লোনা মাটিতেও বাণিজ্যিক ঘাস চাষের অপার সম্ভাবনা!

লোনা মাটিতেও বাণিজ্যিক ঘাস চাষের অপার সম্ভাবনা!

কাজের সুবাদে সাতক্ষীরার আশাশুনি ও বাগেরহাটের মোংলায় গিয়ে চোখে পড়ে, ওখানকার গরুগুলো একেবারেই হাড্ডিসার। দেখে বড্ড মায়া লাগে। অথচ ৩০ বছর আগেও এখানকার গরুর স্বাস্থ্য এমনটা বেহাল ছিল না। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

শুধু এই দুই উপজেলা নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের বেশিরভাগ এলাকার মাটি ও পানি লবণাক্ত। যার ফলে কেবল ফসল উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত এবং কৃষিখাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্তই হয়নি, সরাসরি প্রভাব পড়েছে গোখাদ্য উৎপাদনে ও জোগানে। তবে আশার কথা হচ্ছে, গোখাদ্যের সংকটের সমাধান রয়েছে প্রকৃতির মাঝেই। গোখাদ্যের বিশাল অভাবের জায়গাটা ঘাস উৎপাদন করে পূরণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন গবেষক ও কৃষিবিদগণ। এমনকি গোখাদ্যের জোগান মিটিয়ে এই ঘাষ রফতানি করা সম্ভব বিদেশেও।

ঘাস নিয়ে উন্নত দেশগুলোতে অনেক গবেষণা হয়েছে। গবেষণা করে মরু এলাকাতেও ঘাস ফলানো সম্ভব হয়েছে। কাজেই লোনা মাটিতেও ঘাস ফলানো যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৫ কোটি গবাদিপশু রয়েছে। এই প্রাণীগুলোর খাদ্য চাহিদা বছরে ৭ কোটি টন শুকনো পদার্থ। কিন্তু ঘাসের উৎপাদন হয় ৪ কোটি টনেরও কম। ফলে প্রাণিসম্পদ খাতে ৪০-৫০ শতাংশ গোখাদ্যের ঘাটতি রয়েই যায়, যা সরাসরি দুধ ও মাংস উৎপাদনে প্রভাব ফেলে।

অনেকের হয়তো নাও জানা থাকতে পারে যে, গবাদিপশু উৎপাদন খরচের প্রায় ৭৫ ভাগ খাবারের পেছনে ব্যয় হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কৃষকদের নির্ভর করতে হয় বিদেশি গোখাদ্যের ওপর। অথচ বিদেশে বেশিরভাগ খামারি গোখাদ্য নিজেরা উৎপাদন করে। ফলে তারা পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাদ্য গবাদিপশুকে খাওয়াতে পারে। এতে গোবাদি পশু হয় তরতাজা। দুধ ও মাংসের জোগান দুটিই মেলে অপেক্ষাকৃত ভালো।

গোখাদ্যের জোগান দিতে বাড়ির আশপাশে ঘাস লাগিয়েছেন মোংলা উপজেলার বুড়িরভাঙ্গা ইউনিয়নের কৃষক জামসেদ আলী। কথা হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার ৭টা গরু আছে। বাজারে ওগো খাওনের দাম অনেক। উপায় না পাইয়া আশেপাশে ঘাস লাগাইছি। সেই ঘাস গরুক খাওয়াই। এতে আমার ওগো খাওনের জন্য চিন্তা কমছে। তাছাড়া ফেলনা জায়গাতেও ঘাস লাগিয়েছি। এই ঘাস খায়া আমার গরু ওহন ভালা আছো।’

এই অঞ্চলের হাজার হাজার বিঘা জমি অনাবাদী থাকায় গোখাদ্যের সংকট আরও প্রকটভাবে দেখা দেয় বর্ষাকাল ও শুষ্ক মৌসুমে। এখন জামশেদ আলীকে দেখে অন্যরা ঘাসচাষে উৎসাহিত হলে বিষয়টা অবশ্যই সাফল্যের। এ ক্ষেত্রে আমাদের পরিকল্পনা করতে ঘাসকে কীভাবে একটি বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে। এ জন্য সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন।

প্রথমত, দেশে গবাদি পশুখাদ্যের যে চাহিদা রয়েছে তা উৎপাদনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। তাই, এই ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে ঘাসের চাহিদাভিত্তিক উৎপাদন শুরু করা যেতে পারে। উৎপাদিত ঘাস শহুরে খামার, ডেইরি ফার্ম বা বিদেশি বাজারে সরাসরি ছোট প্যাকেটে শুকনো ঘাস কিংবা সাইলেজ আকারে সরবরাহ করা সম্ভব। সংরক্ষণ প্রযুক্তি হিসেবে সাইলেজ ও হেইমেকিং (শুকনো ঘাস) ব্যবহার করা হলে ঘাসকে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এবং কৃষকেরা এটি বাজারজাত করে সারা বছর বিক্রি করতে পারবেন। এ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় কৃষক, সংগ্রাহক, উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে শহুরে খামারি ও বিদেশি  ক্রেতাদের সমন্বয়ে একটি ভ্যালু চেইন গড়ে তোলা দরকার।

এর পাশাপাশি, রফতানি বাজারও বড় একটি সম্ভাবনা তৈরি করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার যেমন, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই (ভারত, নেপাল, ও আফ্রিকা) শুকনো ঘাস ও সাইলেজের চাহিদা রয়েছে। সঠিক প্রক্রিয়াজাত ঘাসের মূল্য দেশে কেজি প্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা, এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ৫৮ ডলার পর্যন্ত হয়। ফলে মানসম্পন্ন ঘাস উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশেরও এ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

ঘাস চাষ ও সংগ্রহের পর সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত ঘাস কাটার সময় হয় সকালের প্রথম দিকে বা বিকেলের শেষ দিকে, যাতে আদ্রতা কম থাকে। কাটার পর ঘাস ধুয়ে শুকানো হয়, যেখানে আর্দ্রতা ৫-১০ শতাংশ রাখতে হয়। এরপর সাইলেজ তৈরি করা হয়, যা  কেটে ভ্যাকুয়াম বা বাণিজ্যিক ওভেনে শুকানো হয়। শেষ পর্যায়ে সংরক্ষণ ও প্যাকেজিং করা হয় স্বাস্থ্যসনদ ও মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে, যাতে এটি রফতানির উপযোগী হয়। সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ঘাস আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি করা সম্ভব এবং রফতানি আয় দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিক পদ্ধতিতে ঘাস চাষ ও প্রক্রিয়াজাত করা হলে দেশে দুধ-মাংসের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভবের পাশাপাশি কৃষক ও উদ্যোক্তাদের জন্য বাণিজ্যিক সুযোগ সৃষ্টি হবে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে, বিশেষত লবণাক্ততাপ্রবণ যেসব এলাকায় গবাদি পশুখাদ্যের যে বিশাল অভাব রয়েছে, সেখানে গোখাদ্য হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে ঘাস উৎপাদন করার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলেও মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাজারে গোখাদ্যের দাম তুলনামূলক অনেক বেশি। এক্ষেত্রে আমরা ঘাসচাষে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে পারি। গবাদিপশুর চাহিদা মিটিয়ে সেগুলো স্থানীয়ভাবে বিক্রিও করা যায়।

একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশের মানুষ বাজারে ঘাস বিক্রি করার কথা কখনও চিন্তাও করেনি। তবে, এখন ঘাস বিক্রির বিশাল একটা ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। আমাদের দেশের অনেক কৃষক জমি আলাদা করে রাখে ঘাস উৎপাদনের জন্য। কোরবানির ঈদের সময় প্রায় কোটি টাকার ঘাস প্রতিবছর বিক্রি হয়।

কাজেই গোখাদ্যের যে বিশাল অভাব রয়েছে, সেই জায়গাটা আমরা ঘাস উৎপাদন করে সহজেই পূরণ করতে পারি। গোখাদ্যের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমানো ও গবাদি পশুর পুষ্টি বৃদ্ধিতে ঘাস খুবই গৃরুত্বপূর্ণ। গরুকে যত ভালোমানের ঘাস খাওয়ানো যাবে, স্বাাস্থ্যও তত ভালো হবে। যে জায়গায় ঘাস গরুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেই এলাকা ঘাসের জন্য গোচারণক্ষেত্র হিসেবে সংরক্ষিত রাখতে হবে।

ঘাসচাষে বিষয়ে কৃষকদের আরও বেশি করে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। গোখাদ্যের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমানো ও গবাদি পশুর পুষ্টি বৃদ্ধিতে সড়কের দু’ধারে নেপিয়ার, গুয়েতেমালা ও জারাসহ নিচু জমিতে জার্মান জাতের ঘাস লাগানো যেতে পারে। এর ফলে একদিকে কমবে গোখাদ্য হিসেবে বিদেশি খাবারের ওপর নির্ভরতা। অন্যদিকে খামারিদের গরু লালন-পালনের খরচও হ্রাস পাবে।

ঘাস একটি বাণিজ্যিক কৃষিপণ্য হওয়ার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। একেকটা অঞ্চলে একেক জাতের ঘাসচাষ করে বিপ্লব ঘটানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। এ জন্য সরকারকে অবশ্যই ঘাসকে বাণিজ্যিক কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। ফসল ক্যালেন্ডারে ঘাসচাষ নিয়ে পরিকল্পনা চালু করতে হবে। ঘাসকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপ দিতে পারলে তা হয়ে উঠবে কৃষকের ভাগ্য বদলের হাতিয়ার। আমরা যদি ঘাসচাষে বিপ্লব ঘটাতে পারি, তাহলে ভাগ্যের পরিবর্তন হবে গরিব কৃষকসহ সংশ্লিষ্ট অনেকেরই।

লেখক: কর্মসূচি প্রধান, জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচি, ব্র্যাক।

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin