সাবজেক্টিভিটি

সাবজেক্টিভিটি

পৃথিবীতে যেকোনো জিনিস দেখার ও বোঝার দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি থাকে: একটা হলো সাবজেক্টিভিটি এবং আরেকটি হলো অবজেক্টিভিটি। যখন কোনো ব্যক্তি সামাজিক কোনো ঘটনা বা ক্রিয়াকে তার অভিজ্ঞতা, আবেগ ও তার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখে তখন সেটাকে বলা হয় সাবজেক্টিভিটি। যেমন: কোনো মানুষ যদি আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করে এবং আপনি যদি সেটার উপর ভিত্তি করে তাকে বিচার করেন—প্রচণ্ড রকম ভাবে রেগে যান বা দুঃখ পান তাহলে সেটাকে বলা হয় সাবজেক্টিভিটি। যদি আপনি এর বাইরে গিয়ে ভাবেন ওই মানুষটার খারাপ ব্যবহারের পিছনে হয়ত তার ব্যক্তিগত কোনোকিছু আছে বা কোনো ঘটনা আছে সেটা অবজেক্টিভিটি। এই ভাবনাগুলো অর্থাৎ আবেগ, অনুভূতির পর্দার পিছনের সত্যটাকে দেখার নামই অবজেক্টিভিটি।

'Subjective' শব্দটি ল্যাটিন শব্দ 'Subjungere' থেকে এসেছে যার অর্থ 'অধীনস্থ করা' বা 'আবদ্ধ করা'।

দার্শনিক রেনে দেকার্তের "Cogito, ergo sum"—অর্থাৎ "আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি"—এই বিখ্যাত উক্তির মাধ্যমেই মানুষকে একটি সচেতন, আত্মসচেতন সত্তা হিসেবে ভাবার ভিত্তি তৈরি হয়। সাবজেক্টিভিটির ধারণা এখান থেকেই আসে, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে চিন্তাশীল, অনুভূতিশীল ও স্বাধীন সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবে উপলব্ধি করে। এই অর্থে, সাবজেক্টিভিটি বলতে বোঝায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যাখ্যা, মতাদর্শ ও বিশ্ব দৃষ্টির প্রকাশ।

সাবজেক্টিভিটি শব্দটি বহুবিধ অর্থে ব্যবহৃত হয়। এর সবচেয়ে নিরপেক্ষ সংজ্ঞা হতে পারে— একজন ব্যক্তির চিন্তা, অনুভূতি, বিশ্বাস ও আকাঙ্ক্ষার সমষ্টি, যা তার আত্মপরিচয় গঠন করে। তবে, প্রথাগত বৈজ্ঞানিক আলোচনায় সাবজেক্টিভিটিকে প্রায়ই অবজেক্টিভিটির বিপরীতে রাখা হয়। অবজেক্টিভিটি যেখানে পক্ষপাতহীনতা ও নিরপেক্ষতার প্রতীক, সেখানে সাবজেক্টিভিটিকে অনেক সময় পক্ষপাত বা ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়। সিগমুন্ড ফ্রয়েড, লাঁকা, মার্ক্স, লুই আলথুসার, দেরিদা, ফুকো এবং ফ্রানৎস ফানোঁ প্রমুখ তাত্ত্বিকেরা এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন।

সিগমুন্ড ফ্রয়েডের অবচেতন মন তত্ত্বের আলোকে, সাবজেক্টিভিটির ধারণা এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ব্যক্তি হিসেবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার গভীরতম স্তরের সঙ্গে সাবজেক্টিভিটি যুক্ত। ফ্রয়েড বলেছিলেন, "আমাদের মন শুধু চেতনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—বরং অবচেতন স্তরে থাকা দমনকৃত ইচ্ছা, ভয়, স্মৃতি ও মানসিক দ্বন্দ্ব আমাদের আচরণ ও চিন্তাধারাকে নির্ধারণ করে।" এই অবচেতন ভাবনা থেকেই গড়ে ওঠে ব্যক্তির সাবজেক্টিভিটি, যার মাধ্যমে সে বিশ্বকে ব্যাখ্যা করে ও আত্ম-পরিচয় নির্মাণ করে। সাহিত্য বিশ্লেষণে এ ধারণা প্রয়োগ করলে দেখা যায়, একটি চরিত্রের বা লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি কেবল তার সচেতন সিদ্ধান্ত নয়, বরং তার ভেতরকার অস্পষ্ট মানসিক বাস্তবতার প্রতিফলন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, কারণ এটি ব্যক্তিসত্তার গভীরতা ও জটিলতা তুলে ধরে। তবে এর সীমাবদ্ধতা হলো এতে ব্যক্তি সবসময় নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না অর্থাৎ সাবজেক্টিভিটি আংশিকভাবে অজানা ও অনির্দেশ্য।

জ্যাক লাকাঁ এ ধারণাকে ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে বলেন—"অবচেতন মনের কাঠামো ভাষার মতোই; অর্থাৎ, ব্যক্তি ভাষার ভেতর দিয়েই সত্তার রূপ পায়।" শিশুর 'দর্পণ ধাপে' অর্থাৎ আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বে সে প্রথমবার নিজেকে চেনে। কিন্তু সেটি একটি কাল্পনিক চিত্র, এমন এক 'আমি' যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেই, তবে শিশুটি সেটাকেই নিজের পরিচয় ভেবে নেয়। এরপর ভাষায় প্রবেশের মাধ্যমে সে সামাজিক নিয়ম, লিঙ্গ এবং ক্ষমতার কাঠামোর ভেতর নিজেকে খুঁজে পেতে শুরু করে।মার্ক্স ও আলথুসার দেখিয়েছেন, মতাদর্শের কাঠামোর মধ্যে ব্যক্তি গড়ে ওঠে। সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন: শিক্ষা, ধর্ম, পুলিশ) ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট পরিচয়ে আহ্বান করে এবং তাকে একটি নির্দিষ্ট সাবজেক্টে রূপ দেয়। বোঝায় যে, ব্যক্তি স্বাধীনভাবে নিজের পরিচয় গঠন করে না—বরং ক্ষমতার কাঠামো তাকে গড়ে তোলে। এটি একটি নেতিবাচক দিক, কারণ এতে ব্যক্তি নিজের ইচ্ছার বাইরে গঠিত হয়। তবে একইসঙ্গে এটি একটি বাস্তব উপলব্ধি, যা ব্যক্তিসত্তার সামাজিক নির্মাণকে বুঝতে সাহায্য করে।দেরিদা ও ফুকো দেখিয়েছেন, সাবজেক্ট কখনোই স্থির নয় বরং ভাষা, জ্ঞান ও ক্ষমতার মধ্য দিয়ে গঠিত ও পুনর্গঠিত হয়। ফুকোর মতে, সমাজে বিদ্যমান ডিসকোর্স ব্যক্তিসত্তাকে নির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করে, যেমন: 'পাগল', 'অপরাধী' বা 'স্বাভাবিক'। এর দ্বারা বোঝায়, ব্যক্তি সবসময়ই ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ। তবে এই বিশ্লেষণ ব্যক্তিসত্তার গঠন প্রক্রিয়াকে উন্মোচন করে।সাবজেক্টিভিটিকে ফ্রানৎস ফানোঁ ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় দেখিয়েছেন, কীভাবে উপনিবেশিত ব্যক্তি ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির আয়নায় নিজেকে দেখে এবং নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলে। এটি সাবজেক্টিভিটির একটি গভীর সংকট, যেখানে ব্যক্তি নিজের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবে ফানোঁ দেখিয়েছেন, এই সংকট থেকে মুক্তির পথও আছে—যেখানে ব্যক্তি নিজের ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতিকে পুনরুদ্ধার করে আত্মপরিচয় গড়ে তোলে।সাবজেক্টিভিটি সাহিত্যের মধ্যকার গভীর পরিচয়, আবেগ ও ক্ষমতার প্রবাহকে ধরতে সাহায্য করে। এটি বোঝায়, সাহিত্য কেবল গল্প বলার একটি মাধ্যম নয়, এটি ব্যক্তিগত ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন এবং অর্থ-নির্মাণের একটি চলমান প্রক্রিয়া।

প্রতিটি লেখক তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, লিঙ্গ, শ্রেণি, ভাষা এবং বিশ্বাসের ছাঁকনিতে সাহিত্য নির্মাণ করেন। উদাহরণস্বরূপ, একজন নারী লেখক পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা নিয়ে নারীর ভেতরগত অনুভব ফুটিয়ে তুলতে পারেন, যা পুরুষ লেখকের পক্ষে নাও সম্ভব হতে পারে। তাই লেখকের সাবজেক্টিভিটি, সাহিত্যে সমাজের ভিন্ন বাস্তবতাকে উঠে আসতে দেয়।

আবার সাহিত্য বিশ্লেষণে সাবজেক্টিভিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কারণ প্রতিটি পাঠক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একটি সাহিত্যকর্মকে গ্রহণ করেন। এই ব্যতিক্রমী পারিপার্শ্বিকতা ও মানসিক কাঠামোই পাঠকের দৃষ্টিতে অর্থের রং বদলায়। ফলে একটি লেখার একই অনুচ্ছেদ একজন পাঠকের জন্য গভীর বেদনাবোধের কারণ হতে পারে, অন্যজনের কাছে তা হয়ত প্রেরণার উৎস। এই ব্যক্তিভেদী ব্যাখ্যার প্রবণতা একক ও নির্দিষ্ট অর্থের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, এবং সাহিত্য বিশ্লেষণকে আরো মানবিক, সংস্কৃতিমূলক ও অন্তরঙ্গ করে তোলে। পাঠক-প্রতিক্রিয়া তত্ত্ব এই দৃষ্টিভঙ্গিকেই সমর্থন করে, যেখানে পাঠকের ভূমিকা শুধু গ্রহণকারী হিসেবে নয়, বরং অর্থ নির্মাতার দৃষ্টিতে বিবেচিত হয়।

সাবজেক্টিভিটি খারাপ? অবশ্যই নয়, তবে এতটা ভালোও নয়। এর সীমাবদ্ধতা হলো: ব্যক্তি সবসময়ই মতাদর্শ, ভাষা ও ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে গঠিত হয়—যা তার স্বাধীনতা ও স্বতন্ত্রতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই দ্বৈততা-স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রণ, আত্মপ্রকাশ ও নির্মাণ—এই ধারণাকে করে তোলে গভীর, বিতর্কিত ও চিন্তার জন্য উন্মুক্ত।

Comments

0 total

Be the first to comment.

হুমায়ূনের তিন নারী চরিত্র BanglaTribune | প্রবন্ধ/নিবন্ধ

হুমায়ূনের তিন নারী চরিত্র

হুমায়ূন আহমেদের ছোটোগল্প ‘রূপা’, ‘শঙ্খমালা’ এবং ‘নন্দিনী’—প্রতিটি নামের অন্তঃস্থিত একগুচ্ছ বাস্তবতার...

Nov 13, 2025

More from this User

View all posts by admin