বাংলাদেশে সরকারের সেবাদান প্রক্রিয়ার মুখ্য ভরকেন্দ্র হলো মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন। শিক্ষক, পুলিশ কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কিংবা স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারাই হচ্ছেন সেই মাঠ পর্যায়ের আমলারা, যারা সরকারের নীতি ও নাগরিক জীবনের বাস্তবতার মধ্যে সংযোগ রচনা করেন। কিন্তু প্রায়ই এই সংযোগটি দুর্বল থেকে যায়। উপর থেকে নীতির নির্দেশনা যতই সুন্দর হোক, মাঠ পর্যায়ে সেটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল মেলে না।
বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় এই মাঠ পর্যায়ের আমলাতন্ত্রের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। তবুও বিভিন্ন সময়ের সংস্কার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই স্তরের প্রশাসনে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়ে গেছে। এর পেছনে আছে কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা- অতিরিক্ত কাজের চাপ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, সীমিত স্বায়ত্তশাসন, প্রণোদনার অভাব এবং দুর্বল তদারকি ব্যবস্থাপনা।
এখন মাঠ প্রশাসনের বাস্তব চিত্রের ওপর আলোকপাত করা যাক। বাংলাদেশের অধিকাংশ উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সরকারি দফতর জনবল ও সম্পদের ঘাটতিতে ভুগছে। এক একজন কর্মকর্তা একাধিক দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হন। যেমন, একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন, নাগরিক অভিযোগ দেখা, মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট পাঠানো, মাঠ পরিদর্শন এবং প্রশাসনিক কাজ সামলাতে হয়। এতে করে দক্ষতা হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি জনসেবার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সেই সঙ্গে তথ্য সংরক্ষণ ও সেবাপ্রদানের অনেক কাজই এখনও কাগজ নির্ভর। ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা থাকলেও তা আংশিক; অনেক গ্রামীণ দফতরে ইন্টারনেট সংযোগ অনিয়মিত বা প্রশিক্ষিত কর্মী নেই। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর শাসন কাঠামো এখনও পুরোপুরি মাঠ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী প্রায়ই কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেন। এতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রায়ই রাজনৈতিক বিবেচনায় গৃহীত হয়, যা পেশাগত নিরপেক্ষতা ও জনগণের আস্থা দুটোই নষ্ট করে।
পাশাপাশি, সরকারি দফতরে মূল্যায়ন ব্যবস্থা এখনও জ্যেষ্ঠতার ওপর নির্ভরশীল; কর্মফল বা নাগরিক সন্তুষ্টি এখনও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পায়নি। এমনকি নাগরিক অভিযোগ ব্যবস্থাও অনেকাংশে অকার্যকর, যেখানে অভিযোগ জমা হয় ঠিকই কিন্তু তার নিস্পত্তি প্রায়ই দৃশ্যমান হয় না।
এই পরিস্থিতি পাল্টাতে হলে প্রশাসনিক সংস্কারকে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা নয়, মাঠ বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করে গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে চারটি দিককে অগ্রাধিকার দিতে হবে- দক্ষতা, স্বায়ত্তশাসন, জবাবদিহিতা ও নাগরিক সম্পৃক্ততা।
মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট পরিসরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিতে হবে। বর্তমানে বহু সিদ্ধান্তই মন্ত্রণালয় বা বিভাগীয় কার্যালয়ের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করে, ফলে স্থানীয় সমস্যা সমাধানে বিলম্ব ঘটে। ক্ষুদ্র প্রকল্প, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ বা স্থানীয় সম্পদ ব্যবহারে বিকেন্দ্রীকৃত সিদ্ধান্তগ্রহণ মাঠ প্রশাসনের প্রতিক্রিয়াশীলতা বাড়াতে পারে।এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও মাঠ অফিসের মধ্যে বা ফলাফলভিত্তিক চুক্তি (performance compact ) চালু করা যেতে পারে যেখানে লক্ষ্য নির্ধারিত থাকবে, কিন্তু বাস্তবায়নের পদ্ধতি স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত হবে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের স্থানীয় কাউন্সিলগুলোর মতো মডেল থেকে শেখা যেতে পারে, যেখানে স্থানীয় প্রশাসন জাতীয় নীতিকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে অভিযোজিত করতে পারে।
বর্তমান তদারকি ব্যবস্থা অনেকটাই নিয়মপালন ভিত্তিক যেমন কে কখন ফাইল পাঠালো, কোন রিপোর্ট সম্পন্ন হলো ইত্যাদি। কিন্তু সেবার গুণমান বা নাগরিক সন্তুষ্টি পরিমাপ করার কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেই। এ জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে। ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যেখানে পরিমাপযোগ্য সূচকের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের কাজের মান যাচাই করা যাবে। এক্ষেত্রে বর্তমানে বিদ্যমান বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা যেতে পার। সেই সাথে সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতি (সিটিজেন্স চার্টার), অংশগ্রহণমূলক নিরীক্ষা ও ডিজিটাল অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার OPEN প্ল্যাটফর্মের মতো উদ্যোগ নাগরিকদের সেবা প্রক্রিয়া ট্র্যাক করা যায় - যা দুর্নীতি কমায় ও আস্থা বাড়ায়। সেই সাথে বাংলাদেশে অভিযোগ প্রতিকার ( গ্রিভ্যান্স রিড্রেস সিস্টেম) এর বিদ্যমান ব্যবস্থাকে মূল্যায়ণ করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করে আরও কার্যকর করা যেতে পারে।
সেই সঙ্গে, ভালো শাসন তখনই সম্ভব, যখন নাগরিক ও প্রশাসনের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস তৈরি হয়। এজন্য স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক প্রতিক্রিয়া সংগ্রহের ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। এসএমএস বা অ্যাপভিত্তিক সন্তুষ্টি জরিপ মাঠ প্রশাসনের জন্য একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে অংশীদারিত্বমূলক সেবাপ্রদানের (co-production) ধারণা প্রয়োগ করা যেতে পারে, যেখানে স্থানীয় সম্প্রদায় ছোট প্রকল্পের পরিকল্পনা ও তদারকিতে অংশ নেয়। ফিলিপাইনের Citizen Participatory Audit এই দিক থেকে অনুসরণযোগ্য একটি উদাহরণ।
পাশাপাশি, প্রণোদনা, প্রযুক্তি ব্যবহার ও বাস্তবায়নযোগ্যতা মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। কার্যকর এবং নিরপেক্ষ কর্মসম্পাদনভিত্তিক ভাতা বা স্বীকৃতি ব্যবস্থা চালু করা করা গেলে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রেরণা বাড়াবে। শুধু জ্যেষ্ঠতার ওপর নির্ভর না করে উদ্ভাবন, নৈতিকতা ও জনগণের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পৃক্ততার ওপর ভিত্তি করে পদায়ন এবং পদোন্নতির কাঠামো তৈরি করা দরকার। ব্রাজিলের Bolsa Família কর্মসূচিতে যেমন দক্ষ প্রশাসকদের আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয়, তেমনি বাংলাদেশেও শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে এমন প্রণোদনা চালু করা যেতে পারে।
প্রযুক্তির ব্যবহারও এখন সময়ের দাবি। মোবাইলভিত্তিক রিপোর্টিং ও প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা প্রশাসনিক বিলম্ব ও তথ্য বিকৃতি কমাবে। পাশাপাশি, বুদ্ধিমত্তা–নির্ভর বিশ্লেষণের মাধ্যমে কর্মক্ষমতার ঘাটতি শনাক্ত করা সম্ভব। এস্তোনিয়ার ই–গভর্নেন্স মডেলের মতো আন্তঃসংস্থা তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা গড়ে তুললে স্থানীয় প্রশাসন আরও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
সর্বপরি, দক্ষতা বৃদ্ধি ও পেশাগত উন্নয়ন উদ্যোগের কোনও বিকল্প নেই। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জন্য প্রমাণনির্ভর জনবল বরাদ্দ ও নিরবচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। মানবসম্পদ উন্নয়নে শুধু সাধারণ প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ নয়, বরং সমস্যা সমাধান, নাগরিক যোগাযোগ ও নৈতিকতা বিষয়ক কোর্স চালু করতে হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও মাইক্রো-লার্নিং ব্যবস্থার মাধ্যমে দূরবর্তী অঞ্চলেও প্রশিক্ষণ সহজলভ্য করা সম্ভব। ভারতের Aspirational Districts Programme এর মতো উদ্যোগ বাংলাদেশেও নেওয়া যেতে পারে, যেখানে তথ্যনির্ভর মূল্যায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া জেলা বা উপজেলা চিহ্নিত করে বিশেষ সহায়তা দেওয়া হয়।
তবে যেকোনও সংস্কারের সফলতা নির্ভর করে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বাস্তবায়নযোগ্যতার ওপর। মন্ত্রীপর্যায়ের প্রতিশ্রুতি ও স্থানীয় প্রশাসনের অংশগ্রহণ ছাড়া এসব পদক্ষেপ টেকসই হবে না। তবে দেশব্যাপী সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করার পূর্বে প্রথম ধাপে কয়েকটি জেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রয়োগ করে সফলতা যাচাই করা যেতে পারে।
মাঠ পর্যায়ের আমলাতন্ত্রই সরকারের প্রকৃত মুখ। এই স্তরের কর্মকর্তাদের কাজের মান, আচরণ ও দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করে নাগরিকরা রাষ্ট্রকে কেমনভাবে দেখবে। প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো মানে শুধু প্রক্রিয়াগত উন্নতি নয়; এর অর্থ হলো এমন একটি মানবিক, ন্যায্য ও নাগরিক–বান্ধব রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে সরকারের প্রতিটি প্রতিনিধি জনগণের সহযোগী হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের পথে। এই যাত্রাকে টেকসই করতে হলে প্রশাসনের ভিত্তি, অর্থাৎ মাঠ পর্যায়ের আমলাতন্ত্রকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে তুলতে হবে। নীতি প্রণয়ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি জরুরি মাঠ পর্যায়ে সেই নীতির সঠিক বাস্তবায়ন। তাই ভালো শাসনের আসল চাবিকাঠি রাজধানীর নয়, লুকিয়ে আছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সেই অফিসকক্ষে— যেখানে প্রতিদিন একজন কর্মকর্তা জনগণের মুখোমুখি হন।
লেখক: জনপ্রশাসন ও জননীতি বিশ্লেষক