বর্তমানে বাংলাদেশ বিপরীতমুখী রাজনীতি চলছে। একদিকে জুলাই সনদ, গণভোট এবং শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়া শেষে রায় চূড়ান্তকরণ, এর পাশাপাশি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার এবং আইনি প্রক্রিয়ায় নিষিদ্ধকরণের রাজনৈতিক মহড়া যেমন চলছে তেমনি জনপ্রিয় আলোচনা উপদেষ্টাদের ‘সেফ এক্সিট’ প্রসঙ্গ। তবে কিছুই যেন মিলছে না। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে হলে এখন তো সকলেরই নির্বাচন নিয়েই ব্যস্ত থাকা এবং কথা বলার কথা। কিন্তু এখন আলোচনার কেন্দ্রস্থল সেফ এক্সিট।বিশেষ করে গত তিন মাস ধরে তেড়ে আসা অনেক গুজব-গুঞ্জনের মধ্যে সবচেয়ে জোরালো ফিসফাস ছিল উপদেষ্টা পরিষদ পরিবর্তনের। তবে এই সময়ে এটিকে ব্রেকফাস্ট টেবিলে চায়ের সঙ্গে মুড়মুড়ে সংবাদ হিসেবে নিয়ে এসেছেন সাবেক উপদেষ্টা এবং এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম। তিনি কয়েক দিন আগে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সরকারের উপদেষ্টাদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে লিয়াজোঁ রেখেছে এবং তারা নিজেদের সেফ এক্সিটের কথাও ভাবছে।‘ সেই সাক্ষাৎকারে ‘সময় হলে’ তাদের নামও প্রকাশ করার কথাও তিনি বলেছেন।নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে ফোটা খৈকে আরেকটু ভেজেছেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তার বক্তব্য ছিল ‘ কিছু উপদেষ্টার মধ্যে দেখা যাচ্ছে, তারা কোনোভাবে দায়সারা দায়িত্ব পালন করে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেফ এক্সিট নিতে পারলেই হলো। এই দায়সারা দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অভ্যুত্থান-পরবর্তী একটি সরকার কাজ করতে পারে না। তারা এত শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ওখানে আছেন। তারা যদি এমনটা করে থাকেন, তাহলে দেশের মানুষের সামনে মুখ দেখাতে পারবেন না। যারা এ ধরনের চিন্তা করেন, তাদের জন্য মৃত্যু ছাড়া কোনও সেফ এক্সিট নেই। পৃথিবীর যে প্রান্তে যান, বাংলাদেশের মানুষ তাদের ধরবে।‘তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকা এবং লন্ডন সফরে প্রধান উপদেষ্টাসহ আরও একজন উপদেষ্টা এই ধাওয়ার মুখে পড়েছেন বলেই তিনি এই বক্তব্য দিয়েছেন।তবে এনসিপির এই দুই নেতার বক্তব্যের বিরোধিতা অন্য উপদেষ্টারা না করলেও এই দুই নেতার এই ধরনের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। গণমাধ্যমেই তিনি বলেছেন, ‘দেশের বিভিন্ন সময়ে নানা ঝড়-ঝঞ্ঝায় কোথাও পালিয়ে যাইনি।‘ তিনি আরও বলেছেন আগামীতেও দেশে থাকবো। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকেই পরিষ্কার করতে হবে, কারা সেফ এক্সিট (নিরাপদ প্রস্থান) চায়। ‘আবার এর পাশাপাশি কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দলের সভাপতি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করে কয়েকজন উপদেষ্টা ক্ষমা চেয়ে সেফ এক্সিটের কথা বলেছেন বলে সংবাদ বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিক প্রকাশ করে পরবর্তীতে সেটি তুলে নেয়। আপাতভাবে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করা এই গুজব সেফ এক্সিট গুঞ্জন যেন হঠাৎ হালে পানি পায় নাহিদ ইসলামের করা বক্তব্যে। অনেকের মনেই এটি জেঁকে বসে আছে যে সেফ এক্সিট তাহলে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঘটতে যাওয়া একটি সম্ভাবনা?এখন খুব জোরালো একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন মনে এসে খোঁচা দিতে পারে, হঠাৎ সেফ এক্সিটের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মোড়ের ইঙ্গিত কেন দিলেন নাহিদ ইসলাম এবং এনসিপি নেতারা? অনেকেরই শঙ্কা তাহলে কিংস পার্টি হিসেবে তকমা পাওয়া দল এনসিপির সঙ্গে কি উপদেষ্টা পরিষদের বনিবনা হচ্ছে না? এই ‘অ-বনাবনি’র জায়গা কী? আদর্শগত? নাকি স্বার্থ? আবার কেউ কেউ অতি সন্দিহান হয়ে এটিকে একটি ‘রাজনৈতিক কৌশল’ জনিত খেলা হিসেবেই দেখতে চান।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের অনেকেই লিখছেন, ‘এটি দুই পক্ষের দেখানো খেলা, যেখানে কোনও ফলাফল নেই।‘অনেক ধরনের বক্তব্য এবং সম্ভাবনার কথা বিভিন্ন পক্ষ থেকে গত এক বছরে আলোচনায় এলেও ‘সেফ এক্সিট’ বিষয়টি অনেকেরই মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। এর কারণ কী? এর পেছনের কারণগুলোর একটি হলো অধ্যাপক ড. ইউনূসের নেতৃত্বে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মানুষের কাছে কিছুতেই আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারছে না। বিশেষ করে বিগত সরকারের সময়ে তৈরি হওয়া ক্ষোভের জায়গাগুলো সবার বিপরীতে ক্ষতকে আরও দগদগে করেছে। অনেকটাই ঠিক, ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’র মতো।দেশ চালানোর ক্ষেত্রে মুন্সিয়ানার বিপরীতে অধ্যাপক ইউনূসের পরতে পরতে হোঁচট খাওয়া এবং ‘প্রতিশোধপরায়ণ’ মনোভাব অজনপ্রিয়তার পাশাপাশি অনাস্থার জায়গাও তৈরি করেছে। যদিও প্রধান উপদেষ্টা দাবি করেছেন, ‘এমন মানুষও রয়েছেন, যারা বলছেন আপনি ৫ বছর থাকুন, ১০ বছর থাকুন, ৫০ বছর থাকুন। সুতরাং, মানুষ নানা ধরনের কথাই বলে। তারা বলে নির্বাচনের দরকার কী? কার নির্বাচন দরকার?’ এমন মানুষ থাকতেই পারে, সেটি অবিশ্বাস্য নয়, তবে প্রশ্ন হলো এটি বাংলাদেশে বসবাস করা বেশিরভাগ মানুষের মনের কথা কিনা? প্রধান উপদেষ্টা কতটা এ দেশের মানুষের মনের কথা শুনেছেন? শুনে থাকলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারতেন নির্বাচনের জন্য মানুষ কতটা মুখিয়ে আছে, আর নির্বাচন নিয়ে তারা কতটা তার সরকারকে অবিশ্বাস করছে।এর পাশাপাশি বর্তমানে উপদেষ্টাদের নিয়ে আরও আলোচনার খোরাক করে দিয়েছেন উপদেষ্টাদের অনেকেই। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বিভিন্ন কার্যক্রম এবং কথাবার্তার পাশাপাশি নিজের আরেক এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লার এলাকায় উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে আলোচনায় আছেন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ। অন্তর্বর্তীদের আমলে দুই জন উপদেষ্টার ব্যক্তিগত সহকারীকে দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত করা হয়। তবে অন্যান্য সময়ের মন্ত্রীদের মতোই উপদেষ্টাদের দুর্নীতির খবর এখন পর্যন্ত গণমাধ্যমে খুব একটা প্রকাশিত হয়নি। অনেকেই বলছেন, জমা আছে, ক্ষমতা থেকে সরে গেলেই প্রকাশিত হবে। তাই কারোটাই জানা যাচ্ছে না এখন। তবে কোনও উপদেষ্টাই যে সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করেননি সেই সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে উপদেষ্টাদের সেফ এক্সিট নিয়ে নাহিদ ইসলাম এবং সারজিস আলমের বক্তব্যের বিপরীতে এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি বিএনপি। অধ্যাপক ইউনূসের মধ্যে সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান জিয়াউর রহমানের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়ার পর থেকেই দেশে ফিরেও বক্তব্যহীন আছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।হালের খবর হচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর বাসায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত তিনটি দেশের রাষ্ট্রদূতরা বৈঠক করেছেন। সরকারের জন্য এটি কিছুটা অনভিপ্রেত এবং এই বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ‘করতেই পারে’ বলে সরকারি অস্বস্তিকে হালকা করেছেন। এই সংবাদ এবং এই বৈঠকের বিবেচ্য বিষয়ই এই ‘এক্সিট’ বিষয়ক গুঞ্জন এবং জল্পনাকে আরেকটু এগিয়ে রেখেছে বললে খুব একটা ভুল হবে না।তবে কবে নাহিদ ইসলাম সেই উপদেষ্টাদের নাম ঘোষণা করবেন সেই জন্য সবাই কম-বেশি অপেক্ষা করছেন। বাস্তবতা বিশ্লেষণে মনে হচ্ছে সেফ এক্সিটের আকাঙ্ক্ষা কি উপদেষ্টাদের কারো কারো মনের কোথাও না কোথাও আস্কারা পাচ্ছে?লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: [email protected]