ফ্রানৎস ফানোঁ একদা লিখেছিলেন, উপনিবেশ হলো এমন একটা জায়গা, যেখানে মানুষগুলো যেকোনো জায়গায় যেকোনোভাবে জন্ম নেয়। তারা যেকোনো জায়গাতেই যেকোনোভাবে মারাও যায়। উপনিবেশ এমন একটা জায়গা, যেখানে কোনো স্থান নেই। মানুষ একে অপরের ওপর স্তূপের মতো থাকে, বাস করে। ঘরগুলো একে অপরের সঙ্গে একদম এঁটে থাকে।
ফ্রানৎস ফানোঁ যেভাবে উপনিবেশের এই চিত্র এঁকেছেন, বাস্তবে ফিলিস্তিন, ফিলিস্তিনের মানুষের জীবন এর থেকেও করুণ, বিভীষিকাময়। এখানে প্রতিদিন মানুষ লড়াই করে বেঁচে থাকে। ফিলিস্তিনের শিশুদের জীবন আরও করুণ, বিবর্ণ আর পদে পদে বিপৎসংকুল। ১৯৬৭ সাল থেকেই যখন দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনে তাদের দখলদারি জারি রাখতে মানুষ হত্যা আর নিপীড়ন–নির্যাতনের মাত্রা বাড়াতে থাকে, তখন থেকেই শিশুদের জীবনে নেমে আসে দুর্দশা।
এরপর দফায় দফায় ইসরায়েলের দখলদারত্ব আর হামলায় এ দুর্দশা ক্রমে বাড়তেই থাকে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী শুধু ৭ অক্টোবর ২০২৩ সালের পর থেকে ইসরায়েলের হামলায় প্রাণ হারিয়েছে এবং হতাহত হয়েছে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি শিশু। আর না খেয়ে মারা গেছে এবং হাড্ডি জিরজিরে হয়ে টিকে আছে অনেক শিশু। কিন্তু যেসব শিশু এত হামলা, এত ধ্বংসের মধ্যে বেঁচে আছে, কী জীবন তারা পার করছে?
গত গ্রীষ্মে ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কলোনিয়ালিজম অ্যান্ড অ্যান্টি–কলোনিয়াল রেজিস্ট্যান্স ইন সাউথ এশিয়া অ্যান্ড সাব–সাহারান আফ্রিকা’ নামে একটি কোর্স পড়িয়েছিলাম। ওই কোর্সে দুর্দান্ত এক ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। নাম ফাতিমা খালিদ। জন্ম ফিলিস্তিনে কিন্তু উদ্বাস্তু হয়ে জীবন কাটিয়েছিলেন তিউনিসিয়ায়। এরপর বহু পথ পাড়ি দিয়ে ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউরোসায়েন্স পড়ছেন। তাঁর আশা— পড়া শেষে একদিন ফিলিস্তিনে ফিরে যাবেন। আমি হতাশা লুকিয়ে রাখতে না পেরে বলেই ফেলেছিলাম, ফিলিস্তিন কি থাকবে?
কী দারুণ আত্মবিশ্বাস তাঁর। বললেন, পৃথিবীর মাটি থেকে ফিলিস্তিন মুছে ফেলা সম্ভব না। ফিলিস্তিন থাকবে, পৃথিবী যত দিন থাকে। এর পরই নানা কথায় ফাতিমা বললেন, তিনি ফিলিস্তিনের উদ্বাস্তু শিশুদের জীবন নিয়ে একটি ডকুমেন্টেশন করেছেন। কীভাবে শিশুরা তাদের দিন কাটাচ্ছে, কী ভাবছে তারা, এসব। শিশুদের লেখা চিঠি আর আর্ট সংগ্রহ করেছিলেন ফাতিমা। ফাতিমা বলেছিলেন, ‘আমি চার মাস ধরে শিশুদের গল্প শুনেছিলাম, তাদের বেদনা, তাদের আনন্দ ও ভয়ের কথা। প্রথমে আমার সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলতে ওদের কষ্ট হচ্ছিল।
ফাতিমা বলছিলেন, ‘পূর্ব রাফার আইল্যান্ড স্কুল টেন্টের শিশুরা সুদানে উদ্বাস্তু হওয়া শিশুদের এই চিঠিগুলো লিখেছিল। ইসরায়েলের বোমা হামলায় গাজায় শিশুদের এই স্কুলটি পুরো ধ্বংস হয়ে যায়। আমরা শিশুদের বলেছিলাম, তোমাদের যা লিখতে ইচ্ছা হয়, তোমরা লেখো। তোমাদের যা আঁকতে ইচ্ছা হয়, তোমরা আঁকো।
প্রথমে আমাদের বড় সমস্যা হয়েছিল চিঠিগুলো লিখতে যে উপকরণগুলো দরকার; যেমন কাগজ, কলম, রং ও পেনসিল, সেগুলো আমাদের পৌঁছাতে খুব সমস্যা পোহাতে হয়েছিল। কারণ, ইসরায়েল গাজায় কাগজ ও কলম নিষিদ্ধ করেছে। গাজার আইল্যান্ড টেন্ট স্কুলের শিশুদের এসব চিঠি ও পেইন্টিংয়ের কিছু কথা এখানে বলছি।
এসব চিঠি লিখেছিল ও পেইন্টিংগুলো এঁকেছিল গাজার আইল্যান্ড টেন্ট স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা। তাদের কেউ তখন গাজায় ছিল আর কেউ কেউ উচ্ছেদ হয়ে সুদানে চলে গিয়েছিল। সুদানে উচ্ছেদ হওয়া তাদের স্কুলের বন্ধুদের কাছে এই চিঠিগুলো লেখা। সুদান থেকে গাজার আইল্যান্ড টেন্ট স্কুলের শিশুরা আবার গাজার শিশুদের কাছে চিঠি লেখে।’ এই চিঠিগুলোই এই বইয়ের মাধ্যমে ফাতিমা খালিদ পৌঁছে দেন তাদের বন্ধুদের।
গাজা উপত্যকার ১৪ বছর বয়সী আরিমা খালিদ লিখেছে, ‘আমি আরিমা খালিদ। আমার বয়স ১৪ বছর। আমি গাজা উপত্যকার রাফা ডিস্ট্রিক্টে বাস করি। আমি আমার এই ছোট্ট জীবনে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে শিখেছি, শিক্ষা ছাড়া আমাদের শত্রুকে পরাজিত করার কোনো উপায় নেই।
আমি যুদ্ধের বিভীষিকা দেখেছি হত্যার মধ্য দিয়ে, ধ্বংসের মধ্য দিয়ে, ভয়ের মধ্য দিয়ে, হতাহতের মধ্য দিয়ে আর উদ্বাস্তু হওয়ার মধ্য দিয়ে। মানুষের ভয় ও বেদনার মধ্য দিয়ে তাদের বিজয়ী এবং স্বাধীন হতে হবে। মানুষকে বোমা ও আগুনের মধ্য দিয়ে তাদের শিক্ষা চালিয়ে যেতে হবে এবং আত্মমর্যাদা ও সফলতা অর্জন করতে হবে।’
সামা উসামা লিখেছে, ‘আমি গাজার গর্বিত শিশু। আমার শৈশব থেকে এক বছরের বেশি হারিয়ে গেছে। আমি বোমা ও বারুদের শব্দের মধ্যে ঘুমাচ্ছি। এসব কঠিন সময়ের মধ্যেও আমার আশা—আগামী দিনগুলো সুন্দর হবে। এ জন্যই আমি পড়া, লেখা ও পবিত্র কোরআন মুখস্থ করছি, যেন আমি সবকিছুর সাক্ষী হতে পারি এবং নিজেকে রক্ষা করতে পারি। আমি পৃথিবীর সব শিশুকে তাদের পড়া, লেখা ও পবিত্র গ্রন্থ মুখস্থ করার অনুরোধ করছি।’
আট বছর বয়সী মোতাসিম লিখেছে, ‘আমরা অ্যাডাম হারুন পরিবার। আমরা আট বছর বয়সী মোতাসিম অ্যাডাম হারুন, ১৩ বছর বয়সী মোয়াইদ অ্যাডাম হারুন, ১০ বছর বয়সী মালাথ অ্যাডাম হারুন। আমরা যুদ্ধের কারণে উদ্বাস্তু হয়েছি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে খরচ এবং পরিবারের কঠিন সময়ের কারণে আমরা স্কুলে যেতে পারিনি। আমরা সবাই ফিলিস্তিনকে সমর্থন করছি এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা কামনা করছি।’
আল মুজাম্মিল লিখেছে, ‘আমি আল মুজাম্মিল মেহেদী। আমি ১২ বছর বয়সী। খার্তুম থেকে। যুদ্ধের বিভীষিকা ও উদ্বাস্তু হওয়ার মধ্যে থেকে, বারুদের শব্দের মধ্যে থেকেও আমি দুই বছরে ১০ পারা কোরান মুখস্থ করেছি। আমি ফিলিস্তিনের সব শিশুকে আমার শুভেচ্ছা জানাচ্ছি, বিশেষ করে গাজার শিশুদের।’
এ ছাড়া ফিলিস্তিনি শিশুরা ছবি এঁকে বিশ্বকে বলছে, ‘আমরা মাথা নত করব না। তারা ছবি এঁকেছে সুসময়ের। জলপাই তোলার সময়ের। তারা ছবি এঁকেছে, তারা যেন আর দশটি শিশুদের মতো খেলতে পারে। তাদের ছবিতে, চিঠিতে হতাশা আছে, আছে হত্যা ও ধ্বংসের কথা। আবার আশার কথাও আছে। আছে জীবনের কথা। নতুন করে জীবন গড়ার কথা। এসব ফিলিস্তিনি শিশুই নতুন ফিলিস্তিনের সারথি।’