হুমায়ূন আহমেদের ছোটোগল্প ‘রূপা’, ‘শঙ্খমালা’ এবং ‘নন্দিনী’—প্রতিটি নামের অন্তঃস্থিত একগুচ্ছ বাস্তবতার আভাস হয়ত, যেখানে নারীর জীবনের জটিলতা ও সংগ্রামের বহুমাত্রিক প্রতিচ্ছবি রয়েছে। এই গল্পগুলো কেবল নারীর পরিচয়ের প্রতীক নয়, বরং তাদের অস্তিত্বের গভীর অভিজ্ঞতা, প্রেম-পীড়া, সামাজিক বন্ধন, রাজনৈতিক বাধা এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক জটিল মনস্তত্ত্বের দিকে ইঙ্গিত করে।নারীর জীবনের এই বহুমাত্রিকতা হুমায়ূন আহমেদের শব্দচয়নের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত হয়েছে, যেখান থেকে নারীর অস্তিত্বের সুরের মর্মস্পর্শী কথা অনুধাবন করা যায়। এই গল্প তিনটির মাধ্যমে লেখক নারীর জীবনের বিভিন্ন দিক, তাদের সংগ্রাম, আবেগ, আত্মপরিচয় এবং সমাজবদ্ধ প্রতিবন্ধকতার মর্মার্থকে অসাধারণভাবে স্পর্শ করেছেন। হুমায়ূন আহমেদের নারীর প্রতি দৃষ্টি কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং তা আধুনিক নারীবাদের তাত্ত্বিক আলোকে বিশ্লেষণ করলে নারীবাদের সংজ্ঞায়িত ধারণাগুলোর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ফুটে ওঠে। এই ত্রয়ীর প্রতিটি চরিত্র নারীবাদের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে যেমন: পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য, নিপীড়ন, পরিচয়ের সন্ধান, সামাজিক স্বীকৃতি এবং রাজনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত, তা স্পষ্টভাবে বুঝা যায়। ‘রূপা’ গল্পের ‘প্রিন্স’ চরিত্রটি প্রেমের একধরনের সংকীর্ণ ও অব্যক্ত দুনিয়ায় আবদ্ধ। এই পুরুষ চরিত্রের রূপার প্রতি উন্মাদনা ও আকাঙ্ক্ষা নারীর মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের প্রতীক হিসেবে ধরা যায়। এখানে রূপা শুধু নামমাত্র কেউ নয়, যা পুরুষ চরিত্রের বিমূর্ত আত্মকেন্দ্রিক বড়ো জগৎ সাজানোর একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। এই ‘Othering’ বা নারীকে ‘অন্য’ হিসাবে প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া হলো নারীবাদের মূল তত্ত্ব, যেখানে নারীকে পৃথককরণ ও অবমূল্যায়নের মাধ্যমে তাদের অস্তিত্ব সংকীর্ণ করা হয়। রূপার চরিত্র এই নিরীক্ষায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নারীর অস্তিত্ব অদমিত করে রাখার দিকটি নির্দেশ করে। ‘শঙ্খমালা’ গল্পে মায়ের চরিত্রে মায়ের কষ্ট, নির্জনতা ও সংসারে অবক্ষয় প্রগাঢ়ভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। মায়ের ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও আবেগ, পারিবারিক এবং সামাজিক নিয়মের কাছে অসহায়, যা তাকে নিজের কাছে নিজেকে বেদনায় বন্দি করে রেখেছে। মাতৃত্বের পাশাপাশি এই গল্প সামাজিক অদৃশ্য বন্দিত্বের সূক্ষ্ম চিত্র তুলে ধরে, যেখানে নারীর ব্যক্তিগত ইচ্ছা সমাজ এবং স্বামী-পরিবারের প্রতি কর্তব্যের মাঝে ধংসস্তুপ হয়ে পড়ে। মা ও শাশুড়ির মধ্যকার জটিল সম্পর্ক ‘patriarchal hegemony’ বা পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের নারীর ওপর প্রভাবের বহিঃপ্রকাশ। এই আধিপত্যের ভেতরে নারীদের বৈচিত্র্যময় সংগ্রাম ও মানসিক কষ্ট আবর্তিত হয়। মায়ের নীরবতার পেছনে রয়েছে আত্মত্যাগ এবং সামাজিক নিয়ম কাঠামোর নির্মমতা। গল্পে নবীন প্রজন্মের নায়িকা পরির আগমন এক ধরনের প্রত্যাশা ও বিপ্লবের প্রতীক, যা নতুন নারীর শক্তি ও সম্ভাবনার নতুন আলোকবর্তিকা হিসেবে দেখানো হয়েছে। ‘generational conflict’ বা প্রজন্মগত দ্বন্দ্ব নারীবাদের আঙ্গিকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে পুরোনো ও নতুন নারীর মাঝে চ্যালেঞ্জ ও পরিবর্তনের সংঘাত প্রকট হয়। ‘নন্দিনী’ গল্প নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার এক গভীর সংঘাতের প্রতিচ্ছবি। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের কঠোর বাস্তবতায় নয়, বরং সমাজের নিম্নস্তরের ‘subaltern’ নারীর সংগ্রাম ও বঞ্চনার গল্প এখানে উঠে এসেছে। নারীর রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির সংকটের মধ্যে বিশ্লেষণ টানতে নন্দিনী চরিত্র সব দিক থেকেই অনেকটাই ‘intersectionality’ বা বহুস্তরীয় দমনমূলক কাঠামোর মিলিত প্রভাবের আদর্শ উদাহরণ। ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে নারীর মুক্তির সংগ্রামের যেসব জটিলতা আছে, তা এই গল্পে পাওয়া যায়। নন্দিনীর জীবন ও মজিদের সম্পর্কের অতীত স্মৃতিকথাগুলো থেকে বোঝা যায় নারীর স্বাধীনতার জন্য কতটা ব্যক্তিগত ত্যাগ ও সামাজিক দমন বহন করতে হয়। এই দমনমূলক কাঠামোগুলো নারীর পর্দার আড়ালে থাকা জীবন যাপনকে চিত্রায়িত করে, যা নারীবাদের আলোকে গভীর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের বিষয়। এই ত্রয়ী গল্পের নারীরা ব্যক্তি-সংগ্রামের প্রতীক। ‘রূপা’ অবাঞ্ছিত প্রেম ও পুরুষতান্ত্রিক দমনকে, ‘শঙ্খমালা’ পারিবারিক বঞ্চনা এবং ‘নন্দিনী’ সামাজিক–রাজনৈতিক দমন ও মুক্তির দ্বন্দ্বকে হাজির করে। হুমায়ূন আহমেদ নারীর জীবন ও নিপীড়নের বহুমাত্রিক চিত্র অতি সহজ ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন, যা শুধু বাংলা সাহিত্যের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়; এগুলো নারী আন্দোলন ও সমকালীন নারীবাদের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবেও চিহ্নিত। নারীবাদের আধুনিক তাত্ত্বিক বক্তব্য যেমন: পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার কাঠামো, নারী নিপীড়ন, আত্মপরিচয়ের সন্ধান, সামাজিক স্বীকৃতি ও রাজনৈতিক মুক্তি এই গল্পে প্রস্ফুটিত হয়েছে। ‘রুপা’ গল্পে পুরুষ চরিত্রের বিরক্তি ও প্রেমের মাঝে নারীর অস্পষ্ট স্থান প্রমাণ করে সমাজে নারীর অস্তিত্বের বিলীনে ঝুঁকি প্রতীয়মান। ‘শঙ্খমালা’-তে পারিবারিক অভিঘাত ও সংকট নারীর বন্দিত্বের প্রতীক, যেখানে আধিপত্যের আঁচ গায়ে লেগে যায়। ‘নন্দিনী’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধ ও সামাজিক রাজনীতির মধ্যে নারীর আত্মপরিচয় ও সংগ্রাম গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ‘intersectionality’-এর একটি নিদর্শন।এই গল্প তিনটিতে হুমায়ূন আহমেদ নারীর মানসিক জটিলতা ও তাদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছেন, যা অধিকতর সহানুভূতিশীল পাঠক তৈরি করে। নারীর ভেতরের দ্বন্দ্ব, তাদের নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক এবং তাদের সংগ্রামের মানসিক ও শারীরিক গোপন কাহিনিগুলো এই গল্পগুলোর প্রাণ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিন নারী চরিত্রকে ‘সংগ্রামী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যারা শুধু নিপীড়িত নয় বরং নিজেদের অবস্থান থেকে লড়াই করে নিজেদের স্বাধীনতা ও মর্যাদা দাবি করে। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের নারীর সংগ্রামের মাঝে একধরনের ক্রমাগত সংযোগ গড়ে তোলার শক্তিটি এই গল্পগুলোর মধ্যে স্পষ্ট। নারীবাদের ‘agency’ বা স্ব-সক্ষমতার ধারণাও এখানে স্পষ্ট। হুমায়ূন আহমেদ নারীর বিজয় ও বিপর্যয় উভয়কেই তুলে ধরেছেন, যা নারীবাদের তাত্ত্বিক আলোকে তাদের রাজনৈতিক শক্তি ও সংগ্রামের বিকাশের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়।