সেনানিবাসে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের বিচার

সেনানিবাসে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের বিচার

বিগত সরকারের সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনা ঘটেছে। জুলাই বিপ্লবের পরে এই বিষয়ে আলাপ শুরু হয়েছে বিষয়টি এমন নয়। বরং শেখ হাসিনার শাসনামলেই গণমাধ্যমে ওই সংক্রান্ত বহু সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। অনেক কলামিস্টই এই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে কলাম লিখেছেন। আমি নিজেও এই বিষয়ে সোচ্চার ছিলাম এবং একাধিক কলাম লিখেছি। কিন্তু তৎকালীন সরকার সেই বিষয়ে কর্ণপাত করেনি। কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। তাই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের যে উদ্যোগ বর্তমান সরকার নিয়েছে তা আমাদের কাছে সাধুবাদ পাবে।আমরা চাই আধুনিক সভ্য সমাজে নাগরিকরা মুক্তভাবে তাদের ব্যক্তিগত, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মত প্রকাশ করবে এবং উক্ত মত প্রকাশের জন্য তারা রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে নিপীড়নের শিকার হবে না। আর ওই বিষয়টি নিশ্চিত করতে চাইলে অবশ্যই বিগত সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার হতে হবে।কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ায় উদ্দেশ্য কোনও প্রতিষ্ঠানের বা ব্যক্তির প্রতি আক্রমণ না হয় সেই বিষয়টিও লক্ষ রাখতে হবে। সার্বভৌমত্বের প্রতীক সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করা, অস্থির করার চক্রান্ত যেন না হয়- সেটিও বিবেচনা করতে হবে। আমরা সাম্প্রতিক সময়ে দেখেছি কেউ কেউ সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করে বক্তব্য দিয়েছেন। কেউ কেউ এক পা এগিয়ে সেনানিবাসকে ‘জ্বালিয়ে’ দিতে চেয়েছেন। যদিও সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া জুলাইয়ে সরকার পরিবর্তন অসম্ভব ছিল। আজ যেসব অফিসারকে, জুলাইয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে গুলি চালানো গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গ্রেফতার করতে নির্দেশ প্রদান করেছে তারা সেনাবাহিনীর সম্মিলিত সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে জুলাই আন্দোলনের বিপক্ষে গিয়ে বিদ্রোহ করেননি। এই পরিপ্রেক্ষিতে যে কোনও কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণের আগে সেনাবাহিনীর জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার পক্ষের ওই অবস্থান সব পক্ষকে অবশ্যই আমলে নিতে হবে।জুলাই বিপ্লবের আগে বিগত সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানে রাজনীতিকরণ হয়েছে। বিগত সরকারের সময়ে একপক্ষীয় নির্বাচন হয়েছে। আজ যে রাজনৈতিক সংকট চলছে তা ওই গণতান্ত্রিক যাত্রার বিঘ্ন হওয়ার ‘আফটার শক।’ সেই বিবেচনায় দেশের বর্তমান সংকটের দায়ভারও সেনাবাহিনীর সাবেক ও বর্তমান দায়িত্বশীলদের কাঁধে বর্তায়। একইভাবে আজ যদি সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীলরা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হন তাহলে শুধু প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেনাবাহিনী ধ্বংস হবে তা নয়, দেশ ও জাতি চরম সংকটে পড়বে।বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে। সীমান্তে আরাকান আর্মির উত্থান এই বার্তা দেয় যে বাংলাদেশ ভূখণ্ড হারানোর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সেনাবাহিনীসহ সব পক্ষকে এই সত্য বুঝতে হবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ‘ক্যাচালে’ পড়ে সার্বভৌমত্ব তথা ভূখণ্ড রক্ষার ওই মহাদায়িত্ব থেকে সেনাবাহিনীর মনোযোগ সরে না যায় সেই বিষয়টি সর্বাগ্রে ভাবতে হবে।বাংলাদেশ এখন ভূ-রাজনীতির খেলার মাঠ। ওই মাঠের খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলার মতো সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তি বাংলাদেশের নেই। তাই অপ্রিয় চরম সত্য হচ্ছে, বাংলাদেশের পক্ষে ওই খেলা বন্ধ করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ না চাইলেও এই ভূখণ্ডে পরাশক্তির খেলাধুলা চলবে। কিন্তু বাংলাদেশ যে কাজটি করতে পারে তা হলো ওই খেলার মাঠ যেন কারোর স্থায়ী দখলে চলে না যায়, বাংলাদেশের সীমানা যেন খণ্ডিত না হয় তা রক্ষা করতে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সেই কাজটি করতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী অবস্থানে রাখতে হবে।সেনাবাহিনীর কাজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট সমাধান করা নয়, বরং বাইরের শত্রুর আক্রমণ ও সন্ত্রাসবাদ দমন করে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। ইতোমধ্যে, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সেনাবাহিনী নিয়োজিত হওয়ায় তাদের ওই মূল দায়িত্ব পালন বহুলাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণভাবে সেনাবাহিনী অস্থির হলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কঠিন সংকটে পড়বে।সেনাবাহিনী অস্থির হলে দেশের সার্বভৌমত্ব শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং দেশে ইসলামী সন্ত্রাসবাদের চরম প্রভাব বাড়বে। বাংলাদেশে যারা ইসলামি বিপ্লবের স্বপ্নে দিন গুনছে তারা দীর্ঘদিন থেকেই সেনাবাহিনীর দুর্বলতার সুযোগ খুঁজছে। হলি আর্টিজানের ঘটনা প্রমাণ করছে যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ইসলামি সন্ত্রাসবাদ প্রশ্নে জিরো টলারেন্স নীতি সর্বদা গ্রহণ করেছে। তাই ইসলামি সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ মনে করে। শুধু ইসলামি সন্ত্রাসবাদ গ্রুপ নয়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুর্বলতার সুযোগ খুঁজছে আরাকান আর্মি ও কুকিচিনের মতো ট্রান্স বিচ্ছিন্নবাদী গ্রুপও। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে দুর্বল হলে, সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম আকার নিলে আরাকান আর্মি ও কুকিচিনের মতো নন-স্টেট অ্যাকটরগুলোর প্রভাবে বাংলাদেশের সীমান্ত চলে যাবে।আইন সবার জন্য সমান। কোনও সেনা কর্মকর্তা বা সৈনিক যদি অপরাধে যুক্ত হন তাহলে অবশ্যই তার বিচার হতে হবে। কিন্তু সেই বিচার অসামরিক ফৌজদারি কোর্টে হতে হবে এমন গো-ধরা আইনের শাসন পরিপন্থি। যদি কোনও সেনা কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনের বাইরে ব্যক্তিগত কারণে অপরাধে যুক্ত হয়েছে এমন প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে অবশ্যই তার বিচার সেনা আইনে নয়, সামরিক আদালতে নয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো বেসামরিক আদালতে হওয়ার বিষয়ে কারোর আপত্তি থাকার কথা নয়।নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিচার বাংলাদেশের বেসামরিক ফৌজদারি আদালতে হয়েছে। সেনাবাহিনী বাহিনী হিসেবে ওই মামলার ক্ষেত্রে আপত্তি উত্থাপন করেনি অথবা ওই অভিযুক্তদের সামরিক আইনে সামরিক আদালতে বিচারের দাবি উত্থাপন করেনি।কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার ঘটনা মেলানোর সুযোগ নেই। কারণ জুলাই বিপ্লবের সময় যেসব সেনা সদস্য প্রাথমিক পর্যায়ে আন্দোলনকারীদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল তা তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছায় নাকি সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে নিয়েছিল কিনা তা প্রথমে খতিয়ে দেখতে হবে। যদি দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে ওই সব সদস্য বাহিনীর নির্দেশ পালন করেন তাহলে তার দায়ভার ব্যক্তি হিসেবে তার ওপর আদৌ বর্তায় কি?অন্যদিকে, এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে তাতে বিগত সরকারের সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের যেসব ঘটনা ঘটেছে তা রাষ্ট্রীয় মদতে ঘটেছে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের প্রচ্ছন্ন ছত্রছায়ায় ঘটেছে। উদ্দেশ্যও পরিষ্কার ছিল। বিরোধী মত ও কণ্ঠকে দমন করে ক্ষমতায় থাকার জন্য এমন হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনা অনেক ক্ষেত্রে ঘটেছে। ওই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে রাষ্ট্রীয় নির্দেশ উপেক্ষা করে রুটি-রুজি হারানোর মতো সাহসী হওয়া সবার পক্ষে সম্ভব ছিল না, সেই বিষয়টিও আমলে নেওয়া দরকার। অবশ্যই অনেক সেনা কর্মকর্তা যে ব্যক্তিগত লাভ, যেমন প্রমোশন পাওয়া, সরকারের আস্থাভাজন হওয়া এবং বাহিনীর ভিতরে প্রভাব বিস্তার করার জন্য এমন কাজে স্বেচ্ছায় যুক্ত হয়েছেন তাও সত্য।তাই সেনাবাহিনীর প্রতি আক্রোশ বা প্রতিশোধ নেওয়া না হয়ে মূল উদ্দেশ্য যদি ন্যায়বিচার হয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়, যারা গুমের শিকার হয়েছেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করা হয়, তাহলে কোথায় বিচার হচ্ছে সেই বিষয়টি মুখ্য নয়। সেনা আইনে ও আদালতে বিচার হলেও ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব।আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংবিধানসম্মত প্রভাবশালী আদালত হলেও এই আদালতে সেনা সদস্যদের বিচারের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, ভবিষ্যতে ওই বিচারের রাজনৈতিক পক্ষপাত স্পষ্ট হবার সম্ভাবনার বিষয়টি। কারণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের অনেকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আদর্শ ও লক্ষ এবং রাজনৈতিক পরিচয় সুস্পষ্ট। সুতরাং ভবিষ্যতে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক দল বা আদর্শের পক্ষে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে সেনা অফিসারদের দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার চাপের সম্ভাবনা সব সময় থেকেই যাবে। এক্ষেত্রে ন্যায়বিচার বা ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পথ রুদ্ধ হবার সম্ভাবনা রয়েছে।সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা বাংলাদেশের সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আপসহীন। সেনাবাহিনীর ওই অবস্থান তারা বিভিন্ন সময়ে প্রমাণও করেছে। ইতোমধ্যে তারা গ্রেফতারি পরোয়ানা পাওয়া সেনা সদস্যদের নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে। তাই গুম-খুনে জড়িত সেনা সদস্যদের বিচারে সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থা রাখা যেতে পারে।সেনাবাহিনীর শক্তি আধুনিক অস্ত্রেশস্ত্রে নয়, তার মর্যাদায় লুকিয়ে থাকে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের বিচার করার নামে সৈনিকদের ওই আত্মমর্যাদায় আঘাত করা সমীচীন হবে না। অবশ্যই আমরা বিচার চাই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সেনাবাহিনী প্রচলিত অন্য প্রতিষ্ঠানের মতো নয়, এমনকি পুলিশ ডিসিপ্লিন ফোর্স হলেও সেনাবাহিনী ও পুলিশের মধ্যে ডিসিপ্লিনের ক্ষেত্রে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে, সেই বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমকে আমলে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে গুম-খুনে অভিযুক্ত সেনা সদস্যদের বিচারের ক্ষেত্রে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।[email protected]

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin