ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর ভাদ্রোৎসব ‘কারাম’

ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর ভাদ্রোৎসব ‘কারাম’

বাঙালি ছাড়াও এ দেশে বসবাস করে আরও অনেক জাতি। যারা ক্ষুদ্র জাতিসত্তা নামেই অধিক পরিচিত। ‘কড়া’ তেমনই একটি জাতির নাম। যারা এ দেশে টিকে আছে সবচেয়ে কমসংখ্যক মানুষ নিয়ে। এদের একমাত্র গ্রামটি দিনাজপুরে, বিরল উপজেলার ঝিনাইকুড়িতে। সেখানে বাস করে মাত্র বিশের অধিক পরিবার।

ভাদ্র মাস। গরমে চারদিকে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এর মধ্যেই রওনা হয়েছি ওই গ্রামে। তাদের একটি লোকোৎসব দেখব বলে।

এই ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রধান উৎসব কারাম। ভাদ্রমাসের চাঁদের পূর্ণিমায় এ উৎসব পালন করে তারা। তাদের বিশ্বাস, এটি তাদের অভাবমুক্তি ও সৌভাগ্যলাভের উৎসব। বিরল প্রজাতির ‘খিল কদম’ গাছের ডাল কেটে এনে এ উৎসবে বিশেষ আচার পালন করে কড়ারা। এ গাছ তাদের কাছে অতি পবিত্র। গাছের ডাল কেটে আনার কাজটি করেন যুবকেরা।

গ্রামটিতে যখন পৌঁছাই, তখন বিকেল হয় হয়। গোত্রপ্রধান বা মাহাতো জগেন কড়ার সঙ্গে আলাপ চলে। খানিক পরই হইচই। এক যুবক পার্শ্ববর্তী ধর্মপুরের গহিন শালবন থেকে কেটে এনেছেন ‘খিল কদম’গাছের একটি ডাল। আমরাও তখন মিশে যাই লোকাচারে।

ঢোল বাজিয়ে বিশেষ ভক্তি দিয়ে দেবতারূপী ডালটিকে কড়ারা নিয়ে আসে পূজাস্থলে। সেখানে আগে থেকেই বাঁশ ও শাপলা ফুল দিয়ে তৈরি করে রাখা ছিল মাড়োয়া। অতঃপর ডালটিকে বরণ করে মাটিতে গেড়ে দেওয়া হয়।

সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। প্রতিটি বাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে আঙিনা পরিপাটি করে সাজানো হয়। এ সময় ঘরে ঘরে তেলের পিঠা ভাজার শোঁ শোঁ শব্দ পাওয়া যায়। কড়ারা বলে, তেলের পিঠা ছাড়া কারাম উৎসব হয় না।

উৎসবের শুরুতেই গ্রামপ্রধান বিশেষ আচার মেনে ডালটির সামনে পূজা দেন। মাটিলেপা একটি স্থানে কলাপাতা বিছিয়ে পাশে রাখা হয় একটি কাঁসার থালা। থালায় থাকে প্রদীপ, কাঁচা ছোলা, জুঁই ফুল, শসা ও সিঁদুর। এ সময় দুটি লাল মুরগা (মোরগ) বলি দিয়ে উৎসবের শুভসূচনা করা হয়।

এই উৎসবে মেয়েরা শাঁখা, সিঁদুর, টিকলি, খাড়ু পরে নেয়। বলিপর্বের পরই শুরু হয় উৎসবের পেছনের পৌরাণিক কাহিনি বলার আসর। মূলত এ কারণেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সহজেই ছড়িয়ে পড়ে কারমা বা কারাম উৎসবের বিশ্বাসটি। কাহিনি বলার পর্বে খিল কদম বা কারাম ডালটিকে ঘিরে বসেন নারীরা। সেজেগুজে ঘোমটা টেনে বসেন তাঁরা। সামনে কাঁসার পেয়ালায় রাখা হয় প্রদীপ, তেলের পিঠা, ছোলা, দূর্বাঘাস ও জুঁই ফুল।

গোত্রপ্রধান বা মাহাতো বলতে থাকেন উৎসবের পৌরাণিক কাহিনিটি। মাঝেমধ্যে তিনি উচ্চৈঃস্বরে বলেন, ‘ফুল ফেকিয়ে।’ ঠিক তখনই সবাই একমুঠো জুঁই ফুল বা ঘাস ছুড়ে দেয় ডালটির দিকে। কাহিনি শেষে মনের নানা ইচ্ছা নিয়ে সবাই তাদের বানানো তেলের পিঠা বেঁধে দেয় কারাম ডালটির সঙ্গে। উৎসবের এই পর্বে শুধু মেয়েরাই অংশ নিতে পারে। পূজা শেষে উপোসকারীরা উপোস ভাঙে। রাতভর ডালটির চারদিকে নেচেগেয়ে প্রিয় পানীয় হাঁড়িয়া খেয়ে আনন্দ করে তারা। ভোরে তা বিসর্জন দেয় নিকটবর্তী নদী বা পুকুরে।

কেন এবং কোন সময় থেকে এই ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ কারাম উৎসব পালন করে আসছে? উৎসবে তাদের বলা লোকগাথা থেকেই তা জানা যায়। কড়া গোত্রের প্রধান জগেন কড়ার মুখে শোনা সেই লোকগাথাটির ভাবার্থ:

কারাম আর ধারাম দুই ভাই। কারাম বড়। ধারাম ছোট। পারাবেতী তাদের একমাত্র বোন। ভাদ্র মাসে একবার গ্রামের এক ধনী ব্যক্তি ঢোল পিটিয়ে তার জমিতে ‘হাউলি’র (ধান গাড়ার) ডাক দেয়। অন্যদের সঙ্গে কারাম-ধারামও যায় সেখানে।

কাজ শুরু হয় খুব ভোরে। কিছু চারা লাগানোর পরই সকালের নাশতা বা পান্তার ডাক পড়ে। দুই ভাই তখন কলাপাতা বিছিয়ে বসে যায় লাইনে। কিন্তু তাদের কাছে এসেই তা শেষ হয় যায়। পান্তা না পেয়ে বড়ই দুঃখ পায় তারা। নিজেকে সামলে নিয়ে দুপুরে খাবারের আশায় তারা আবার কাজে ফেরে। কিন্তু এবারও ঘটে একই ঘটনা। তাদের কাছাকাছি এসেই খাবার শেষ! ব্যথিত হয় দুই ভাই-ই। রাগে-কষ্টে তারা তাদের হাতে লাগানো রোয়া তুলে ফেলতে রওনা দেয়।

পথেই ছিল একটি বড় বটগাছ। হঠাৎ সে কথা বলে ওঠে। তাদের রাগ ও দুঃখের কারণ জানতে চাইলে দুই ভাই বটগাছকে সব খুলে বলে।

সব শুনে বটগাছ বলে, ‘তোদের কারমা কপাল জেড় গেলে’ অর্থাৎ ‘তোদের কর্মভাগ্য পুড়ে গেছে।’

এখন উপায়?

‘সাতসমুদ্র লঙ্কা পার হয়ে আনতে হবে কর্মভাগ্যকে’।

বটগাছের কথামতো কারাম-ধারামও রওনা হয় কর্মভাগ্য ফিরিয়ে আনতে।

পথে তাদের সঙ্গে দেখা একটি কুলগাছের। দুই ভাইয়ের ঘটনা শুনে সে–ও জানায় তার দুঃখের কথাটি। তার ফল পেকে মাটিতে পড়ে থাকে কিন্তু কেউ সে ফল খায় না। তার ভাগ্যটিও জেনে আসতে তাদের সে অনুরোধ করে।

যেতে যেতেই কারাম-ধারামের দেখা হয় একটি ডুমুরগাছের সঙ্গে। তাদের লঙ্কা পার হওয়ার কথা শুনে সে আফসোস করে বলে, ‘আমার এমন সুদৃশ্য ফল পেকে থাকে। কিন্তু মানুষ ও পাখি সেদিকে ফিরেও তাকায় না।’ সে অনুরোধ করে তার ভাগ্যটিও জেনে আসার।

কিছু দূর যেতেই কারাম আর ধারামের সামনে পড়ে একটি নদী। নদীতীরে দুটি হাতি নিজেদের মধ্যে মারামারি করছিল। তাদের পুরো শরীর কাদায় ঢাকা। কারাম-ধারামের কথা শুনে তারা দুঃখ করে বলে, ‘আমরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে আর কতকাল কাদায় ঢাকা থাকব? আমাদের কি কেউ গোসল করিয়ে পরিষ্কার করে রাখবে না? তোমরা আমাদের ভাগ্যটিও জেনে এসো।’

নদী পার হয়ে কিছু দূর যেতেই পড়ে লঙ্কা সমুদ্র। কিন্তু বিশাল এ সমুদ্র দুই ভাই কীভাবে পার হবে?

সমুদ্রে ছিল বড় একটি কুমির। সাত দিন আগে তার গলায় বিঁধেছে আইড় মাছের কাঁটা। যন্ত্রণায় তার ঘুম হারাম। সে কারাম-ধারামের সাহায্য চাইল। সমুদ্র পার করা ও নিয়ে আসার শর্তে দুই ভাই কুমিরের গলার কাঁটা বের করে দিল। অতঃপর কুমিরের পিঠে চড়ে লঙ্কা সমুদ্র পার হতেই তারা দেখা পায় তাদের কর্মভাগ্যের।

সারা শরীর তার পোকায় খাচ্ছিল। কারাম-ধারাম স্পর্শ করতেই সেটি গাছ হয়ে গেল। দুই ভাইয়ের মনে তখন অন্য রকম শক্তির সঞ্চার হয়। তখন তারা সেই গাছ ঘাড়ে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল।

ফেরার পথে হাতি দুটো তাদের ভাগ্যের কথা জানতে চাইলে কারাম-ধারাম বলে, এমন একজন লাগবে যে তোমাদের শরীর পরিষ্কার করে দেবে। হাতি দুটি মিনতি করে তাদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার। দুই ভাই তখন দুই হাতির পিঠে চড়ে বসে।

এরপর ডুমুরগাছ তার ভাগ্যের কথা জানতে চাইলে তারা বলে, তোমার গোড়ার মাটির নিচে সাত কলসি ধন আছে। সেটি সরালেই তোমার ফল সবাই খাবে। ডুমুরগাছ কারাম-ধারামকে তা তুলে নেওয়ার অনুরোধ করে। তারা তখন সাত কলসি ধন হাতির পিঠে তুলে নেয়।

কুলগাছের সঙ্গে দেখা হতেই দুই ভাই তাকেও একই কথা বলে। সে–ও মাটির নিচের সাত কলসি ধন তুলে নেওয়ার মিনতি করে।

এভাবে দুই ভাই কর্মভাগ্যকে নিয়ে আসে ওই বটগাছটির কাছে। বটগাছ কর্মভাগ্যরূপী ওই গাছটিকে মাটিতে গেড়ে তাদের বোন পারাবেতীকে দিয়ে পূজা করার নির্দেশ দেয়। তারা তা–ই করে। কড়া জাতিগোষ্ঠীর বিশ্বাস, সে সময় থেকেই পৃথিবীতে কারাম উৎসবের আয়োজন হয়ে আসছে।

কড়ারা এটিকে কারাম উৎসব বললেও সাঁওতাল, মাহালি, ওঁরাওসহ সমতলের অন্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার কাছে এটি কারাম উৎসব। এই ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষেরা আজও চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করছে। কিন্তু তবু প্রতি ভাদ্রে তারা ধুমধামের সঙ্গে উদ্‌যাপন করে এ উৎসব। তাদের বিশ্বাস, গাছরূপী দেবতা কারাম গোঁসাই একদিন ঠিক ঠিক তাদের ঘরে আসবেন। তখন তাদের দুঃখে ভরা জীবনেও লাগবে সৌভাগ্যের সুবাতাস।

কারমা বা কারাম উৎসবের মতো এ দেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত নিজস্ব আচার, উৎসব ও সংস্কৃতি। দারিদ্র্য ও সংখ্যাগরিষ্ঠের আগ্রাসী সংস্কৃতির চাপে আজ তা প্রায় বিপন্ন। তবু এই প্রান্তজনেরা ধরে রেখেছেন নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উৎসবগুলোকে। উৎসবগুলোর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে বিশ্বাসের চমৎকার সব লোকগাথা। যুগে যুগে যা সমৃদ্ধ করেছে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সাহিত্যকেও।

Comments

0 total

Be the first to comment.

নব্বই দশকি জীবন Prothomalo | মুক্ত গদ্য

নব্বই দশকি জীবন

মধ্যরাত হলে কে শোনেননি শেয়ালের হুক্কাহুয়া ডাক? কে দেখেননি অন্ধকার রাতে সারি সারি জোনাকিদের? হারিকেনে...

Sep 17, 2025

More from this User

View all posts by admin