সম্প্রতি বাংলাদেশে দুটি মোবাইল অপারেটর প্রাথমিকভাবে কিছু এলাকায় ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক চালু করেছে, যা দেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলো। বিশ্বে যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। মোবাইল নেটওয়ার্কের প্রতিটি নতুন প্রজন্ম আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করেছে, যোগাযোগের গতি বাড়িয়েছে এবং প্রযুক্তির ব্যবহারকে করেছে আরও বিস্তৃত।মোবাইল টেলিকমিউনিকেশনের প্রযুক্তি ধাপে ধাপে উন্নত হয়েছে। প্রতিটি ধাপকে বলা হয় একটি ‘জেনারেশন জি’। টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এই জেনারেশন আবিষ্কারের যে সুফল তা মানব জাতি বিশদ আকারে কয়েক দশক ধরে সুফল ভোগ করে আসছে। অতীতে যেসব জেনারেশন আমরা ব্যবহার করে আসছি, সেটি কেমন ছিল তা দেখে নিই এক নজরে।প্রথম প্রজন্ম বা 1G ছিল সম্পূর্ণ অ্যানালগ প্রযুক্তিভিত্তিক। ১৯৮০-এর দশকে এটি শুধু ভয়েস কল সেবার জন্য ব্যবহৃত হতো, যা মূলত ওয়্যারলেস টেলিফোন হিসেবে পরিচিত ছিল। এর মাধ্যমে কোনও টেক্সট মেসেজ পাঠানো যেত না। অডিও কলের মান ছিল অস্থিতিশীল এবং নিরাপত্তা ছিল খুবই দুর্বল। দ্বিতীয় প্রজন্ম বা 2G ছিল প্রথম ডিজিটাল মোবাইল নেটওয়ার্ক। এতে ভয়েস কলের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো এসএমএস ও সীমিত ডেটা সেবা চালু হয়। কম গতির ডেটা সেবা চালু হলেও এটার ব্যবহার খুব সীমিত ছিল। ডিজিটাল এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয় ১৯৯০-এর দশকে। এটি GSM, CDMA স্ট্যান্ডার্ড ব্যবহার করতো। ডিজিটাল বিধায় 1G থেকে এর ভয়েস কলের মান বেশ উন্নত এবং তুলনামূলক নিরাপত্তাও অনেক বেশি।তৃতীয় প্রজন্ম বা 3G যুগে মোবাইল ফোনে ব্যাপকভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। সেই সাথে ভিডিও কল, সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন ব্রাউজিং জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাজারে স্মার্টফোনের চাহিদা তৈরি হয় ব্যাপকভাবে। এ ডিভাইসকে কেন্দ্র করে মানুষ শুধু যোগাযোগ নয়, আরও অনেক সুবিধা পেতে শুরু করে। স্মার্টফোনে ক্যামেরা, জিপিএস, ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগসহ অসংখ্য শিক্ষামূলক ও বিনোদনমূলক অ্যাপ যুক্ত হওয়ায় দৈনন্দিন জীবন অনেক সহজ ও সমৃদ্ধ হয়। 3G –মোবাইল ইন্টারনেটের প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয় ২০০০-এর দশক থেকে। এটি GSM, CDMA স্ট্যান্ডার্ডের ব্যবহারের পাশাপাশি UMTS, HSPA যুক্ত হয়।চতুর্থ প্রজন্ম বা 4G হলো উচ্চ ব্যান্ডউইথ ইন্টারনেট প্রযুক্তি, যা মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। এর ফলে দ্রুত ব্রাউজিং, এইচডি ভিডিও স্ট্রিমিং, অনলাইন গেমিংসহ নানা ধরনের সেবা সহজ হয়ে যায়। ২০১০-এর দশকে চালু হওয়া এই প্রযুক্তির মূল ভিত্তি ছিল LTE এবং VoLTE। বিশেষ করে VoLTE প্রযুক্তির মাধ্যমে ভয়েস কল আরও পরিষ্কার, নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল হয়ে ওঠে।ফোর-জি শুধু ইন্টারনেট ব্যবহারের গতি বাড়িয়েই থেমে থাকেনি, বরং মানুষের জীবনযাত্রা ও যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। স্মার্টফোনকে কেন্দ্র করে শুরু হয় এক নতুন বিপ্লব। ফেসবুক, ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও প্ল্যাটফর্মের ব্যাপক বিস্তার ঘটে মূলত 4G নেটওয়ার্কের কারণেই। এর ফলে মানুষের বিনোদন, শিক্ষা ও কাজের ধরন নতুন এক মাত্রা লাভ করে।পঞ্চম প্রজন্ম বা 5G হলো সর্বাধুনিক মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি, যা যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এর মাধ্যমে অতি-উচ্চগতির ইন্টারনেট (যা 4g-এর তুলনায় কমপক্ষে ১০ গুণ বেশি), তবে সঠিক কত গুণ বেশি হবে, তা কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে, যেমন- আপনি কোন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছেন, আপনি কোথায় আছেন, এবং আপনার ডিভাইসটি কেমন। এর গড় গতি ৮০ এমবিপিএস (Mbps) থেকে ১ জিবিপিএস (Gbps) পর্যন্ত হতে পারে। যেটি ফোর-জি (4g)-এর ক্ষেত্রে গতি ছিল ১৮-৩৬ এমবিপিএস (Mbps)। এটি অত্যন্ত কম লেটেন্সি এবং বিপুল সংখ্যক ডিভাইস একসাথে সংযুক্ত করার সুবিধা রয়েছে। ২০২০-এর দশকে চালু হওয়া এই প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হলো mmWave, Massive MIMO, এবং Beamforming। বিশেষ করে এর অতিদ্রুত ডেটা গতি এবং স্থিতিশীল সংযোগের কারণে স্বচালিত গাড়ি, স্মার্ট সিটি এবং ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) ব্যবস্থায় অসাধারণ উন্নতি সম্ভব হচ্ছে।তবে ফাইভ-জি (5G) ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন, গ্রাহক পর্যায়ে উচ্চমানের কনফিগারেশনের স্মার্টফোন এবং বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাটারির প্রয়োজন হয়। কারণ ফাইভ-জি (5G) নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে ব্যাটারির চার্জ তুলনামূলক দ্রুত শেষ হয়ে যায়। অন্যদিকে, উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির সিগন্যাল সহজে বাধা অতিক্রম করতে পারে না, ফলে মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলোকে কভারেজ নিশ্চিত করতে বেশি সংখ্যক টাওয়ার স্থাপন করতে হয়। এই কারণে অবকাঠামো খরচও বৃদ্ধি পায়।ষষ্ঠ প্রজন্ম বা সিক্স-জি (6G) আগামী প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি, যা এখনও গবেষণা ও উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ফাইভ-জির তুলনায় কমপক্ষে ৫০ থেকে ১০০ গুণ বেশি গতি দেবে। যেখানে 5G-এর গতি গড়ে ৮০ Mbps থেকে ১ Gbps পর্যন্ত, 6G নেটওয়ার্কে সেই গতি হতে পারে ১ Tbps (টেরাবিট পার সেকেন্ড) পর্যন্ত। এর ফলে তথ্য আদান-প্রদান হবে প্রায় বাস্তব সময়ে (real-time), এবং লেটেন্সি কমে আসবে মাইক্রোসেকেন্ড পর্যায়ে।6G প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে টেরাহার্টজ (THz) ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ড, AI-চালিত নেটওয়ার্ক ম্যানেজমেন্ট, এবং হলোগ্রাফিক বিমফর্মিং। এটি শুধু মানুষ ও ডিভাইস নয়, বরং মানুষ-মেশিন-পরিবেশের মধ্যে সমন্বিত সংযোগ (ubiquitous connectivity) তৈরি করবে। ফলে উন্নত স্মার্ট সিটি, কোয়ান্টাম কমিউনিকেশন, হোলোগ্রাফিক কল, টেলিপোর্টেশনের মতো অভিজ্ঞতা এবং স্পেস-টেকনোলজি-নির্ভর যোগাযোগ আরও বাস্তবায়নযোগ্য হবে।তবে 6G বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। টেরাহার্টজ তরঙ্গের জন্য নতুন প্রজন্মের অ্যান্টেনা ও চিপসেট প্রয়োজন হবে, যা ব্যয়বহুল হতে পারে। এছাড়া অবকাঠামো উন্নয়ন, শক্তিশালী এআইভিত্তিক সাইবার সিকিউরিটি, এবং অতি-দ্রুত প্রসেসরের প্রয়োজনীয়তা প্রযুক্তিটিকে প্রথমদিকে সীমিত করে তুলবে। অনুমান করা হচ্ছে, ২০৩০-এর দশকের শুরুতে সিক্স-জি (6G) বাণিজ্যিকভাবে চালু হতে পারে।মোবাইল নেটওয়ার্কের প্রতিটি নতুন প্রজন্ম মানুষের জীবনযাত্রা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন বদলে দিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ফাইভ-জি (5G)-এর পথে হাঁটছে, যা শুধু দ্রুত ইন্টারনেট নয়, বরং ডিজিটাল অর্থনীতি, স্মার্ট সিটি ও ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য ভিত্তি তৈরি করবে। আর সামনে অপেক্ষা করছে আরও উন্নত সিক্স-জি (6G) যুগ, যা যোগাযোগকে নিয়ে যাবে এক নতুন উচ্চতায়।লেখক: হেড অব ব্রডকাস্ট অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, বৈশাখী টেলিভিশন।