‘মানুষের উদ্বোধনে অবিশ্বাসী হয়ো না মানুষ’

‘মানুষের উদ্বোধনে অবিশ্বাসী হয়ো না মানুষ’

ভুনা খিচুড়ির মুগের ডাল কড়া ভাজা আর হালকা ভাজা, মানে সামান্য টেলে নেওয়ার মধ্যেই খিচুড়ির স্বাদে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।

আমাদের বাড়িতে যেটা নিয়মিত খাওয়ার জন্য হতো, সেটায় ডালটা একটু হালকা ভাজা, খিচুড়িটা একটু নরম, একটু ‘সাদা সাদা টাইপ লুক’ হতো।

আর ভোগের খিচুড়ি? মানে যেটা পাথরের থালায় বেড়ে পূজার আসনের সামনে নিবেদন করতো, গোল একটা গম্বুজের মতো করে, সেটার ওপরে একটা তুলসি পাতা দেওয়া থাকতো। যেন যতটুকু সময় পূজার ধুপ-ধূনো জ্বলবে, প্রদীপ জ্বলবে ততক্ষণ খিচুড়িটার ওপর যেন কোনও ‘জার্ম’ বসতে না পারে, সে জন্য তুলসি পাতার পাহারা। আর সেই খিচুড়ির ডালটা কড়া ভাজা।

একটু পোড়াটে হয়ে যেত মাঝে মাঝে। সেই খিচুড়ি পুরোটাই খাঁটি ঘিয়ে, চাল-ডাল ভুনে নেওয়া।

সেই খিচুড়িটা একটু ঝাল ঝাল। সেই খিচুড়িটা লাকড়ির চুলার দমে জ্বাল।

পূজার ‘অথেনটিক খিচুড়ি’ নিয়ে লিখতে বসে সে-ই স্বাদ জিভে পাচ্ছিলাম যেন।

কালো একটা বড় খাদায় (পাথরের থালা) গোল মতন করে দেওয়া খিচুড়ির আশপাশে মোটা করে বেগুনের চাক, ঘিয়ে ভাজা। মোটা করে গোল গোল করে কাটা করলার চাক ভাজা। খাঁটি সরষের তেলে। গোল করে রাখা ভোগের খিচুড়ির দেয়াল ঘেঁষে একটু লাবড়া। আঠালো মিষ্টি কুমড়ার একটা মাখো থিকনেস। লাবড়ার মাথায়ও চিক্চিক করছে আলগা ঘি। একই বৃত্তের লাইনে একটা গন্ধ লেবুর টুকরা আর কাঁচামরিচ।

আহ! জিভে জল, মাথাটা এলোমেলো হয়ে গেলো। এই খিচুড়ির আড্ডাটা চলছিলো এটিএন নিউজের বার্তাকক্ষে। ২০১৯ সালের কোনও একটা কম ঝামেলার দিনে।

এটিএন বাংলার মার্কেটিং বস শিল্পী চন্দন সিনহাও ঘটনাক্রমে সেদিন সেই আলোচনায় ছিলেন। চঞ্চল স্বভাবের চন্দনদা সেই আলাপ র‍্যাপ–আপ করার জন্য আমাকে বললেন, ‘এইসব ভোগের খিচুড়ির আলাপ দিয়া লাভ আছে? সব বাড়িতে কি হয় এটা? যারা না খাইছে তারা কি এই পার্থক্য বুঝবো?’

চন্দন সিনহার সাথে আমার এক ধরনের আবদারের সম্পর্ক। আমি বললাম, ‘দাদা, আমার খু্ব শখ এই খাঁটি ঘিয়ের ঝাল খিচুড়ি, আঠালো লাবড়া, আলুর ঝুড়িভাজা, আর ঘিয়ে বেগুন ভাজা দিয়ে আমজনতাকে খাওয়াবো। সত্যি সত্যিই বাংলাদেশের খাঁটি খাবারের স্বাদ-সুগন্ধ থেকে আমরা অভাগারা বঞ্চিত!

এখনও তো ভালো ঘি হয়, লাকড়ির চুলাও জ্বলে... আর সেই হাতে জাদুমাখা রাঁধুনিরাও আছেন। চলো না, আমরা নিজেরা নিজেরাই চাঁদা তুলে এই কারওয়ান বাজারের শ্রমে ঘামে মানুষের জন্য একদিন ‘কলাপাতার পাত’ পাতি। নিজ হাতে বেড়ে খাওয়াই!

প্রস্তাবটি দাদার খারাপ লাগেনি। কিন্তু যুক্তি তো লাগবে। হঠাৎ একদিন মাইকিং করে যদি বলি, ‘এখানে আগামীকাল মাটির চুলায়, ঘিয়ে রাঁধা জেনুইন খিচুড়ি লাবড়া খাওয়ানো হবে...আপনারা দলে দলে আসবেন।’ আসবে কেউ? দাদার এই প্রশ্নে চুপ থাকলাম।

তারপর আইডিয়াটা চন্দনদাই দিলো, চল, সবাই মিলে একটা দুর্গাপূজা করি। তাইলে মন মতো খাওয়াতে পারবি।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরের কথা বলছি এটা। তখন মণ্ডপে মণ্ডপে সে বছরের পূজার প্রস্তুতি মোটামুটি শেষের দিকে।

আমি বিস্মিত! পূজা? কোথায় করবো? কীভাবে করবো?

বাংলা প্রবাদে আমরা বলি, ‘জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ’...

সামান্য কাজ থেকে এক্কেবারে মহাকঠিন কাজ করার সামর্থ্য বোঝানোর জন্য এ প্রবাদ। জুতো সেলাই তো যে কেউই পারবে, কিন্তু চণ্ডীপাঠ? মানে দুর্গার আসরে দুর্গার বন্দনা।

চণ্ডীপাঠটা কেবল ‘যা দেবী সর্বভূতেষু...হিং, ক্লিং ফং ভ্রং’ এসবের উচ্চারণ নয়! চণ্ডীপাঠটা সামগ্রিক আয়োজন। আমরা বারোয়ারি পূজা বলেও এর ব্যবস্থাপনার ব্যাপকতা বোঝাই।

সেই কঠিন কাজটি করার জন্য হুজুগ তুলছে চন্দনদা... মানুষকে ভোগের খিচুড়ি খাওয়ানোর মতো সহজ কাজটা করার জন্য?

দাদা বললো, তুই পারবি, পারবি। চেষ্টা কর...আমরা সবাই তোরে হেল্প করবো। উদ্যোগ নে। এই বলে এক লাখ টাকার একটা চেক ধরিয়ে দিয়ে চলে গেলো।

আমি পারবো কিনা জানি না, কিন্তু চেষ্টা করতে ইচ্ছা করলো। না হলে, না হবে। কিন্তু আমার মনের ইচ্ছাটা তো পবিত্র। ‘পূজা’ না, বরং ‘পেটপূজা’। সাধারণ খেঁটে খাওয়া মানুষের স্বাদের অভিজ্ঞতায় এই বাংলার এক অনন্য সংযোজন দেওয়ার ইচ্ছা।

কীভাবে কী কী সব হলো, হতে থাকলো... আজকে ভাবলে ম্যাজিকের মতো লাগে। পূজার আয়োজনের প্রথম কাজটি করলাম, টাঙ্গাইলের আনন্দ বাবুর্চিকে সাতদিনের জন্য বুকিং দিয়ে।

উনি কনফার্ম করলেন। তারপর জায়গাটা ঠিক করা, প্রতিমা, মিডিয়াপাড়া পূজা কমিটি করা, থিম ভেবে পূজার চার-পাঁচ দিনের অনুষ্ঠান প্ল্যান করা...পূজার আগেই পূজা–পূজা গন্ধ আসলে কেনাকাটায়।

যেহেতু সাধারণ শ্রমে-ঘামে ভেজা সব মানুষদের জন্য একটা কমন প্লেসে পূজাটার আয়োজন করছি, নতুন কাপড়ের গন্ধ ছাড়া যেন জমে উঠছে না। শুরু হলো দশ টাকায় পূজার বাজার। কোনও ধর্মীয় বাছবিচার নেই...বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের ভলান্টিয়াররা এলাকার সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের পরিবারে কুপন দিয়ে এসেছে দশ টাকায় বাজার করার। পূজা মণ্ডপের বাঁশ-প্যান্ডেল জোড়া লাগার আগেই পূজার কেনাকাটার বাজনায় মুখর পূজার মিডিয়াপাড়া।

সব টিভির কর্মী এবং ম্যানেজমেন্ট দারুণ উৎসাহ। বেশিরভাগ টিভি চ্যানেলের মালিকপক্ষ উদ্যোগটার জন্য অ্যাপ্রিসিয়েট করলেন। যে যার যার ইচ্ছামতো কন্ট্রিবিউট করলেন। কে কোন অনুষ্ঠানটা লাইভ করবেন, সেটাও আমরা পেয়ে গেলাম। আর সব টিভির প্রেজেন্টার রিপোর্টাররা মিলে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নিলেন, স্ত্রিনে সপ্তমী-অষ্টমী-নবমী-দশমীর সাজ কেমন হবে!

এটিএন নিউজের ঠিক সামনেই যেহেতু পূজার মাঠটা, তাই এটিএন নিউজ আর পাশের লা ভিঞ্চি হোটেল হয়ে উঠলো কয়টা দিনের জন্য পূজা বাড়ি।

ভোগের খিচুড়ি দিয়ে যে পূজার আলাপ, সেখানে যার যার ছেলেবেলার পূজার স্মৃতি নিয়ে এগিয়ে এলেন, কাওরান বাজারের ব্যবসায়ী সমিতি। কেউ কয়েক কেজি পোলাওয়ের চাল, কেউ ডাল, ঘি, সবজি, পূজার ফল ও কন্ট্রিবিউট করার প্রস্তাব নিয়ে এলেন।

এই ভালোবাসার কন্ট্রিবিউশনটা একটা শৃঙ্খলার মধ্যে রাখতে হবে। তাই সেটার সার্বক্ষণিক সমন্বয়ের জন্য টিমপ্রধান এটিএন নিউজের এমসিআর চিফ নাসের আহমেদ। এমন নানা কিছু গুছিয়ে নিয়ে পূজার প্রতিমা মণ্ডপে তুলতে কোনই ঝামেলা হলো না। চাপও হলো না। যেন এই আয়োজনে মন থেকে যারা নেমেছেন, তাদের সকলের দশ হাত। মাল্টিটাস্কিং করছেন ঠিকঠাক। যেমন, নিউজরুমে গাজায় বোমা হামলার ঘটনার নিউজটা হয়তো এডিট হচ্ছে, পাশ থেকে তুনাজ্জিনা তনু উঠে এসে চিৎকার করে বলছে, ‘আঁখিদি আমার জন্য বেলির মালা বা গাঁজরা অর্ডার দিয়েন।’

মেকআপ রুমে পূজার পাঁচদিনের সাজের রিহার্সাল। নবমী সাজ দশমীর সাদা লালের সাথে গোল্ডেন গয়না। এসবের জোগাড়যন্ত্র আর হইচইয়ে পূজার বিশ দিন আগেই পুরো মিডিয়া পাড়ায় পূজা-পূজা গন্ধ।

আয়োজনটা করতে গিয়ে পুরো টিম নিয়ে আমার এক দারুণ জার্নি! দুর্গাপূজা যেমনই হোক—ছোট্ট পরিসর আর বড়—এটা করে ফেলতে পাড়া মানে বড় কিছু করতে পারার সাহসের পরীক্ষায় পাল্লা দেওয়া।

আয়োজন করতে করতে মনে হলো বাঙালির দুর্গাপূজার যে দর্শন বা চর্চা সেটা একটু সহজ করে বোঝানোর চেষ্টাটা করি, যে শিক্ষাটা আমি পেয়েছি আমার একজন পছন্দের গুরুজন রামেন্দ্র চৌধুরীর কাছ থেকে।

রামেন্দ্র চৌধুরী সুলেখক।

মিথ নিয়ে তাঁর অনেক কাজ আছে। বেশ ক’টি বই আছে তাঁর। বাংলাদেশ জুট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বড় কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর নিজের নামেই তিনি অনন্য। তবুও তাঁর কাছে আমি পড়তে গিয়েছিলাম বন্ধু নবনীতা চৌধুরীর সুবাদে। রামেন্দ্র কাকু নবনীতার বাবা। বেশ ক’বছর হলো মারা গেছেন।

ভোরের কাগজে আমার পূজার রিপোর্ট দেখে কাকু ফোন করেছিলেন। যে সহজিয়া ভঙ্গিতে আমি পূজার মাহাত্ম্য লিখছিলাম, তাতে আরও আরও যুক্তি তথ্য-উপাত্ত, দর্শন আর বাংলাদেশের আবহাওয়া, কৃষি, উদ্ভিদ, মেলা, বাণিজ্য সব মিলেমিশে একাকার হওয়ার ডকুমেন্টস আমাকে পড়ালেন কিছুদিন।

ওই যে...পাঠ! সে পাঠের কনফিডেন্স নিয়েই আমি পূজার স্টোরি করার সময় লিখি, দেবীরূপিনী বাংলাদেশের ‘মায়া’র কথা। পূজার সময় দুর্গার প্রতীকী স্নানের জন্য ‘মসজিদ-মন্দির-গীর্জা-প্যাগোডা’র ধূলো দিয়ে বানানো সাবান, মানে সব ধর্মের সব স্ট্যাটাসের মানুষের অংশগ্রহণ—অসাম্প্রদায়িকতার কথা।

দুর্গা যদি বাংলাদেশের মায়ের দুই কন্যা দুই পুত্র নিয়ে বাপের বাড়িতে নাইওর আসার স্টিলফটো হয়, তাহলে পাঁচদিন ধরে পূজার মণ্ডপে নবপত্রিকা মানে নয়টি ওষুধি বৃক্ষের ডালপালা দিয়ে করা বউটা গনেশের বউ নয়। কলাবউ বলা হলেও ওই নয়টি গাছ আমাদের পূর্ব-পশ্চিম-ঈশান-নৈঋতের প্রোটেকশন। যেসব আমাদের রোগবালাই থেকে বাঁচায় বছর জুড়েই। সেই রক্ষাকবচ বৃক্ষের জোট, নবপত্রিকা পূজার মঞ্চে সাজিয়ে রাখা মানে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ—বৃক্ষকেও সেলিব্রেট করা। আর বিটুইন দ্য লাইনস্, পাপপূণ্যের ভয়ে হলেও সারাবছর আমাদের চারিদিকের এই রক্ষাকবচ বৃক্ষের যত্নের কথা কে না বুঝবে! তবুও আমি বারবারই পূজার স্টোরিতে এসবই লিখতাম।

রামেন্দ্র কাকুর গাইডেন্সে এসব পড়াশোনা থেকে কাকুই আমাকে বুঝিয়েছেন, দুর্গাপূজাটা এই বাংলার উৎসব। সব মানুষের উৎসব। অনেকে না জেনে এটা কে কঠোর নিয়ম-কানুন আর ছুৎমার্গের মধ্যে আটকে রাখে। প্রকৃতির গল্পটা কেউ বলে না।

ফলে ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ এ ধরনের স্লোগান পলিটিক্যাল, আরোপিত লাগে। এতে দূরত্ব বাড়ে।

অথচ দুর্গার উৎসবটা এই বাংলাদেশর ইনক্লুসিভিটির একটি বড় এবং সহজ ডেমোনেস্ট্রেশন।

পূজার স্টোরি করতে গিয়ে, মা-মাটি-মানুষের ইনক্লুসিভিটির গল্প কতটুকুই করা যায়! মিডিয়াতে তো এসবের জন্য সময়ের বেশ অভাব। তাও বছর ঘুরে একবার একটু করে কয়দিনে বলা যায়। কিন্তু চন্দনদার তাল তুলে দেওয়া পূজা আয়োজন করতে গিয়ে আমি সেটার একটা ফাংশনাল প্রয়োগের সুযোগ পেলাম। কোনও ছোঁয়াছুঁয়ির বাধ বিচার নেই। পরিচ্ছন্নতাই পবিত্রতা—টিমের সবাই আমরা এই বিচারে আনন্দে মেতেছি।

২০১৯ সাল থেকে মিডিয়াপাড়ার পূজা অনলাইনে লাইভে দেখেছেন দেশ-বিদেশের অনেক আগ্রহী দর্শক।

ভোর চারটায় স্নান সেরে, ভেজা চুলে, লালপেড়ে সাদা শাড়িতে আমাকে যারা দুর্গাপ্রতিমার সামনে হাত জোড় করে মন্ত্র পড়তে দেখেছেন, তাদের ভালোমন্দ মন্তব্যের অন্ত নেই। কেউ বলেছে, ওই দেখ, মুন্নী সাহা কত কট্টর হিন্দু, নিশ্চয়ই বেহেস্তে যাইতে চায়! আরও কত কী নোংরা কল্পনা, গালি! এসব নোংরা মানসিকতার ভার্চুয়ালবাসীকে আমি এড়িয়ে যেতেই পছন্দ করি।

‘মানুষ’, কেবলই ‘মানুষে’ বিশ্বাসী একজন মানুষ হিসেবে আমি পূজার রিচ্যুয়ালটুকু একদম জ্যামিতিক মাপে করেছি। ডেলিবারেটলি। কারণ রিচ্যুয়ালটা আমার সংস্কৃতির অংশ। সংস্কৃতি সুন্দরের প্রকাশ।

বলিউডের গায়ক সনু নিগম যখন লতা মঙ্গেশকরকে গানের দেবী বলে স্টেজে, হাজার মানুষের সামনে পা ছুঁয়ে প্রণাম করেন, সেটাকে ভারতীয় সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখতে যেমন ভালো লাগে, তেমনি একটি সনাতন পরিবারে জন্ম নেওয়া আমি আমার পারিবারিক সংস্কারের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এই রিচ্যুয়ালের চর্চা করছি, সেটাও বাংলাদেশের শিক্ষা, বাঙালির সংস্কৃতি।

২.

সেদিনের ভোর রাতে তিথির প্রহরে অনলাইন সম্প্রচারে আমার উপস্থিতিকে হিন্দুত্ব হিসেবে ট্রলকারিরা কিন্তু একটা সৌহার্দ্যের আলোর ছবিটা মিস করে গেছেন। কাকভোরের আলোতে দেখা যায়নি কাওরান বাজারের মসজিদের মুয়াজ্জিন চাচাকে! তিনি কাউকে দেখাতেও চাননি, ক্যামেরার সামনে এসে বলতেও রাজি হননি, কেন পূজার তিথিতে হইচই পাইকারি বাজারের হট্টগোলের মধ্যে মণ্ডপে বসেছিলেন তিনি। আজান দিয়ে নামাজ শেষ হওয়ার পর-পর তিনি নিজে আমাকে জানাতে এসেছিলেন যে নামাজ শেষ, এবার মাইকে পূজার বাজনা বাজতে পারে।

আর উটকো ঝামেলাকারিদের উৎপাত যাতে না হয়, সে জন্য তিনি ঠাঁয় বসে থাকলেন মণ্ডপের গেটের কাছেই। পূজার সব কয়টা দিন আমি/আমরা তো এটাই পেয়েছি। সত্যি সত্যি পেয়েছি। ভার্চুয়ালে মিথ্যা আহ্–উহ্ নয়। পূজার রিচ্যুয়ালটুকু শেষে মুয়াজ্জিন চাচাকে নিজহাতে কালিজিরা–চা বানিয়ে দিতে দিতে আড্ডায় জমেছি, আগের রাতের শাহ আবদুল করিমের নামে করা অনুষ্ঠান-সন্ধ্যাটায় কত মিন্তি তৎক্ষণাৎ পারফরম করেছেন! এই সৌন্দর্য্যের পেছনে আছে বাংলাদেশের ইনক্লুসিভিটি।

আমাদের সবার অন্তরে এসব ছবির সৌন্দর্য গাঁথা।

কেউ জানে না যে সেই ভোরের আড্ডাতেই সপ্তমীর সন্ধ্যায় আনন্দ কাকুর রান্না করা লাবড়া আর নারকেল দিয়ে বুটের ডালটার গল্প করতে করতে মুয়াজ্জিন চাচার মনে তার ছোটবেলায় শালপাতার বাটিতে একই জিনিস খাওয়ার স্মৃতি ফিরে এসেছে। তারই পরামর্শ ছিল, লুচি ভাজার জন্য আরও দুটি চুলা যেন আমরা বাড়াই। কারণ মন ভরে খাওয়ানোর উদ্যোগ যখন নিয়েছিই, তখন গরম ফুলকো লুচিতে ফুঁ দেওয়ার পরিপূর্ণ তৃপ্তি আর বাদ যাবে কেন? শেষ পাতে একটা মাওয়া দেওয়া রসগোল্লা কেন নাই, তা–ই নিয়েও চাচার অনুযোগ।

আজও আমার চোখ ভিজে আসে, এই তৃপ্তির গল্পে।

সবে তো সেবার পূজাটা শুরু করেছি। তার পরের বার...পরের পরের বার.. মিডিয়াপাড়ার পূজার মণ্ডপ হয়ে উঠেছিলো লুচি, লাবড়া, নারু, সন্দেশ আর ঘিয়ের খিচুড়ির উৎসবস্থল।

সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ বা চাকরিজীবী ব্যাংকার, সাংবাদিক, প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তি—সবার একটা অথেনটিক বাঙালি স্বাদের প্রাণভরে খাওয়ার উৎসব।

বাজারের ঘামের গন্ধ…কাদামাখা পায়ের এত্ত এত্ত মানুষ…সারাদিন চুলো জ্বলছে...এটিএন নিউজের পাশাপাশি অন্যান্য মিডিয়ার কর্মীরা এসেও হাত লাগাচ্ছেন মানুষের হাতে একটু শ্রদ্ধাভরে খাবার তুলে দেওয়ার কর্মযজ্ঞে।

এসবের পুরোটা মিলে বাংলাদেশ। পূজার মঞ্চে গাইছে দেওয়ান, মান্নান মোহাম্মদ, কানিজ খন্দকার বা ড. সামিরের কাওয়ালী দল। এর চেয়ে ইনক্লুসিভিটির সুন্দর স্টোরি আর কী হতে পারে?

পূজা শেষে ভাসান। কতটা যত্নে মঙ্গল ঘটটা নিতে হয়—সেই সাবধানবানী যখন মোজাহিদুর রহমান শাওন সবাইকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, তার চেয়ে ইনক্লুসিভিটির বড় উদাহরণ আর কী?

আজকে ২০২৫–এ দুর্গাপূজার উৎসবে ইনক্লুসিভিটির আলোচনা দেখে ২০১৯ থেকে ২০২৩–এর পবিত্র স্বাদের খিচুড়ির গল্প মাথায় টোকা দিলো।

নগদের পূজার বিজ্ঞাপন নিয়ে ফেসবুক-সুধীরা বেশ প্রশংসা করছেন। বিজ্ঞাপনটি আসলেই প্রশংসা করার মতো। জাতীয় গণমাধ্যমে এ ধরনের মন ছুঁয়ে যাওয়া ইনক্লুসিভ গল্পের বিজ্ঞাপন অন্তত পূজাকে কেন্দ্র করে আগে দেখিনি। তবে বাস্তবে কারওয়ান বাজারের মতো বারোয়ারি, ব্যস্তসমস্ত, বহুমতের মানুষের ভীড়ে পূজা বা পেটপূজার আয়োজনে যে অভিজ্ঞতা, যে আনন্দ পেয়েছি, তা অনেকে জনম জনম তপস্যা করে, ইনক্লুসিভিটির থিওরি কপচে, ফেসবুক ঘষে ঘষেও কখনও পাবে না। পাওয়া সম্ভব নয়।

আমার পাওয়া অভিজ্ঞতার গল্পে নেগেটিভ ভাইভও আছে! খাঁটি বাংলাদেশি রেসিপির অকৃতজ্ঞতার, কৃতঘ্নতার ড্রপও আছে।

ওই যে দুর্গার পায়ের কাছে মহিষাসুর, সেটা তো তারই প্রতীক!

২০২৪ সালের নভেম্বরের কথা। আমাদের ‘এক টাকার খবর’ কার্যালয়ের সামনে আমার ওপর ‘মব’–এর আক্রমণ হলো। যে জায়গাটা আমার কাছে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ, মানে সারাদেশের মানুষের প্রতিদিনের পদধূলি পড়া তীর্থ, সেখানেই যে আমি আক্রান্ত হবো কখনও ভাবিনি।

গত ২৫ বছর ধরে প্রতিদিন যাদের দেখি, যাদের সুখ-দুঃখের কথা শুনি, আমার রোজা-ঈদ-পূজার উৎসব যাদের নিয়ে, সেখানেই আমি সবচেয়ে নিরাপদ, এ বিশ্বাস আমার ছিল। এসব মানুষ যেন মিথ্যা আর ক্লিক-শেয়ারের খপ্পড়ে না পড়ে, ‘খবর’টা খবর হিসেবেই পায়, সে উদ্দেশ্য নিয়ে আমি একটি প্রতিষ্ঠিত চ্যানেল ছেড়ে ‘এক টাকার খবর’–এ নেমেছি। নেমেছি এই আত্মবিশ্বাস থেকে যে সাধারণের মধ্যেই থাকে অসাধারণের গল্প। সেই গল্প খোঁজার কার্যালয়ের সামনেই মব আক্রমণকারীদের মধ্য থেকে একজন তেড়ে এলো, ‘মার মাগিরে... মার! জুতার মালা দে, হিন্দু মাগি কাওরানবাজারে পূজা করে।’

ওই মারমুখী মবের সব হইচই– চিৎকারের মধ্যেও লোকটার মারমুখি ভঙ্গি চোখে না পড়ে পারেনি। একদম চেনা লোক।

ক’দিন আগে রোজায় তিরিশ দিন ইফতার বেড়ে খাওয়ানোর সময় উনাকে দেখেছি। পূজার লুচি আমি নিজ হাতে দিয়েছি, নামটা হয়তো মনে নাই, তবে কাওরান বাজারের কোনও একটা দোকানে কাজ করে লোকটি।

মবের সময়ে যা যা ঘটেছে, আমার পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে আছে। চোখ বন্ধ করলে সিনেমার মতো দেখতে পাই। তবে ওই লোকটার মারমুখি মুখটা এবং ‘জুতার মালা দে, হিন্দু মাগী কাওরানবাজারে পূজা করে’ মনে ঝনঝন করতে থাকে। কিছুতেই সামলাতে পারি না। বারবার মানুষের প্রতি আস্থাহীনতা গ্রাস করে।

একদিন একটা অটিস্টিক শিশুর মা, আমাকে দেখিয়ে তার সন্তানকে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘তুমি চেনো এই আন্টিকে?’ অটিজমের স্বাভাবিক অস্থিরতা একটু থামিয়ে দিয়ে ফুটফুটে মেয়েটি গেয়ে উঠেছিলো, ‘আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক।’

এটিএন নিউজের ‘এই বাংলায়’ অনুষ্ঠানের সিগনেচার টিউন সেই লাইনটি দিয়ে আমাকে এক অটিস্টিক বাচ্চার চিনে নেওয়ার অপূর্ব বোধটি নিয়েই আমি ‘মানুষে বিশ্বাসী’। আমার কাছে দেশ মানে ‘এক লোকের পাশে অন্য লোক’।

সেই বিশ্বাসের অনুভূতির মধ্যেই আমার ওপর মব আক্রমণের অডিও-ভিডিও আমাকে হন্ট করে। করছে প্রতিনিয়ত। এই অনুভূতি থেকে শঙ্কা আর অবিশ্বাস। আর এ কারণে আমি ফোন ধরতে পারি না কারো, ধরি না কারোরই। কিন্তু সেদিন কেন যে একটা অচেনা নম্বরের একটা কল রিসিভ করলাম, বলতে পারবো না। ফোনের ওই প্রান্তে যিনি, তিনি পরিচয় দিলেন, ‘সালাম ওয়ালাইকুম আফাআআ...। কেমুন আছেন? কই আছেন? আপ্নেরে এটিএনে দেহি না কেন? আমি আল আমীন মৃদা। মাছ বেচি। মনে নাই আপনার। আগে কাওরানবাজার থেইকা যে মাছ কিনতেন, আমি হেই আলামিন বাই।’

আমি পাল্টা সালাম দিয়ে উনার খোঁজখবর নিলাম। জানতে চাইলাম, কী কারণে ফোন করেছেন তিনি।

বললেন, ‘আমাগো এহানকার (কাওরান বাজারের মিডিয়াপাড়ার) পূজাটা হইবো না এইবার?

একবার যে এক ঢাকী ব্যাডারে আনছিলেন। ব্যাডায় দুই ঘণ্টা ধইরা ঢাক পিডাইলো। নাচছিলামও হালায়! খাওন তো খুব ভাল খাওয়াইতেন, আফা। কী সোন্দর মেহমানদারি আপনের। বইনের হাত থিকা খাওন খাইতাম। হইবো না এইবার পূজাডা?’

আল আমীন মৃধা ভাই আমার বোধের ক্ষতে একটু সুস্থতা বুলিয়ে দিলেন। আবৃত্তি উৎসবের জন্য মুখস্থ কয়েকটা লাইন আওড়াই আমি:

‘মানুষের উদ্বোধনে অবিশ্বাসী হয়ো না মানুষমানুষের উজ্জীবনে আস্থাহীন হয়ো না সারথীআবার আসবে সেই সময়ের বাঁকআবার আসবে সেই জাগরণী ধবল প্রহরইতিহাসের প্রগতি রুদ্ধ করে শক্তি আছে কার?মানুষের অগ্রযাত্রা বন্ধ করে শক্তি আছে কার?মানুষ জাগবে ঠিকপুনরায় জাগবে মানুষ।’

লেখক: সাংবাদিক

 

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin