স্কুলের পাঠ্যবইয়ে এবং শিক্ষকদের মুখে ইতিহাসের নানা ঘটনাবলির সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ দেখে মনে মনে পণ করেছিলাম আমি এই প্রতিষ্ঠানে পড়তে যাবো একদিন। এই পণ মনে জায়গা করে নিয়েছিল কোনও কিছু বুঝে বা না বুঝেই। ভাবিনি কোন বিষয় নিয়ে পড়বো। এরপর লেখালেখির ঝোঁকে ভাবলাম পড়বই যখন, তখন বাংলায় পড়বো।ভর্তি পরীক্ষায় একাধিক অনুষদে প্রথম দিকে নাম থাকায় বিষয় বেছে নেবার জন্যে আমার সামনে অবারিত সুযোগ এসে গিয়েছিল। ওই সময়ে বিষয় বেছে নিয়ে ভবিষ্যৎ পেশার আগাম পথরেখা নিয়ে ভাবার মতো দূরদৃষ্টি আমার ছিল না। একই সঙ্গে অনেকটা একরোখা ছিলাম আমি। আরও ছিল বেশি রকমের আত্মবিশ্বাস। এহেন অবস্থায় আমার কলেজ এবং স্কুলের শিক্ষকদের উপদেশে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজিতে ভর্তি হবার সিদ্ধান্ত নিলাম। ইংরেজিতে ভর্তি হবার পেছনে আমার শিক্ষকদের অনেক যুক্তি ছিল। তার মধ্যে একটি ছিল বাংলা সাহিত্য নিজের ভাষার, চাইলে পড়ে নিও। ইংরেজি সাহিত্যে পড়লে বাড়তি আরও একটি ভাষা সাহিত্যকে জানার সুযোগ পাবে।শেষতক ইংরেজি বিভাগেই ভর্তি হয়ে গেলাম। ভর্তি হয়েছি তো হয়েছি। অত কিছু ভাবি না। যা মনে হয় করি। মধুপুরের জঙ্গলঘেরা গ্রাম থেকে রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মানে হচ্ছে সুইডিশ কবি টমাস ট্রান্সট্রমারের কবিতার একটি লাইনের মতো জেগে ওঠা মানে স্বপ্ন থেকে প্যারাসুটে লাফ ("Waking up is a parachute jump from dream, Prelude, Tomas Tranströmer).এই বিভাগে গুটিকয়েক শিক্ষাগুরুকে পেয়ে মনে হচ্ছিল আমি যেন স্বপ্নের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। এরকম শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম একজন। অন্য শিক্ষকদের নাম এই পর্যায়ে নিয়ে রাখি- খোন্দকার আশরাফ হোসেন, কাশীনাথ রায়, রাজিয়া খান আমিন, সৈয়দ মাজহারুল ইসলাম, আহসানুল হক অন্যতম।সৈয়দ মাজহারুল ইসলাম পড়াতেন ভাষা এবং ভাষাতত্ত্ব আর সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম পড়াতেন কবিতা ও নাটক। প্রথম বর্ষেই এই দুইজনের ক্লাস পেয়েছিলাম। অনেকেই দুই জনের নামের আগেই সৈয়দ থাকার কারণে মাজহারুল ইসলাম এবং মনজুরুল ইসলামের মধ্যে গুলিয়ে ফেলতেন। সৈয়দ এই দুই শিক্ষাগুরুই আমাকে অনেকটা নাটকীয় এবং অকল্পনীয় স্নেহের অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। সৈয়দ মাজহারুল ইসলাম ছিলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের চেয়ে বয়সে তরুণ। শিক্ষার্থীদের মাঝে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের উপস্থিতি ছিল ’এসএমআই’ স্যার হিসেবে। আর সৈয়দ মাজহারুল ইসলামের পরিচিতি ছিল মাজহারুল ইসলাম স্যার হিসেবে। আমাদের ক্লাস শুরুর দিকের অনেকটা সময় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম দেশের বাইরে ছিলেন।এর মধ্যে মাজহারুল ইসলাম স্যার জানালেন, ইংরেজি বিভাগে তার চাকরি স্থায়ী হয় নাই। তাই বাইরের কোনও প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে চলে যেতে পারেন। এই খবরটা শুনে ওই বয়সে প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছিলাম, অনেক দিন এই চিন্তাটা মাথা থেকে দূর করতে পারি নাই। এত ভালো একজন শিক্ষকের চাকরি কেন স্থায়ী হলো না। বিভাগটা ছেড়ে দিবো দিবো এরকম ভাবনাও আসছিল আমার মাথায়। এর মধ্যেই মাজহারুল ইসলাম স্যার ঠিক ঠিক বিদেশের একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে চলে গেলেন। ইতোমধ্যে ভর্তি হয়ে টের পেতে শুরু করেছি ইংরেজি বিভাগ অনেকটাই ঢাকা শহরের অবস্থাপন্ন পরিবারের সন্তানদের একটি ক্লাব।আমি দোটানায়। মধুপুর শহীদ স্মৃতি উচ্চবিদ্যালয়ে এবং মাদারীপুরের খোঁয়াজপুরে সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজে আমার এক শিক্ষাবর্ষ বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী ছিলেন রাজু আহমেদ খান। তিনিও ইংরেজি বিভাগে আমার আগের শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। তিনি আমাকে অনেকটা সহোদরের মতো আগলে রাখতেন। উনার সব বইপুস্তক খাতাপত্র আমার জন্যে সংরক্ষণে রেখে দিতেন। উনি এসএমআই স্যারের আকর্ষণীয় ক্লাসের অনেক গল্প আমার সঙ্গে করেছিলেন। রাজু ভাই জানিয়েছিলেন এসএমআই স্যারের ক্লাস শুরু হলে দেখবে সব কিছু ভালো লাগতে শুরু করেছে।এর মধ্যে এসএমআই স্যার বিদেশ থেকে ফিরেছেন। প্রথম বর্ষে উনি আমাদের কবিতা এবং নাটক পড়াতেন। শুরু করেছিলেন জন ডানের কবিতা দিয়ে। তবে মূল পাঠ্যে ঢোকার আগে একাধিক ক্লাস নিতেন ওই কবি বা লেখকের প্রাসঙ্গিক ইতিহাস সমাজ রাজনীতি আর সংস্কৃতির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যোগসাজশ ঘটাতে।
প্রথম পড়িয়েছিলেন জন ডানের ’দ্য সান রাইজিং’ কবিতাটি। আরও অনেক কিছুর সঙ্গে তিনি আমাদের ক্রিস্টোফার মার্লোর ’ডক্টর ফস্টাস’ নাটকটি পড়িয়েছিলেন। ওই বয়সে কল্পনায় ডক্টর ফস্টাসের মেধার উচ্চতার সঙ্গে আমাদের এসএমআই স্যারের কথা মনের কোনায় ভেসে উঠতো। উনি যেন আমার কাছে একই সঙ্গে ডক্টর ফস্টাসও। স্যারকে নিয়ে এই তুলনাটা আমার মনের ভেতর আকাশকুসুম নানা ইতিবাচক ভাবনার একটি। যদিও দ্য ট্র্যাজিকাল হিস্ট্রি অফ দ্য লাইফ অ্যান্ড ডেথ অফ ডক্টর ফস্টাস (ইংরেজি: The Tragical History of the Life and Death of Doctor Faustus); সংক্ষেপে ডক্টর ফস্টাস (ইংরেজি: Doctor Faustus) নাটকটির কাহিনি অন্যরকম। ক্রিস্টোফার মার্লো নাটকটি রচনা করেছিলেন জার্মান পুরাণে ফাউস্টের শয়তানের কাছে আত্মা বিক্রয়ের বিখ্যাত কাহিনি অবলম্বনে।এতদিনে বিভাগ ছেড়ে দেবার কথা ভুলে গিয়েছি আমি। ভালো লাগতে শুরু করেছে অনেক কিছু। এসএমআই স্যারের চলন বলন পঠন পাঠন এবং পাঠদানে ছিল অনন্য এক শিল্প। ওই সময়ে তাঁকে মনে হতো যেন স্বপ্নে দেখা মহাপুরুষ। আমি যেন স্বপ্নের ভেতর দিয়ে পথ হাঁটি। তার পোশাক জুতা সব কিছুতেই মার্জিত এক রুচির ছাপ। কথা বলতেন খুব নাতিউচ্চস্বরে। চিবানো এক মধুর বাচনভঙ্গি তাঁর। প্রচুর হাঁটতেন। হাঁটার গতিও ছিল মাপা। সব কিছু মেপে ছকে এঁকে চলা মানুষটির নাম সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। যিনি আমার সরাসরি শিক্ষক। না, তার চেয়েও অনেক বেশি অগ্রাধিকার আমি পেয়েছিলাম উনার কাছে। কেন পেয়েছিলাম তা আজও হিসাব মিলিয়ে উঠতে পারি না।দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কলা ভবনের দোতলায় তাঁর কক্ষে বিকাল থেকে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা থেকে রাত আটটা, নয়টা, দশটা কখনো আরও বেশি বেজে যেত। বিশেষ করে কোনও লেখা বা পাণ্ডুলিপি দেবার সময়সীমার মধ্যে স্যার যখন আটকে থাকতেন, ওই সময়টায়। কলাভবনের দোতলায় তাঁর কক্ষটিও ছিল বিস্ময়ের আরেক ভুবন আমার জন্যে। বাহারি পুস্তক আর পত্রপত্রিকায় ঠাসা। তিনি মাঝে-মাঝে পাইপে তামাক খেতেন এবং দুই পা লম্বা করে আরেকটা চেয়ারের ওপর তুলে আয়েশী ভঙ্গিতে পাইপ টানতেন। তখন এরকম একটা ভাবনার জগতে ডুবে যেতেন। কখনও লেখার ভেতরে ডুবে থাকতেন।স্যারের কক্ষের দরজা সবসময় খোলা রাখতেন। স্যার লেখার মাঝে থাকলে বা ভাবনার ভেতরে থাকলে আমি স্যারের দৃষ্টি এড়িয়ে করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকতাম। একপর্যায়ে বের হয়ে এসে স্যার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতেন, তুমি কখন এসেছো? বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? আমি বলতাম আপনার লেখার মনোযোগে বিঘ্ন ঘটাতে চাই নাই। স্যার বলতেন, তোমাকে বলেই রেখেছি আমাকে ব্যস্ত দেখলেও অসুবিধা নাই, তুমি রুমে ঢুকে গিয়ে চুপচাপ কিছু একটা পড়তে থাকবে।একদিন স্যার বললেন, আমি তো অনেকটা বিশ্ব পর্যটক এখন। বিদেশ যাই আর আসি।আমি বললাম, আপনি সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্পের ঝান্ডু দা'র মতো, জান্ডু বিদেশ যাচ্ছেন না ফিরছেন তা বোঝা কঠিন।স্যার বললেন, ঠিক বলেছো। তুমি কি জানো সৈয়দ মুজতবা আলী আমার নানা, আমার মায়ের মামা।সেই থেকে জানলাম আমাদের এসএমআই স্যার অনেকের প্রিয় লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর নাতি। এরপর থেকে ভাবি স্যার কি তাঁর রসবোধ আর বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্বের আবহটা পারিবারিক সূত্রেই পেয়েছেন?স্যারের কক্ষের সামনের দিকের এক কোনায় ছোট একটি আকর্ষণীয় টেবিল এবং চেয়ার ছিল। মাঝে মাঝে স্যারের নতুন কোনও লেখা বা অনুবাদ কিংবা ছোটগল্প আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলতেন, টেবিলটাতে বসে লেখাটা পড়ো, তোমার অন্য কোনও কাজ না থাকলে বা কোথাও যাবার না থাকলে, ’আমি আসছি একটু পরে’। কখনও তাঁর কক্ষে আমাকে রেখে ক্লাসে বা মিটিংয়ে যেতেন।স্যার বেশ কয়েকবার আমাকে বলেছিলেন, তুমি আমার কক্ষের একটি চাবি রাখো, আমি না থাকলেও তুমি আমার রুমে এসে পড়তে পারো। আমি বলেছি না স্যার, আপনি না থাকলে আর কি দুপুরের পরে বা সন্ধ্যার পরে কলা ভবনে প্রাণ থাকে? কলা ভবনের গেটের সহকারীরা সবাই জানতেন, বিকাল থেকে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত পর্যন্ত ভবনের ভেতরে অন্ধকার পেরিয়ে একটি কক্ষে বাতি জ্বলবেই, সেটি হচ্ছে এসএমআই স্যারের কক্ষ। একপর্যায়ে উনারা জেনে গেছেন আমি স্যারের কাছে নিয়মিত যাত্রী। এরপর উনারা আমাকে দেখলেই বলতেন, স্যার ভেতরে আছেন বা না থাকলে বলতেন স্যার তো আজকে এলেন না।স্যারের সময়সূচি আগে থেকেই আমার জানার মধ্যে থাকতো। স্যারের একমাত্র সন্তান সাফকাত ইসলাম আমাদের প্রজন্মেরই, বয়সের দিক থেকে প্রায় আমার সমসাময়িক। ওই সময়টায় সাফকাত বিদেশে পড়াশোনা করতেন, থাকতেন তাদের এক আত্মীয়ের বাসায়। স্যার প্রায় সময়ই ছেলের গল্প করতেন আমার সঙ্গে। গল্প করতেন ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়েও। ছাত্রজীবনে তিনি জাসদ ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এই কথাটাও উনার মুখ থেকেই শোনা। উনি ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে একবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখাও করেছিলেন। সেই গল্পও তিনি আমার সঙ্গে করেছেন। তরুণ সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলেন বঙ্গবন্ধু। এভাবেই শ্রদ্ধার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করছিলেন আমাদের এসএমআই স্যার।কর্মজীবনে শিক্ষক রাজনীতিতে বামপন্থি ঘরানার গোলাপি দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকলেও শিক্ষক হিসেবে ছিলেন দল মত পথ বর্ণের ঊর্ধ্বে উদার দৃষ্টিভঙ্গির সম্মোহনি ব্যক্তিত্বের একজন শিক্ষাগুরু। তিনি একই সঙ্গে শিক্ষক এবং বন্ধু হবার দ্বিবিধ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বিরলপ্রজ অধ্যাপকদের একজন ছিলেন। রাশভারী বিষয়কে সহজ কথার মতো সরল এবং রসময় ভঙ্গিতে তুলে ধরতেন। কারও সঙ্গে তার দ্বিমত প্রকাশের মধ্যে যুক্তির ধারাবাহিকতা প্রকাশ পেতো। ব্যক্তিগত আবেগের বশবর্তী হয়ে রাগ প্রকাশ এড়িয়ে চলতেন। মিথ্যার মুখোমুখি হতে অপারগ ছিলেন।একবার শাহবাগের এক প্রকাশক উনার সঙ্গে চাতুরি করছিলেন। উনার একটি পাণ্ডুলিপি নিয়ে কালক্ষেপণ করছিলেন। ওই সময় উনি আরজ আলী মাতুব্বরের রচনাসমগ্রের একটি খণ্ডের ইংরেজি অনুবাদ সম্পাদনা করছিলেন। উনি সমুদয় পাণ্ডুলিপি দেখে প্রকাশক বরাবর দিয়ে রেখেছেন। যা আমি নিজে গিয়ে জমা দিয়ে এসেছি। এরপর স্যার একদিন বললেন, প্রকাশক ছেলেটাকে একটু ফোন করে কথা বলো তো। টেবিলের ওপরে স্যারের ফোনটি আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। আরও বললেন, ছেলেপেলেদের মিথ্যা কথা নিতে পারি না।আমি প্রকাশককে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম, বইটার কী খবর, কবে নাগাদ ছাপানোর কাজ শেষ হবে? ওপাশ থেকে উনি বললেন, স্যার বিদেশে থাকার কারণে পাণ্ডুলিপি ঠিক সময় মতো পাই নাই বলে দেরি হয়ে গেলো। আমিও মিথ্যা কথাটা আর নিতে পারলাম না। আমি বললাম, একদম বাড়তি কথা বলবেন না। পাণ্ডুলিপি আমি আপনার অফিসে দিয়ে এসেছি। এরপর প্রকাশক থতমত খেয়ে বললেন, ঠিক আছে বানান সংশোধনের জন্যে স্যারের কাছে দ্রুত পাঠাচ্ছি বইটি।ফোনে রাখার পর স্যার বললেন, তুমি তো ওকে রীতিমতো ধমক দিয়ে দিলে। ফোনের ওপাশ থেকে কি বলেছিল প্রকাশক?আমি স্যারকে বললাম, উনি মিথ্যা বলছিলেন। মিথ্যা কথা শুরুতেই থামিয়ে দিয়েছি স্যার।স্যার বললেন, ঠিক করেছো।ওই সময়টায় অনেক বিষয় নিয়ে কাজ করছেন স্যার। গল্প লিখছেন, অনুবাদ করছেন, সম্পাদনা করছেন। পত্রপত্রিকায় বাংলা ইংরেজি উভয়ে ভাষায় লিখছেন। স্প্যানিশসহ আরও কয়েকটি আধুনিক ভাষায় স্যারের দখল ছিল। স্প্যানিশ কোনও লেখক সম্পর্কে লিখতে গেলে তিনি প্রয়োজনীয় উদ্ধৃতি ইংরেজির আশ্রয় না নিয়ে মূল স্প্যানিশ ভাষা থেকেই তর্জমা করে নিতেন। এই গল্পগুলো উনি নিজেই আমাকে বলতেন।স্যারের স্নেহের উদার আকাশের নিচে থেকে মনে হয়েছে তাঁর ছেলের অবর্তমানে পিতার একাকিত্বের জমানো গল্পের অনেকটা আমার সঙ্গে অবারিত মনোবাক্যে ভাগ করে নিতেন। আরও মনে হয়েছে নতুন প্রজন্মের ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হবার প্রত্যয় থেকেই হয়তো তিনি আমাকে তার বুদ্ধিবৃত্তিক সমৃদ্ধ এক জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। আমার জন্যে তারুণ্যের শুরুর ওই সময়টা ছিল অনেকটা পিতৃভাগ্যের মতো।তিনি একদিন জিজ্ঞেস করলেন, তুমি পেশা হিসেবে কী বেছে নিতে চাও? আমি বললাম, পেশা হিসেবে কী নিবো ঠিক করি নাই, তবে লিখতে আর পড়তে চাই সারা জীবন। তখন বললেন, বুঝেছি, ক্লাস আর পরীক্ষাগুলোতে নিয়মিত থেকো আর যাই করো। আমার কোনও সহযোগিতা লাগলে বলো।এর মধ্যে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে নতুন কলেবরে চালু হওয়া সাপ্তাহিক বিচিত্রায় শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজের সুযোগ হয়ে গেলো। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজটি ভালোই চলছিল। একপর্যায়ে দেখলাম পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। তারপর অবৈতনিক ছুটি নিয়ে নিলাম। একদিন স্যার বললেন, তুমি ইংরেজি কাগজে কাজ করতে পারো। তাহলে ইংরেজিও চর্চার মধ্যে থাকলো, পড়াশোনাও চললো, কিছু টাকাও হাতে পেলে। আমি তখনও বুঝতে পারি নাই, স্যারের এই আলাপের মধ্যে কী ভাবনা কাজ করছিল।একদিন ইংরেজি বিভাগের করিডোরে আমাকে দেখে স্যার বললেন, তুমি ক্লাস শেষ করে আমার রুমে একটু এসো। আমি স্যারের কক্ষে যাবার পর ওখানে বসা তরুণ এক ভদ্রলোককে দেখিয়ে বললেন, ওর নাম কাজী মুশতাক আহমেদ, ডেইলি ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার আর্ট অ্যান্ড কালচার বিভাগের সম্পাদক। তুমি ওর সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে। কাজী মুশতাক আহমেদ উনার ভিজিটিং কার্ড আমাকে দিয়ে বললেন, তুমি সামনে যেকোনও দিন ক্লাস শেষ করে আমার অফিসে এসো। আমি তখনও জানি না মুশতাক ভাইয়ের সঙ্গে স্যারের কী আলাপ হয়েছে। মোশতাক ভাই চলে গেলেন। আমিও চলে এলাম। এরপর ইন্ডিপেন্ডেন্টে গেলাম একদিন। তখন মোশতাক ভাই বললেন, আমি সম্পাদক মাহবুবুল আলমের সঙ্গে আলাপ করেছি। তোমাকে উনার রুমে নিয়ে যাবো। এরপর মাহবুবুল আলম চা পর্বে কথাবার্তা শেষ করে বললেন, তুমি আমাদের এখানে কাজ করতে পারো, ক্লাস শেষে বিকালের দিকে চলে আসবে। মোশতাক আমাকে সবকিছু বলেছে। তুমি তো অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রিয় ছাত্র। উনি আমাদের এখানে নিয়মিত লিখেন। মোশতাক ভাইকে বললেন ফিচার বিভাগের বাকি সবার সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে।সেই থেকে শুরু। ওখানে অনেকেই ছিলেন স্যারের সরাসরি ছাত্র, আবার কেউ কেউ স্যারের বন্ধু এবং সতীর্থ। এসব কারণে পরিবেশটা অনেকটা আপন আবহে ঘেরা ছিল আমার জন্যে।প্রায় তিন দশকের পরিচয়ে স্যারের সঙ্গে যোগাযোগে বিরতি ঘটেছে, কখনও বিঘ্ন ঘটেনি। দূরে থেকেছি কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্নেহের ফারাক তৈরি হয়নি। স্যারের সঙ্গে সবসময় সব বিষয়ে যে সহমত পোষণ করেছি তা কিন্তু নয়। শুরু থেকেই অনেক বিষয়ে নানা সময়ে ভিন্নমত পোষণ করেছি। তাতে উনি নিরুৎসাহিত করতেন না। তারুণ্যের ভিন্নমত প্রকাশের সাহসকে উনি প্রশ্রয় দিতেন, উৎসাহ দিতেন, লালন করতেন, উদযাপন করতেন। ভিন্নমত শুনে, উনি স্বভাবসুলভভাবে বলতেন, তুমি বলেছো? আর সহমত শুনে বলতেন, বুঝে বলেছো তো?উনার আশ্চর্যরকম সম্মোহনী ক্ষমতা এবং তরুণদের বিশেষ করে শিক্ষার্থীর অন্তর্দশন পরখ করার গুণ ছিল। স্যারের সঙ্গে নিবিধ সান্নিধ্যের সময়গুলোতে অন্যান্য অনেক লেখাজোখার সঙ্গে ’কাঁচ ভাঙ্গা রাতের গল্প’ (১৯৯৮), ’অন্ধকার ও আলো দেখার গল্প’ (২০০১) বই দুটি প্রকাশিত হয়। এই দ্বিবিধ বইয়ের প্রায় সব গল্প প্রকাশিত হবার আগেই আমি পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমার বিভাগের বন্ধুরা আড্ডায় পত্রিকায় প্রকাশিত স্যারের লেখা নিয়ে আলাপ করতো। একপর্যায়ে ওরা জেনে গেলো আমি লেখাগুলো প্রকাশের আগেই পড়ার সুযোগ পেয়েছি। এরকম প্রেক্ষাপটে সহপাঠীরা মজা করে কখনো আমাকে ’মিডিয়া মুঘল’ও বলে থাকতো।সাহিত্য-সমালোচনাসহ চিত্রকলায় স্যারের আগ্রহ আর বাংলা-ইংরেজি উভয় ভাষায় স্বতঃস্ফূর্ত লেখালেখির কারণে দেশের এবং বিদেশের নানা তরফ থেকে ক্যাটালগসহ বাহারি রকম প্রকাশনার জন্যে ফরমায়েশি লেখার আবদার আসতে থাকলো উনার বরাবর। এসব কাজ তিনি আনন্দের সঙ্গেই করতেন।পরিচয়ের শুরু থেকে আজ অবধি উনার যাবতীয় কাজ ও লেখার একজন মনোযোগী দর্শক এবং পাঠক হিসেবে থেকেছি। উনার জীবনদর্শনের সঙ্গে আমার জীবনদর্শনের পার্থক্য ছিল স্পষ্ট। এই স্বতন্ত্র তাৎপর্যের শিক্ষাটা উনার কাছ থেকেই পেয়েছি। উনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার জন্যে এক উন্মুক্ত আকাশ। স্নেহের আকাশে নক্ষত্র হবার পরও উনার পরিচয়ে পরিচিতি না পাবার জন্যে সচেতন থেকেছি। নিজের পরিচয়ে পরিচিত হবার সংগ্রাম করে গেছি। লড়াইয়ের এই শিক্ষাটাও উনার কাছ থেকেই পেয়েছিলাম। উনি মানুষের নিজস্ব পরিচয়কে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করতেন। তারুণ্যের দ্রোহকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতেন। স্যারের এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে স্বাধীনভাবে চলার সাহস দিয়েছে।একপর্যায় আমিও জীবন-সংগ্রামের অনেক টালমাটালে নানাদিকে ছিটকে পড়েছি, ছুটেছি দেশে এবং বাইরে। এই ছোটার গতিটাও স্যারের কাছ থেকে অনেকটা পাওয়া। এর মধ্যে একাকী আমি আর একা থাকিনি। আমারও নিজস্ব পারিবারিকমণ্ডল গড়ে উঠেছে, হয়েছি বাবা। এসব কারণে স্যারের সঙ্গে নিবিড় সান্নিধ্য লাভ আর হয়ে ওঠেনি। শেষতক দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল ২০০৬ সালে ইবসেনের মৃত্যুশতবর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে তৎকালীন ঢাকাস্থ নরওয়ের রাষ্ট্রদূতের গুলশানের বাসায় এক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে। এরপর আর সেই তারুণ্যের উচ্ছ্বাসঘেরা দিনগুলোতে আমার স্যারের স্নেহের অবারিত উঠোনে দীর্ঘ মুহূর্তের জন্যে স্থিত হতে পারিনি। যদিও আকাঙ্ক্ষা আর প্রশ্ন ছিল নিরন্তর।আমার ভাবনায় সবসময় ছিল এসএমআই স্যার শতায়ু হবেন। তিনি জীবনযাপন করতেন পরিমিতিবোধের মধ্যে। তার পানাহার এবং দিনের সবকিছু ছিল পরিমিতির মাপকাঠিতে। তিরিশ বছর আগে দেখা স্যারের শরীরের গড়নের সঙ্গে শেষতক পর্যায়ের কোনও পার্থক্য ছিল না। প্রায় একই রকম।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ফুলার রোডের ৫৮ নম্বর ভবনের পাঁচতলার আই ঠিকানা'র বাসাতে তিনি থাকতেন। অনেকবার গিয়েছি উনার বাসায়। মোবাইলের যুগ তখনও শুরু হয় নাই। পুরো বাসাটা ছিল বইয়ের জগৎ। এত রুচিসম্মত আর প্রতিটি কক্ষেই বইয়ে সাজানো একটি স্বপ্নপুরী। একটি বাসার ভেতরে বইয়ে ঘেরা এরকম আকর্ষণীয় অভ্যন্তরীণ শৈলী ঢাকা শহরের আর কোনও বাসায় দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বাইরে উনি প্যান্ট-শার্ট পরলেও বাসায় সবসময় সুতির পাঞ্জাবি আর পায়জামা পরে থাকতেন। ঠিক যেন অনেকটা রাবীন্দ্রিক আবহ। প্রথম যেদিন উনার বাসায় গিয়েছিলাম, উনার স্ত্রী আমাকে স্যারের পড়ার রুম দেখিয়ে বলেছিলেন, স্যারের রুমটি দেখে যাও।স্যারের সঙ্গে তিন দশকের স্নেহসান্নিধ্যের সময়টা ছিল আমার জন্যে এক প্রত্নসময়, এক তরুণের সামনে অবাক করা এক বিস্ময়। বিস্ময়ভরা স্যারের এই বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের সবগুলো দরজা আমার জন্যে অবারিত করেছিলেন। উনি আর সংবাদের সাহিত্যসম্পাদক আবু হাসনাত মিলে ভারতবর্ষের বাঙালি চিত্রশিল্পী গণেশ হালুই'র একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। দীর্ঘ এক আলাপচারিতা। অডিওতে ধারণকৃত এই কথোপকথন পড়ার ফাঁকে ফাঁকে আমি হাতে লিখেছিলাম। পরে এটি দৈনিক সংবাদে কয়েক পাতাজুড়ে ছাপা হয়েছিল। এই কথোপকথন থেকে জানতে পারি গণেশ হালুই আর আমার জন্ম একই জনপদে, বৃহত্তর ময়মনসিংহে। গণেশ হালুই সম্পর্কে জানার পর চিত্রকলার প্রতি আমি আগ্রহ বেড়ে যায়। এরপর চিত্রপ্রদর্শনী আর আর্টগ্যালারির নিয়মিত একজন দর্শক হয়ে উঠি। যোগাযোগ বাড়তে থাকে চিত্রশিল্পীদের সঙ্গেও।একপর্যায়ে এসে খেয়াল করলাম ঢাকা শহরের একাধিক কর্পোরেটগোষ্ঠী স্যারের ওপর ভর করেছেন। যেকোনও কারণেই হোক স্যার আর এই 'ভর' থেকে মুক্ত হতে পারেননি।সম্প্রতি একটি বেপরোয়া গোষ্ঠী আমাদের দেশের নানা জায়গায় শিক্ষকদের নাজেহাল করে যাচ্ছিল। স্যারও এসব বিষয়ে নিয়ে মুষড়ে ছিলেন। আমিও একবার এসএমএস করে স্যারকে বললাম, স্যার, 'রাষ্ট্র মেরামতের নমুনা দেখুন।' ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি আয়োজনের অতিথি হিসেবে প্রদত্ত বক্তব্যে স্যার একটা ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন দেশের কুশীলবদের উদ্দেশে এই বলে, আমার ওপর আশাবাদ জারি রাখার একটা চাপ বলবৎ আছে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে দেওয়া এটাই ছিল স্যারের শেষ আনুষ্ঠানিক বক্তব্য।সাক্ষাতে আলাপ হলে সব বিষয়ে স্যারের কাছ থেকে জানার আগ্রহ মনে মনে পোষণ করে রেখেছিলাম। এরকম আরও অজানা অনেক প্রশ্ন, অনেক সহমত, অনেক দ্বিমত স্যারকে জানানোর ছিল। সেই সুযোগ আর থাকলো না। এই আক্ষেপের ধাক্কা বুকে রয়ে যাবে আমার বাকিটা জীবন।আমার শিক্ষক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে পরিচয়ের প্রায় তিন দশক পরে এসে আমি আজ যা করি বা না করি, কোথাও যেন স্যারের ছায়া আমার নিত্যসঙ্গী। স্যার আমার জীবনে চেতনে এবং অবচেতনে রয়ে যাবেন কেবল একজন মহান শিক্ষাগুরু হিসেবে নয়, বরং একই সঙ্গে পিতৃ-অস্তিত্বের পাশাপাশি আসনে।
লেখক: কবি ও নাট্যকার; বোর্ড সদস্য, সুইডিশ রাইটার্স ইউনিয়ন।