নেপালের জেন জি বিপ্লব কি বেহাত হবে?

নেপালের জেন জি বিপ্লব কি বেহাত হবে?

রাত তখন প্রায় বারোটা। বলছি এই বছর এপ্রিলে নেপাল ভ্রমণ নিয়ে। কাঠমান্ডুর আকাশে হালকা কুয়াশা। দূরে গঙ্গা ধাপার উপত্যকায় পুলিশের সাইরেন ভেসে আসছিল। নেপালের বারা জেলার সেমরায় তখন কারফিউ। রাস্তা শুনশান। দোকানের শাটার নেমে গেছে। বাতাসে ভাসছে শুধু একটাই প্রশ্ন—ফিরে কি আসছে নেপালের সেই অস্থির দিনগুলো?

ঠিক কিছু মাস আগেও এমনই এক রাত দেখেছিল দেশটি। সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত ছিল আগুনের স্ফুলিঙ্গ। তরুণেরা রাস্তায় নেমেছিল। তারা নিজেদের ‘জেন জি’ বলত। তারা বলেছিল—এটা শুধু ইন্টারনেটের লড়াই নয়; এটা ভবিষ্যতের লড়াই। তাদের দাবির চাপে ভেঙে পড়েছিল কেপি শর্মা ওলির সরকার। নেপালের ইতিহাসে প্রথমবার, সোশ্যাল মিডিয়া-নির্ভর তরুণ বিদ্রোহ সরাসরি পতন ঘটিয়েছিল একটি শক্তিশালী সরকারের।

কিন্তু এত বড় বিপ্লবের পরও কি কিছু বদলেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফের ফিরে যেতে হয় বারা জেলার সেই বৃহস্পতিবারে। সকালটা ছিল শান্ত। সিমারা চকে লোকজন জড়ো হচ্ছিল। জেন জি বিক্ষোভকারীরা আগেই ঘোষণা করেছিল, ওলির দলের নেতা মহেশ বসনেট এবং শঙ্কর পোখারেলের সিমারায় আগমনের বিরোধিতা করবে তারা। উভয়েই সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার নেপথ্য নীতি-নির্ধারক বলে বিবেচিত।

নেতারা পৌঁছাতেই শুরু হলো স্লোগান। “খুনিদের সরকার চাই না”—শুনতে শুনতে ভিড় জমে গেল। তারপর হঠাৎ কে কোথা থেকে উসকানি দিল কেউ জানে না। মিনিটের মধ্যে দুই মিছিল পরস্পরের ওপর হামলে পড়ল। ককপিটের মতো টানটান উত্তেজনা। কেউ ছুটছে। কেউ ধাক্কা খাচ্ছে। বিমানবন্দরের সামনেও সংঘর্ষ ছড়িয়ে গেল।

যে নেপালকে ‘শান্তির দেশ’ বলা হয়, সেই নেপাল আবার ঝলসে উঠল হিংসার আগুনে।

পুলিশ পরে বলেছে, “পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। কেউ গুরুতর আহত নয়।” কিন্তু বাস্তবটা অন্য কথা বলে। ছয়জন জেন জি কর্মী আহত হয়েছেন। তারা থানায় অভিযোগ করেছেন। পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি। অভিযোগ আছে, প্রশাসন ইচ্ছে করেই চুপ থেকেছে। আর তার ফলেই ফের বিপ্লবীদের ক্ষোভ উথলে পড়েছে।

এত হট্টগোলের মাঝে অন্তর্বর্তীকালীন নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কির কণ্ঠ ভেসে আসে। শান্ত থাকার আহ্বান জানান তিনি। আসন্ন নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে তিনি সব পক্ষকে সতর্ক করেছেন। উস্কানি যেন না বাড়ে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আস্থা রাখতে বলেছেন। তিনি আরও বলেছেন, তিনি চান দেশটি নতুন প্রজন্মের হাতে যাক। দূরদর্শী নেতৃত্ব আসুক।

কিন্তু বাস্তবে কি সে পরিবেশ তৈরি হয়েছে?

জেন জি আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি তরুণেরা। তাদের দাবি খুব সাধারণ—শুদ্ধ রাজনীতি, নেতৃত্বে স্বচ্ছতা, ডিজিটাল স্বাধীনতা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ। তারা বিশ্বাস করে, পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো দেশের ভবিষ্যৎ বুঝতে পারে না।

সেই আদর্শের ভিত্তিতেই গত সেপ্টেম্বরে বিপ্লবের ঢেউ ওঠে। একদিকে ছিল ওলির শক্তিশালী সংগঠন, দীর্ঘ অভিজ্ঞতার রাজনীতি, মাটির সঙ্গে সংযোগ। অন্যদিকে ছিল তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ, হতাশা, ডিজিটাল সংগঠন ক্ষমতা এবং অল্প সময়ে লাখো মানুষের সমর্থন জোগাড় করার দক্ষতা।

বিপ্লব সফল হয়েছিল। কিন্তু আজ আবার প্রশ্ন—তারপর?

প্রশ্নটা শুধু নেপালের নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশের প্রতিচ্ছবি। পুরোনো প্রজন্মের রাজনীতি বনাম নতুন প্রজন্মের রাজনীতি। ভবিষ্যতের দিকে দৌড়াতে চায় তরুণরা। আর ক্ষমতার ভারসাম্য ধরে রাখতে চায় রাজনীতির পুরোনো স্তম্ভেরা।

নেপালের বর্তমান উত্তেজনা সেই সংঘর্ষেরই নতুন অধ্যায়।

যে দলটি ক্ষমতা হারিয়েছে, তারা নির্বাচনের আগে আবার ময়দানে নামতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জেন জি আন্দোলনকারীরা মনে করেন—এই দলটির রাজনীতি অতীতের দুর্গন্ধ ফিরিয়ে আনবে। তাই তারা চায় না ওলির পার্টি UML নির্বাচনের ময়দানে ফিরে আসুক। তারা চায় পরিবর্তন। তারা চায় নতুন রক্ত।

তাই যখন মহেশ বসনেট এবং শঙ্কর পোখারেল সিমারায় পৌঁছালেন, তরুণরা মনে করল—এটি তাদের বিপ্লবের প্রতি চ্যালেঞ্জ। তারা দেখল, পুরোনো শক্তি আবার ফিরে আসছে। তাই তারা রাস্তায় নেমে প্রতিরোধ গড়ে তুলল।

এখন প্রশ্ন—এই তরুণ বিদ্রোহ কি টিকবে? নাকি বেহাত হবে?

অবস্থার বিশ্লেষণ বলছে—জেন জি আন্দোলনের শক্তি আছে। তাদের জনসমর্থন আছে। কিন্তু কিছু দুর্বলতাও আছে।

প্রথম দুর্বলতা—সংগঠনগত অভাব।

জেন জি আন্দোলন তরুণদের আবেগনির্ভর। তাদের মধ্যে নেতৃত্ব আছে, কিন্তু স্থায়ী কাঠামো নেই। আন্দোলন বড় হলেও এর পেছনে কোনও নির্বাচনি পরিকল্পনা নেই। যা আছে—ক্ষোভ, প্রতিবাদ, এবং পরিবর্তনের দাবি।

দ্বিতীয় দুর্বলতা—রাষ্ট্রযন্ত্রের চাপ।

বিক্ষোভের জেরে কারফিউ লাগানো, অভিযোগ দায়ের করেও গ্রেফতার না হওয়া—এগুলো বার্তা দেয়, পুরোনো রাজনীতি এখনও রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর দখল রাখে।

তৃতীয় দুর্বলতা—ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অস্পষ্টতা।

তরুণেরা কীভাবে দেশ চালাবে? কোন নীতি নেবে? কোন অর্থনৈতিক ধারণা অনুসরণ করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে নেপালের ক্ষমতাচ্যুত ওলির দল UML-এর শক্তি দৃঢ়। তাদের সংগঠন বিস্তৃত। গ্রাম থেকে নগর—সব জায়গায় তাদের লোক আছে। নির্বাচন এলেই মাঠে নামার মতো প্রস্তুতি আছে। তরুণদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তারা আবার এগোতে চাইছে।

অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারও চায় স্থিতিশীলতা। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হোক। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ুক। নেপালের ট্রানজিট অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াক। তাই তারা কোনও বড় অস্থিরতা চায় না।

কিন্তু প্রশ্ন থাকেই—নেপালের ভবিষ্যৎ কি জেন জি আন্দোলনের হাতে যাবে?

সম্ভব। কিন্তু তার জন্য কয়েকটি জিনিস দরকার—

এক, আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দিতে হবে।

দুই, নেতৃত্বকে সংগঠনের কাঠামো তৈরি করতে হবে।

তিন, শুধু বিরোধিতা নয়, বিকল্প নীতি দিতে হবে।

চার, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আস্থা রাখতে হবে।

কারণ চিৎকার করে পরিবর্তন আনা যায়, কিন্তু দেশ চালাতে লাগে পরিকল্পনা—দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

আজ নেপাল উত্তপ্ত। সড়ক-বিমানবন্দর—সব জায়গায় অস্থিরতা। অথচ পাহাড়ি দেশটির মানুষ আসলে চায় শান্তি। তারা চায় উন্নয়ন। তারা চায় রাজনৈতিক স্থায়িত্ব।

তবে স্পষ্ট—তরুণদের সেই স্বপ্ন এখনও বেঁচে আছে। সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন শুধু ইন্টারনেটের যুদ্ধ নয়; এটি ছিল প্রজন্মের যুদ্ধ। সেই যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি।

নেপালের নতুন রাজনীতি লেখা হচ্ছে রাস্তায়, ব্যানারে, স্লোগানে, লাইভ ভিডিওতে। আর পুরোনো রাজনীতি তা ঠেকাতে চাইছে দলীয় আনুগত্য, সংগঠন ও রাষ্ট্রক্ষমতার মাধ্যমে।

শেষ পর্যন্ত কার জয় হবে?

উত্তর সহজ নয়। কিন্তু একটি কথা পরিষ্কার—জেন জি বিপ্লব যদি সংগঠিত হতে পারে, নীতি দিতে পারে, এবং ভোটে রূপান্তর ঘটাতে পারে। তবে তারা নেপালের ভবিষ্যতের চিত্র পাল্টে দিতে পারে।

আর যদি তা না পারে, তবে ইতিহাস তাদের নাম মনে রাখবে—শুধু অস্থিরতার বিদ্রোহী হিসেবে, পরিবর্তনের স্থপতি হিসেবে নয়।

নেপাল দাঁড়িয়ে আছে ঠিক এই দ্বিধাবিভক্ত মুহূর্তে।

বিপ্লব কি টিকবে? নাকি বেহাত হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর দেবে আগামী নির্বাচন। আর সেই সঙ্গে দেবে নেপালের নতুন প্রজন্ম—যারা ঠিক করেছে, তাদের ভবিষ্যৎ তারা নিজেরাই লিখবে।

লেখক: গণমাধ্যম শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin