সমুদ্রের অগাধ ভান্ডার: ব্লু ইকোনমি নিয়ে নতুন ভাবনা

সমুদ্রের অগাধ ভান্ডার: ব্লু ইকোনমি নিয়ে নতুন ভাবনা

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা শুধু নীল সমুদ্রের বিশাল বিস্তৃতি নয়, এটি আগামী প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য দান। ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে বাংলাদেশ যে বিপুল সমুদ্রসীমা পেয়েছে, তারপর থেকেই আমরা এক নতুন সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই সমুদ্রসীমা আমাদের দেশের মোট স্থলভাগের ৮২ শতাংশের সমান। স্পষ্ট হচ্ছে যে, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এমন এক সমৃদ্ধি যা আমাদের অর্থনৈতিক মানচিত্র পাল্টে দিতে পারে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, ব্লু ইকোনমি এখন আর শুধু তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয় জাতীয় স্বপ্ন ও অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে জায়গা করে নেওয়ার মতো এক বাস্তবতা।বাংলাদেশ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৪৭৫ প্রজাতির মাছ, ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি, ২০ প্রজাতির কাঁকড়া এবং ৩৩৬ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক বিদ্যমান যা দেশের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে (BdFisheries, 2023)। এর পাশাপাশি আছে ডলফিন, তিমি, অক্টোপাসের মতো বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার তাদের সামুদ্রিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে ইতিমধ্যেই অর্থনৈতিকভাবে অনেক লাভবান হয়েছে। অথচ আমরা এখনও সম্ভাবনার দরজায় দাঁড়িয়ে।

অন্যদিকে, অপ্রাণিজ সম্পদের ভান্ডারও কম নয়। সমুদ্রতলে পাওয়া যাচ্ছে তেল-গ্যাস, ইউরেনিয়াম, থোরিয়ামসহ নানা খনিজ সম্পদ। বিশেষ করে সমুদ্রবালুতে রয়েছে ইলমেনাইট, জিরকন, রুটাইল, মোনাজাইট ইত্যাদি মূল্যবান খনিজ। এগুলো দিয়ে তৈরি হয় আধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ, এমনকি মহাকাশ গবেষণার সরঞ্জামও। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু কক্সবাজার ও টেকনাফের সৈকতের বালুতেই কয়েক বিলিয়ন ডলারের জিরকন (গহনা ও শিল্পে ব্যবহৃত মূল্যবান পদার্থ) রয়েছে (Geological Survey of Bangladesh [GSB], 2021)। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা এখনও এসব সম্পদ চিহ্নিত, উত্তোলন বা রফতানির প্রস্তুতি নিতে পারিনি।

এই প্রেক্ষাপটে মোটাদাগে বলতে গেলে, ব্লু ইকোনমির মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিবছর অন্তত আড়াই লাখ কোটি টাকা আয় করতে সক্ষম। চারটি খাত মৎস্য আহরণ, তেল-গ্যাস উত্তোলন, বন্দর সম্প্রসারণ ও পর্যটন এই বিশাল আয়কে সম্ভব করতে পারে। অথচ এখনও পর্যন্ত সমুদ্র থেকে আহরিত মাছ দেশের মোট মাছের মাত্র ১৫-২০ শতাংশ। এর পেছনে কারণ হলো আধুনিক ট্রলার ও ডিপ-সি প্রযুক্তির অভাব, দক্ষ জনবলের ঘাটতি, এবং গবেষণার সীমাবদ্ধতা। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে প্রশাসনিক অদক্ষতা ও দীর্ঘসূত্রিতা।

যেহেতু গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণার ওপর নির্ভরশীল সেহেতু বাংলাদেশ এখানে মারাত্মকভাবে পিছিয়ে আছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না এখনও আমাদের সমুদ্রসীমায় কোনও অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়নি। অথচ ভারত ও মিয়ানমার ইতোমধ্যেই তাদের অফশোর ব্লকগুলোতে অনুসন্ধান করে গ্যাস উত্তোলন করছে। এই বৈপরীত্য শুধু সম্ভাবনার অপচয় নয়। এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় ক্ষতি।আমরা যখন সম্ভাবনার কথা বলি, তখন মানবসম্পদের ঘাটতির কথাও উঠে আসে। দক্ষ জনবল ছাড়া কোনও খাতই টেকসই হয় না। যদিও দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় ও ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তবুও এগুলো এখনও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। আধুনিক প্রযুক্তি চালাতে প্রয়োজনীয় নাবিক, প্রকৌশলী ও সামুদ্রিক বিজ্ঞানী তৈরি হয়নি। অথচ নরওয়ে, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া দক্ষ জনবল গড়ে তুলে বৈদেশিক বাজার দখল করেছে। তাই মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া ব্লু ইকোনমি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

ব্লু ইকোনমির আলোচনায় পরিবেশ একটি বড় প্রশ্ন। সমুদ্র শুধু সম্পদ নয়, নাজুক জীববৈচিত্র্যের ভান্ডারও। কিন্তু প্রতিদিন দেশের নদী-নালা থেকে প্রায় আট হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে জমছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শিপব্রেকিং শিল্পের তেল ও রাসায়নিক বর্জ্য। এসব দূষণ সামুদ্রিক প্রাণী হত্যা করছে, মাছ-চিংড়ির ডিম নষ্ট করছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজনন হুমকির মুখে ফেলছে। যদি এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আমাদের অমূল্য সামুদ্রিক সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাবে।

এই সংকটকে আরও জটিল করছে নজরদারির দুর্বলতা। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বিশাল, কিন্তু কোস্টগার্ড আর নৌবাহিনীর সক্ষমতা তুলনামূলক সীমিত। এর ফলে অবৈধ মাছ ধরা একটি ভয়াবহ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত, মিয়ানমার এমনকি দূর দেশের জেলেরা আমাদের সমুদ্রে ঢুকে বিপুল পরিমাণ মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা প্রমাণ সংগ্রহ বা প্রতিরোধ করার মতো শক্তিশালী ব্যবস্থা এখনও গড়ে তুলতে পারিনি। বাংলাদেশ কোস্টগার্ড এবং আন্তর্জাতিক IUU (অবৈধ মাছ ধরা Fishing Watch (2023) এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর অবৈধ, অনিয়ন্ত্রিত ও অনিবন্ধিত (IUU) মাছ ধরার কারণে বাংলাদেশ আনুমানিক হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এটা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয় অধিকন্তু জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও বটে।

এর পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। তথ্য বলছে, ইতোমধ্যেই চীন, জাপান, ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিভিন্ন প্রকল্পে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করছে। জাপান আমাদের বন্দর উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে, চীন ডিপ-সি ফিশিং ট্রলার প্রযুক্তিতে সাহায্য দিচ্ছে, আবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সহায়তা করছে। তবে মনে রাখা দরকার, শুধু সাহায্য নিলেই হবে না, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করাও জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ নীতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আইনগত নিরাপত্তা। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের “Ease of Doing Business” প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নীতি-অসঙ্গতি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে পিছিয়ে আছে (World Bank, 2023)।

তাই বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের ভেতরের ঘাটতি দূর করে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে কার্যকর করে তোলা।

তবু সত্য হলো, আমরা এখনও কোনও পূর্ণাঙ্গ “মেরিটাইম অথিউরিটি” গঠন করতে পারিনি। ফলে একাধিক মন্ত্রণালয় ও দফতরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রকট হয়ে উঠছে। যেমন, পরিবেশ মন্ত্রণালয় একভাবে কাজ করছে, মৎস্য মন্ত্রণালয় আরেকভাবে, আবার জ্বালানি মন্ত্রণালয় সম্পূর্ণ ভিন্ন কাঠামোয় কাজ করছে। অথচ যদি একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ থাকতো, তাহলে সব কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা যেতো।আমরা যখন নিজেদের সীমাবদ্ধতা আর চ্যালেঞ্জের কথা বলি, তখন অন্য দেশের অভিজ্ঞতার কথাও উঠে আসে। তাহলে প্রশ্ন, আমরা কি তাদের কাছ থেকে কিছু শিক্ষা নিতে পারি না? অবশ্যই পারি। নরওয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রসম্পদকে জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা মৎস্য আহরণে কোটা-ভিত্তিক নীতি চালু করেছে, যাতে অতিরিক্ত মাছ ধরা হয় না এবং প্রজনন চক্র ব্যাহত হয় না। এই নীতির ফলে তারা কেবল নিজেদের চাহিদা মেটাচ্ছে না, উল্টোদিকে বৈশ্বিক মাছ বাজারেও একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করছে। অন্যদিকে, মালদ্বীপ সামুদ্রিক পর্যটনকে এমনভাবে কাজে লাগিয়েছে যে আজ তাদের জাতীয় অর্থনীতির প্রধান ভরকেন্দ্র হলো ব্লু ট্যুরিজম। সাদা বালুর সৈকত, গভীর সমুদ্রের ডাইভিং, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের অভিজ্ঞতা সবকিছু মিলিয়ে তারা বৈদেশিক মুদ্রার বিশাল প্রবাহ নিশ্চিত করতে পেরেছে। অথচ বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা মালদ্বীপের তুলনায় বহু গুণ বড় তবুও আমরা সেই সম্ভাবনার সামান্য অংশও কাজে লাগাতে পারিনি।

অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম আমাদের জন্য ভালো দৃষ্টান্ত। ইন্দোনেশিয়া জেলেদের স্বার্থ রক্ষা করেই বিদেশি বিনিয়োগ টেনেছে। ভিয়েতনাম কফির পাশাপাশি মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য রফতানিকে জাতীয় কৌশল বানিয়েছে। কিন্তু আমাদের চিত্রটা আলাদা। আমরা এখনও অভ্যন্তরীণ বাজারে আটকে আছি। রফতানির সুযোগ থাকলেও বড় আকারে ঢুকতে পারিনি। তাই আমার মতে, এখানেই আমাদের সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত।

তাহলে করণীয় কী? আমার মনে হয়, করণীয় খুব পরিষ্কার। প্রথমত, সমুদ্রতলে জরিপ ও অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। এখনও পর্যন্ত আমাদের কোনও গভীর সমুদ্র কূপ খনন হয়নি এটা এক বিশাল ব্যর্থতা। দ্বিতীয়ত, আধুনিক ডিপ-সি ফিশিং ট্রলার ও গবেষণা জাহাজ সংগ্রহ করতে হবে। এগুলো ছাড়া গভীর সমুদ্রের মাছ ধরা প্রায় অসম্ভব।

তৃতীয়ত, গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে দক্ষ নাবিক, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানী তৈরি করতে হবে।

চতুর্থত, পরিবেশ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন করতে হবে এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

পঞ্চমত, একটি একক মেরিটাইম অথিউরিটি গঠন করতে হবে যাতে সব কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালিত হয়। ষষ্ঠত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করতে হবে। চীন, জাপান, ভারত কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে।

সবশেষে, ব্লু-বন্ড, এসএমই ফাইন্যান্সিং বা নতুন বিনিয়োগ মডেলের মাধ্যমে এ খাতে অর্থনৈতিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতা। সাধারণ মানুষকে বুঝতে হবে যে, সমুদ্র কেবল বিনোদনের জায়গা নয় এটি আমাদের ভবিষ্যৎ জীবিকার ভরসা। যদি আমরা এখনই দায়িত্বশীল না হই, তবে আগামী প্রজন্ম হয়তো এই ভান্ডারের কিছুই হাতে পাবে না। তাই স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে গণমাধ্যম পর্যন্ত ব্লু ইকোনমি নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, মানুষের মনোজগতে বিষয়টি পৌঁছে দিতে পারলেই জাতীয় নীতিও আরও দৃঢ় হবে। সমুদ্র কেবল আমাদের সম্পদ নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের ভরসা। আজ যদি আমরা ব্যর্থ হই, আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।

লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক [email protected]

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin