রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ: ভবিষ্যতের পথ কোনদিকে?

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ: ভবিষ্যতের পথ কোনদিকে?

ট্রাম্প-পুতিনের বৈঠকটি বেশ হতাশাজনক ফলাফলের মধ্য দিয়েই শেষ হলো। কথা রাখতে পারলেন না যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, অন্তত এখন পর্যন্ত বিন্দুমাত্র প্রতিফলন নেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ মুহূর্তেই থামিয়ে দেওয়ার তার ক্ষমতা, দক্ষতা বা কূটনৈতিক কৌশলের। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের মাধ্যমে যে যুদ্ধটার শুরু, তা আসলে থামার, অবসানের বা প্রশমনের কোনও লক্ষণ নেই। যুদ্ধক্ষেত্রে বা সামগ্রিক যুদ্ধাবস্থার ধরন, তীব্রতা ও মাত্রায় বিভিন্ন সময় পরিবর্তন দেখা গেলেও সমাধানের আলো দেখা যাচ্ছে না এখনও।সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধাবসানের জন্য যে তিনটি শর্ত দিয়েছেন, স্বাভাবিকভাবেই এবং সঙ্গত কারণেই ইউক্রেন তা প্রত্যাখ্যান করেছে। দোনবাস অঞ্চল (ডনেতস্ক ও লুহানস্ক) রাশিয়াকে ছেড়ে দেওয়া, ন্যাটোতে যোগদানের পরিকল্পনা পরিত্যাগ করা এবং ইউক্রেনে কোনও পশ্চিমা সেনা মোতায়েন না করা সংক্রান্ত মস্কোর প্রস্তাবকে অগ্রহণযোগ্য বলেই অভিহিত করেছে ইউক্রেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইউক্রেনের ভূমি কারও কাছে দেওয়াকে অসাংবিধানিক বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং দোনবাস যে দেশটির অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেই দাবিও জোরালোভাবে ব্যক্ত করছেন বারবার।অন্যদিকে ন্যাটোতে যোগ দেওয়াটাকে ইউক্রেন সবসময়ই নিজের নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান উপায় হিসেবে দেখে এসেছে। বিশেষ করে রাশিয়ার ভবিষ্যৎ যেকোনও আক্রমণ প্রতিহত করতে ন্যাটোকেই প্রধানতম রক্ষাকবজ হিসেবে দেখছে দেশটি। ফলে ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে সরে আসা বা এতে একেবারেই যোগ না দেওয়ার স্থায়ী কোনও প্রতিশ্রুতি সহসা ইউক্রেন থেকে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশসমূহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, সামরিক সহায়তা ইউক্রেনের জন্য রাশিয়ার প্রভাব-ভয়-হুমকি প্রতিরোধে অত্যাবশ্যকীয়। সুতরাং ইউক্রেন তার এসব সহযোগীদের একেবারে বাদ দিতে পারবে বলে মনে হয় না।সুতরাং আপাতত রাশিয়ার প্রস্তাব ইউক্রেনকে প্রত্যাখ্যান করতেই হলো। রাশিয়ার কঠোর-কঠিন শর্ত, ট্রাম্পের অস্থির-অস্পষ্ট আচরণ-অবস্থান আর ইউক্রেন কর্তৃক রাশিয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ফলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ, এর পরিণাম নিয়ে শুরু হয়েছে সুস্পষ্ট অনিশ্চয়তা।যুদ্ধের বর্তমান গতিপথও বেশ দোদুল্যমান। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত রাশিয়া ইউক্রেনের প্রায় ১৮.৯ শতাংশ ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, যা প্রায় ১,১৪,০০০ বর্গকিলোমিটার। ইউক্রেন পূর্বাঞ্চলে শক্ত প্রতিরক্ষা গড়ে তুললেও রাশিয়ার ছোট ছোট অগ্রগতিও সেসব অঞ্চলে দৃশ্যমান। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত অন্তত ১৩ হাজার ৮০০ জন সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। যুদ্ধের ফলে ঘরবাড়িহারা শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ৬.৮ মিলিয়ন; এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ৪.৩১ মিলিয়ন মানুষ। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন পুনর্গঠনের জন্য বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় কমিশনের যৌথ হিসাব অনুযায়ী আগামী দশ বছরে প্রয়োজন হবে ৫২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, তবে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে ইউরোপীয় দেশগুলো যুদ্ধে তাদের ভূমিকা বাড়াচ্ছে। কিয়েল ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ ইতোমধ্যে ইউক্রেনের অস্ত্র ক্রয়ে ৩৫ বিলিয়ন ইউরোর বেশি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার চেয়েও বেশি। এদিকে ইউরোপে ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের আশ্রয়, প্রশিক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।যুদ্ধে আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা ভালো অবস্থানে থাকলেও প্রকৃতপক্ষে সামগ্রিকভাবে ভালো নেই রাশিয়াও। যুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার রাশিয়ান সৈন্যের মৃত্যু হয়েছে বলে জানাচ্ছে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ নামের একটি সংস্থা। একটি হিসাব থেকে জানা যাচ্ছে, আহত হয়েছে তাদের প্রায় ৮ লাখ সেনা। রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপের মধ্যেও সামরিক খাতে উচ্চ ব্যয় বহাল রেখেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাশিয়ার অর্থনীতি ০.৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখবে, ২০২২ সালে এই হার ছিল ৫.৬ শতাংশ। তবে তেলের আয়ের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধকালীন অর্থনীতির ভার রাশিয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। প্রতিদিন রাশিয়াকে প্রায় ১০ হাজার নতুন সেনা নিয়োগ দিতে হচ্ছে। যুদ্ধের ভার আর নিষেধাজ্ঞার চাপে রাশিয়ার অর্থনীতি যে দীর্ঘমেয়াদে বেশ ভালোই সংকটে পড়বে তা স্পষ্ট। সম্পদের বড় একটা অংশ যুদ্ধে খরচ করতে হওয়ায় রাশিয়ার বাজেট ঘাটতি ২০২৫ সালে এসে দাঁড়ায় প্রায় ৪.৯ ট্রিলিয়ন (৪২ বিলিয়ন ইউরো)। এর বড় কারণ জাতীয় বাজেটের প্রায় ৪০ শতাংশ দেশটি খরচ করছে যুদ্ধে বা যুদ্ধ সংক্রান্ত কর্মযজ্ঞে।অনেকে মনে করেন, রাশিয়ার অর্থনীতির এই ধকলও দেশটিকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ থেকে বিরত রাখতে পারবে না। সম্ভবত এই কারণেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার জন্য নতুন একঝাঁক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আসছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কয়েকটি সম্ভাব্য পথে এগোতে পারে। প্রথমত, যুদ্ধটা বেশ লম্বাই হতে পারে। সামনের এক বছর রাশিয়া-ইউক্রেন সীমান্তে বড় পরিবর্তন না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ছোট ছোট আক্রমণ, ড্রোন হামলা এবং দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার যুদ্ধকে দীর্ঘ করবে। দ্বিতীয়ত, সামরিক ক্লান্তি ও আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি পেলে অমীমাংসিত অবস্থাতেই হয়তো কিছুটা দিন স্থির থাকতে পারে সবকিছু। তবে এতে সীমান্ত প্রশ্ন অনির্ধারিত থেকে যাবে। হয়তো বড় কোনও আক্রমণও হবে না, দুই দেশ হয়তো তার অবস্থানেই অটুট থাকবে। এবং তৃতীয়ত, যদি উভয়পক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন অনুভব করে, তবে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, পশ্চিমা সহায়তা এবং ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো শর্তে আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু ইউক্রেনের সংবিধান ও জনমত বিবেচনায় রাশিয়ার দখলকৃত অঞ্চল হস্তান্তর করা প্রায় অসম্ভব। চতুর্থত, ন্যাটো বা ইইউ সেনা ইউক্রেনে সরাসরি প্রবেশ না করলেও, যদি পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয় তবে সাইবার আক্রমণ, সমুদ্রপথে সংঘাত বা সীমান্তবর্তী এলাকায় লড়াইয়ের আশঙ্কা থেকে যায়।আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেন সংকট সমাধানে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর বেশি দায়িত্ব চাপিয়েছে। ইউরোপ ইতোমধ্যে প্রতিরক্ষা শিল্পকে চাঙা করছে এবং ইউক্রেনের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চয়তায় এগিয়ে আসছে। ফলে একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হলো: দীর্ঘমেয়াদি সশস্ত্র উত্তেজনার মধ্যেও ইউক্রেন আরও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা গড়ে তুলবে এবং পশ্চিমাদের সাথে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখবে। অন্যদিকে রাশিয়া আংশিকভাবে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতি চালিয়ে যাবে।যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই। ইউক্রেন তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আর রাশিয়া তার ভূখণ্ডগত দাবি ছাড়তে প্রস্তুত নয়। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সমঝোতা বা যুদ্ধবিরতি তখনই সম্ভব, যখন উভয় পক্ষই বুঝতে পারবে যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার খরচ লাভের চেয়ে বেশি। যুদ্ধে যে জয়ী হয়, তাকেও হারাতে হয় অনেক কিছু।লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন কর্মী। প্রধান, সামাজিক উন্নয়ন, আরডিআরএস বাংলাদেশ

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin