিবেষ্টিত যে মাতৃকার দেবীর উপাসনা হতো, তিনি মাথার খোঁপায় দশটি ক্ষুদ্র আয়ুধ ধারণ করতেন। কোন কোন ঐতিহাসিক আবার বলেন, প্রায় ২২ হাজার বছর পূর্বে ভারতের প্যালিওলিথিক জনগোষ্ঠী থেকেই দেবী পূজা প্রচলিত। কারো কারো মতে আবার দুর্গা প্রাক কৃষিযুগে পূজিত হতো বনদুর্গা নামে। অরণ্যচারী মানুষেরা বনদুর্গার পূজা করতো শেওড়াগাছকে। প্রধানত মেয়েরা এই পূজা করতো, আজও দেখা যায় পৌষসংক্রান্তিতে বাংলাদেশের কোথাও কোথাও বনদুর্গার পূজা হয়। এমনকি বাংলাদেশে শুভদুর্গা নামে মূর্তিহীনা এক দুর্গার পূজার প্রচলনও কোথাও কোথাও আছে বলে জানা যায়। ইতিহাস থেকে জানা যায় সাড়ে চার হাজার বছরের প্রাচীন মহেঞ্জোদারোতে মহিষমেধি নামে একটি ধর্মীয় আচার ছিল। হরপ্পারার সেই জনগোষ্ঠী ছিল মাতৃকা উপাসক। মহিষবলির মাধ্যমে তারা মাতৃকা দেবীকে তুষ্ট করতেন বলে ধারণা করা হয়। কালের ক্রমে মহিষমেধি দেবীর মহিষাসুরমর্দিনী হওয়াটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।মেধা মুনির আশ্রমে খ্রি: পূর্ব সময়ে রাজা সুরথ ও বণিক সমাধি দুর্গা পূজা প্রথম শুরু করেছিলেন বলেও জানা যায়। মেধা মুনির সেই আশ্রম অবস্থিত বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলায়। তাই এটুকু নির্দ্বিধায় বলা যায় বাংলায় বা বঙ্গদেশের দুর্গাপূজাও খুবই প্রাচীন। তবে বাঙলায় দুর্গাপূজা রাজা সুরথের সময়কালেরও চেয়ে বেশি প্রাচীন দাবী করলে ভুল হবে না কেননা খ্রিস্টপূর্ব প্রায় হাজার বছরের প্রাচীন চন্দ্রকেতু গড়, পান্ডুরাজা ঢিবিতে প্রাপ্ত দেবী মূর্তি সেই সাক্ষ্য দেয়। এছাড়া খ্রিস্টীয় শতকের প্রথম দিক থেকেও যে বাঙলায় দেবী দুর্গা পূজিত হতেন তার প্রমাণ হিসাবে কুষাণ, গুপ্ত ও সেন যুগে বেশ কিছু দেবী মূর্তি পাওয়া গেছে। তবে আধুনিক যে দুর্গাপূজা তার প্রচলন অবশ্য খুব বেশি দিনের নয়। মধ্যযুগে তাহিরপুরের রাজা কংসানারায়ন প্রথম প্রতিমায় দুর্গাপূজা করেন বলে মত আছে। তান্ত্রিক রমেশ শাস্ত্রী ছিলেন তার কুলপুরহিত। আধুনিক দুর্গাপূজার প্রচলন মূলত তান্ত্রিক রমেশ শাস্ত্রীরই মস্তিষ্ক প্রসূত। কেউ কেউ আবার বলেন, পঞ্চদশ শতকে শ্রীহট্টের (বর্তমান সিলেট) রাজা গণেশ প্রথম দুর্গাপূজা শুরু করেন। দুর্গাপূজা প্রচলন নিয়ে আরো কিছু মত আছে, ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে কোচবিহারের রাজা বিশ্ব সিংহের প্রতিষ্ঠিত ‘দুর্গাবাড়ি’ বা ‘দেবীবাড়ী’র দুর্গাপূজা। ১৬০৬ সালে নদীয়ার ভবনানন্দ মজুমদারের দুর্গাপূজা, ১৬০৯ সালে কাশীশ্বর দত্ত চৌধুরীর দুর্গা পূজা কিংবা ১৬১০ সালে কলকাতার সুবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারে দুর্গাপূজা প্রত্যেকটি কোনো না কোনোভাবে আধুনিক দুর্গা পূজার শুরুর দিককার দিকপালের দাবি রাখে। ১৭৫৭ সালে শোভাবাজার রাজবাড়ীতে নবকৃষ্ণ দেব দুর্গা পূজা শুরু করেন এবং কলকাতায় মূলত এরপর থেকেই দুর্গা পূজা এক ভিন্ন আঙ্গিক পায়। এমনটাও শোনা যায় লর্ড ক্লাইভের বিজয় উপলক্ষ্যে রাজা নবকৃষ্ণদেব ধুমধাম করে দুর্গাপূজা করেছিলেন। আর হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায় ১৭৯০ সালে মতান্তরে ১৭৬১ বারোজন ব্রাহ্মণযুবকের আয়োজনে যে দুর্গাপূজা শুরু সেটাই বারো ইয়ারের পূজা থেকে বারোয়ারি পূজা নামে খ্যাত হয়। রাজা হরিনাথ রায়ের হাত ধরে কাশিমবাজারের রাজবাড়ির বারোয়ারির পূজার মাধ্যমে কলকাতায় প্রথম বারোয়ারি পূজা শুরু হয়।

দেবী দুর্গা শুধু পূজিত দেবী ছিলেন না বরং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে জাগ্রতকারী এক বিপ্লবী প্রতীক ছিলেন মা দুর্গা। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’ কিংবা অবনীন্দ্রনাথের ‘ভারতমাতা’র প্রতিরূপ থেকে তার প্রমাণ মেলে। স্বাধীনতাকামী অসংখ্য যুবকের মাঝে অফুরান তেজ আর প্রাণশক্তির সঞ্চার করেছিল ঋষি অরবিন্দের ‘দুর্গাস্তোত্র’। কাজী নজরুল ইসলামকেও দুর্গা মাতার শক্তি বন্দনার মাধ্যমে সহিংস বিপ্লবীদের উদ্বুদ্ধ করার কারণে ইংরেজ সরকারের রোষানলে পড়তে হয়েছিল। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবনেও আছে দুর্গা পূজার এক বিশাল প্রভাব।দুর্গাপূজার তত্ত্বগত ও প্রণালীগত দিক নিয়ে যারা আলোচনা করেছেন তার মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন একজন বাঙালি স্মার্ত পন্ডিত নাম বালক। এছাড়া জীকন, ভবদেব ভট্ট, শ্রীকর দত্ত এদের তাত্ত্বিক আলোচনাও প্রসিদ্ধ। কিন্তু বাংলায় এখন যে পদ্ধতি অনুসরণ করে দুর্গা পূজা হয় তার প্রচলন করেন মহাপ্রভু শ্রীনিত্যানন্দের সমসাময়িক স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দন। দুর্গাপূজা নিয়ে পণ্ডিত রঘুনন্দনের তিনটি গ্রন্থ আছে: দুর্গোৎসবতত্ত্ব, দুর্গাপূজাতত্ত্ব ও কৃত্যতত্ত্ব। রঘুনন্দনের এই পূজা পদ্ধতিতে তন্ত্রের প্রভাব লক্ষণীয়। রঘুনন্দনের পূজা পদ্ধতি অনুসারে বাংলা, বিহার ও আসাম অঞ্চলে ছয়টি কল্পে পূজা হয়। এই কল্পানুসারে ষষ্টীর দিন সন্ধ্যায় বিল্ববৃক্ষের শাখায় দেবীর বোধন হয়। তারপর আমন্ত্রণ ও অধিবাস এবং ঐদিন ঘটে পূজা হয়। ষষ্ঠ্যাদি কল্পে চারদিন পূজা হয়ে দশমীতে বিসর্জন হয় দেবীর। আজকাল আমরা প্রায় বলি মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী কিন্তু এই মহা বিশেষণ শাস্ত্রানুমোদিত নয়। কেবলমাত্র অষ্টমী ও নবমী এই বিশেষণ যোগ করা যেতে পারে। অষ্টমী ও নবমীতে মহা বিশেষণ যোগ করার পেছনেও আছে যৌক্তিক ব্যাখ্যা। এই অষ্টমীর দিন শ্রীরামচন্দ্র মহাশক্তির সহায়তায় রাবণকে বধ করে সীতাকে উদ্ধার করেন। আর নবমীর দিন লাভ হয় মহাসম্পদ তাই অষ্টমী ও নবমীতে মহা বিশেষণ যোগ করা হয়। মাঘ থেকে আষাঢ় হল দেবতাদের উত্তরায়ণ অর্থাৎ একদিন আবার শ্রাবণ থেকে পৌষ হলো দক্ষিণায়ন অর্থাৎ এটা দেবতাদের রাত্রিকালীন সময়। শ্রীরামচন্দ্র শরৎকাল অর্থাৎ রাত্রিকালীন সময় অকালে দেবীর বোধন করেছিলেন বলেই বলা হয় অকালবোধন। দেবী দুর্গার বাসন্তীপূজা হয় উত্তরায়ণের সময় তাই এ সময় বোধনের প্রয়োজন হয় না। মেধা মুনির আশ্রমে রাজা সুরথ ও সমাধি প্রায় তিন বছর আরাধনার পর দেবীর কৃপা লাভ করে বসন্তকালে দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন একে বলা হয় বাসন্তীপূজা।দুর্গাপূজার সময় যে নবপত্রিকার পূজা হয় সেটি আসলে প্রাচীন কৃষিভিত্তিক এক প্রতীকী পূজা। এই পূজায় যে নয়টি উদ্ভিদ ব্যবহৃত হয় তার প্রত্যেকটির দেবপ্রতীকী আছে। যেমনঃ কলার হল ব্রাহ্মণী, কচুর কালী, হলুদের দুর্গা, জয়ন্তের কার্তিকী, বেলের শিবা, ডালিমের রক্তদন্তিকা, অশোকের শোকরহিতা, মানকচুর চামুন্ডা আর ধানের হলো লক্ষ্মী। এই নবপত্রিকার পূজাবিধি যদিও খুব একটা প্রাচীন নয় কারণ  পুরাণে এই পূজার উল্লেখ পাওয়া যায় না। দুর্গাপূজায় সন্ধিপূজা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী প্রথম ২৪ মিনিটে এই সন্ধিপূজা হয়। পুরাণ বলে, এই সময়ে শ্রীরামচন্দ্র রাবণের দশমাথা ছিন্ন করেছিল। সন্ধিপূজায় দেবীর আবির্ভাব হয় চামুন্ডারূপে, দেবীকে তাই দীপমালা প্রদান করা হয়। দুর্গাপূজার আর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্যমন্ডিত দিক হল কুমারী পূজা। তন্ত্রে কুমারী পূজার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়েছে। তন্ত্রে বলা আছে কুমারী পূজা ছাড়া পরিপূর্ণ ফল লাভ হয় না, কুমারীকে ভোজন করালে ত্রিলোকবাসীর ভোজন হয়। ষোল বছরের কম বয়স্কা কুমারীকে দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। এক বছরের কন্যা সন্ধ্যা, দুই বছরের সরস্বতী, তিন বছরের ত্রিধামূর্তি, চার বছরের কালিকা, পাঁচ বছরের সুভগা, ছয় বছরের উমা, সাত বছরের মালিনী, আট বছরের কুঞ্জিকা, নয় বছরের কালসন্দর্ভা, দশ বছরের অপরাজিতা, এগারো বছরের রুদ্রাণী, বারো বছরের ভৈরবী, তের বছরের মহালক্ষ্মী, চৌদ্দ বছরের পাঠনায়িকা, পনের বছরের ক্ষেত্রজ্ঞা, ষোল বছরের কুমারীকে অম্বিকা নামে পূজা করা হয়। কুমারী পূজার এই প্রচলন বেদ পুরাণের যুগ থেকে প্রচলিত। একথায় কুমারী পূজায় সকল নারীকে ভগবতী বা ঈশ্বরী হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নারীকে এই সম্মান এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত। ১৯০১ সালে ভারতীয় দার্শনিক ও ধর্মপ্রচারক স্বামী বিবেকানন্দ সর্বপ্রথম কলকাতার বেলুড় মঠে ৯ জন কুমারী পূজার মাধ্যমে এই কুমারী পূজার পুনঃপ্রচলন করেন এবং কুমারী পূজাকে জনপ্রিয় করে তুলেন।দেবীভাগবত মতে দেবীর পূজার দুই প্রকার: বাহ্য ও আভ্যন্তর। বাহ্যপূজা আবার দুই প্রকার বৈদিক ও তান্ত্রিক। দুর্গাপূজাকে কলির অশ্বমেধ যজ্ঞ বলা হয় কারণ দেবীপুরাণে বলা আছে ভক্তিসহকারে দুর্গা পূজা করলে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ হয়। দেবী দুর্গা বিশ্বমাতা, জগতাং ধাত্রী। দুর্গার মূর্তি ভাবময়ী মূর্তি। দুর্গাপূজা ভাবের পূজা। চণ্ডীচিন্তায় বলা আছে দুর্গা পূজার দুটি দিক। একটি বাহিরের সেটি বিজ্ঞানধর্মী আর অপরটি আত্মধর্মী। প্রথম দিকটির উদ্দেশ্য মহাশক্তির সাথে ব্যক্তিসত্ত্বার সম্বন্ধ স্থাপন করা আর দ্বিতীয় দিকটির উদ্দেশ্য হলো মায়ের সাথে সন্তানের যে চিরসম্বন্ধ তার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। লোকবিশ্বাস দেবীদুর্গা স্বর্গ হতে মর্তে আসেন একটি যানে আর ফিরেও যান আরেকটি যানে। এই গমন ও প্রত্যাগমনে যানবাহনের যাত্রার উপর ফল নির্ধারিত আছে।  নৌকায় আগমন ও গমন হলো ফলশস্য ও জলবৃদ্ধি, দোলায় আগমন ও গমন হলো মড়ক, গজে আগমন ও গমন হলো শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা, ঘোটকে আগমন ও গমন হলো ছত্রভঙ্গ।শ্রীরামচন্দ্র দেবী দুর্গার সহায়তা রাবণকে বধ করে জীবনের মহাবিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন আর সতীরূপী সীতাকে মহাসম্পদ হিসাবে লাভ করেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হতে পারে বর্তমানে মানুষ দুর্গাপূজায় কি লাভ করবে? সাধারণ মানুষ যারা সংসারাশ্রমী তাদের জন্য জীবনই এক মহাযুদ্ধ আর দারিদ্র, রোগ, শোক মহাবিপদ। তাই চন্ডীতে বলা আছে, দারিদ্র্যদুঃখভয়হারিণী কা ত্বদন্যা’। অর্থাৎ মানবকূল দেবীর কৃপায় জীবনযুদ্ধের সকল মহাবিপদ থেকে উদ্ধার পেয়ে দেবীর আনুকূল্যেই মহাসম্পদ লাভ করতে পারে।

Comments

0 total

Be the first to comment.

হুমায়ূনের তিন নারী চরিত্র BanglaTribune | প্রবন্ধ/নিবন্ধ

হুমায়ূনের তিন নারী চরিত্র

হুমায়ূন আহমেদের ছোটোগল্প ‘রূপা’, ‘শঙ্খমালা’ এবং ‘নন্দিনী’—প্রতিটি নামের অন্তঃস্থিত একগুচ্ছ বাস্তবতার...

Nov 13, 2025
তির্যক সূর্যের নাম হাসান হাফিজ BanglaTribune | প্রবন্ধ/নিবন্ধ

তির্যক সূর্যের নাম হাসান হাফিজ

সত্তর দশকের কবি ও সাংবাদিক হাসান হাফিজের ৭১তম জন্মদিন আজ। তিনি ১৯৫৫ সালের ১৫ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলা...

Oct 15, 2025

More from this User

View all posts by admin