ভূমেন্দ্র গুহ’র সম্পাদনায় জীবনানন্দ দাশের অগ্রন্থিত প্রচুর কবিতার স্পর্শ আমরা পাই, যা তার আগের কোনো রচনাবলিতে বা কাব্য সংকলনে ছিল না। এই কবিতার কিছু ছাপা হয়েছে, কিছু ছাপা হয়নি। বেশিরভাগ ছিল তাঁর কবিতার খাতায়। এসব কবিতা তিনি কেন ছাপেননি বা গ্রন্থভুক্ত করেননি সে কারণ অজানা। তবে এই সব কবিতাতেও জীবনানন্দকে গভীরভাবে চেনা যায়। ধরে নেওয়া যায়, জীবনের শেষের দিকে এসে তীব্র এক হতাশা কবিকে গ্রাস করে ফেলেছিল, তবে সেই অসহায় মানবিক বিপর্যয়ের মুহূর্তেও তিনি কবিতার নির্মাণকে ম্লান হতে দেননি, কখনো বিকারগ্রস্ততা বেরিয়ে এসেছে বোঝা যায়, তবে তাকে শিল্পময় করে তোলার চেষ্টা ছিল কবির, তাও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এই সময়েও তিনি বাংলার প্রকৃতি, বিশেষত তাঁর প্রিয় ঋতু হেমন্তের বিচিত্র রূপকে ব্যবহার করেছেন কবিতায় তাঁর ভেতরের নির্বেদকে এক আলাদা কাব্যিক চেহারা দেবার জন্য। এটা ঠিক যে ‘রূপসী বাংলা’র কবি এখানে খানিকটা ম্লান, তবে হেমন্ত এসব কবিতায় উপস্থিত কবিসত্তার টুকরো টুকরো অংশকে পাঠকের সামনে উপস্থিত করতে। বাংলার প্রকৃতি ও নিসর্গকে তাঁর মতো করে কবিতার সূক্ষ্ম অনুষঙ্গ করে ব্যবহারের নমুনা আর কেউ করতে পারেননি। এক নিরাসক্ত অথচ গভীর অনুভবের দ্যোতনাকে তিনি ধরে রেখেছেন প্রকৃতির রং, বর্ণ, বিভা ও ধূসরতা দিয়ে। আমরা তার সমস্ত কবিতায় ভিন্নভাবে হেমন্তকে নতুনভাবে পরিব্যাপ্ত হতে বা প্রকাশিত হতে দেখি, যা বেশির ভাগ সময় তার নিজের ভেতরের অনুভূতির বিপন্ন রং।
এ কথা স্বীকার্য যে, বাংলায় হেমন্ত ঋতুর যে বৈচিত্র্য ও বিভূতি নিয়ে হাজির হয় তা বোঝার ক্ষমতা সবার নেই; বর্ষা ও শরতের পর শীতের আগমনের আগে স্বল্পস্থায়ী এই ঋতু যে সূক্ষ্ম প্রণোদনার উদ্রেক করে, তা উপলব্ধি করার জন্য আমাদের গভীর ও নিবীড় পর্যবেক্ষণ শক্তিকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। ইউরোপে বা অন্য জায়গাতে হেমন্ত নেই বলা হয়। সেখানে চার ঋতু প্রধান। বাংলায় হেমন্তের রূপ আমাদের নদী গাছপালা, ফসল, শস্য, ফুল, পাখি বা সার্বিকভাবে নিসর্গে যেভাবে বিস্তার করে থাকে তা এক কথায় অপূর্ব। তখন চারদিকে যেন ভাঙনের পর্ব শুরু হতে থাকে, উজ্জ্বল প্রকৃতির রং ফিকে হতে থাকে, নদী, খাল, হাওর বিল শুকিয়ে যেতে থাকে, ফসল কাটা শেষের বিস্তীর্ণ মাঠ পড়ে থাকে অলসতায়, গাছের পাতা ঝরে যায়, আবার নতুন পাতাও জেগে ওঠে; ফুলের কুড়িতে ফুল ফুটছে, ঘাসের বুকে ছোট ছোট নীল ফুল, নরম কোরক আলো সূর্যের, একটু শীত, কুয়াশামাখা সকাল, মাঠের খেতে হলুদের রাজ্য, রুগ্ণ প্রকৃতির কোলে নতুন পাতার হাতছানি এই সব বাংলার হেমন্তের ছবি। যারা হেমন্তকে শীতের আগমনি হিসেবে দেখে, যারা মরা নদীর মুখে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা নৌকা দেখে, যারা ধানের গাদার ফাঁক দিয়ে পুকুরের অল্প পানিতে হলুদ রঙের গাঢ় আস্তরণ দেখতে পায়, তারা খানিকটা হেমন্তকে চেনে। হেমন্তকে চেনে এ দেশের কৃষান কৃষানি, মাঝি, মাল্লার কিংবা কবিয়াল কিংবা কুমার। সাধারণ পেশাজীবী সব গ্রামীণ মানুষ চেনে হেমন্তকে, শহুরে মানুষ হেমন্তকে চেনার কোনো সুযোগ নেই। তবু বাংলার প্রকৃতিতে এখনো হেমন্ত রয়ে গেছে তার নিজস্ব ইজেলে, তার বিচিত্র বর্ণ বিভায়; আমরা পালটে গেছি স্বভাবের তাড়নায়, কৃত্রিম নাগরিক জীবনধারার অহেতুক ব্যস্ততায়। ‘সবুজ পাতার খামের ভেতর হলুদ গাঁদার চিঠি লেখে, কোন পাথারের ওপার থেকে আনল ডেকে হেমন্তকে’ লিখেছিলেন সুফিয়া কামাল। সেই চিঠি কি আজো লেখা হয় না? হয়ত হয়, আমরা পড়তে ভুলে গেছি। বাংলা ভাষার প্রধান কবিরা হেমন্তকে নিয়ে পঙ্ক্তি রচনা করেছেন, এখনকার কবিরা হয়ত সেই অর্থে হেমন্তকে চেনেন না, সেই কারণে তাদের লেখায় হেমন্ত বিষয়ক পদ পাওয়া কষ্টকর। রবীন্দ্রনাথের কবিতা-গানে বর্ষার প্রাধান্য থাকলেও হেমন্তও আছে। তবে একথা সত্য, হেমন্তকে সবচেয়ে মহিমান্বিত করেছেন কবি জীবনানন্দ দাশ। তাঁর কবিতায় হেমন্ত নতুন সত্তা হিসেবে প্রকাশিত, তিনি যেন নিজের অনুভূতিকে হেমন্তের রঙে প্রকাশ করতে পেরেছিলেন। বাংলার হেমন্তের এক বিশীর্ণ রূপ আমরা তাঁর রচনায় পাই, তবে সেই রূপ আরোপিত নয়, বরং তিনি কাব্যানুভূতির নির্যাস যুক্ত করতে পেরেছেন হেমন্তের ভেতরে।
ধরে নেওয়া হয়, জীবনানন্দ দাশ রবীন্দ্রপরবর্তী সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী কবি; ভাবনাটি কবিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ কিনা তা ভেবে দেখা দরকার। সমালোচকেরা যা ব্যাখ্যা দেন তা কবিদের বেলায় প্রযোজ্য নয় সব সময়। তবে জীবনানন্দের প্রয়াণের পর এ যাবৎ তাঁর প্রভাব পরবর্তী কবিদের মধ্যে অন্যদের তুলনায় সবচেয়ে বেশি, এই কথা কবিরাও স্বীকার করেন অনেকে। এর নানা কারণ আছে বা এর নেপথ্যে কী কী প্রপঞ্চ জড়িত তা নিয়ে খুব যে গবেষণা হয়েছে এমন বলা যাবে না, তবে পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের কবিতা পড়লে, বা তাদের সাক্ষাৎকার পর্যালোচনা করলে এরকম ধারণা করা যায় যে, কাব্যের প্রকরণকূশলতা, অনুভূতির গভীরতা, জীবনের গভীর দাঢ্য দ্যোতনাকে প্রকাশের কৌশল, প্রকৃতি-সময়-মানব স্বভাব ও প্রবণতাকে ব্যবহার করার জন্য যে শব্দযোজনা, তা থেকে তিনি সম্পূর্ণ নতুন এক জগৎ নির্মাণ করতে পেরেছেন। তাঁর সময়কার অস্থির পৃথিবী (দুটো বিশ্বযুদ্ধ এবং বাংলার অর্থনৈতিক বিপর্যয়) ব্যক্তিজীবনের টানাপড়েন এবং প্রকৃতিকে কবিতার মধ্যে (বিশেষত নদীমেখলা বরিশালের প্রকৃতি-নিসর্গ) চারিয়ে দেবার যে নিজস্ব প্রকরণ, এগুলোই তাঁর কবিতাকে পাঠক ও কবিদের কাছে এক আসক্তির জগতে পরিণত হয়েছিল। মানবিক প্রেম, মানবিক সম্পর্ক, মানবতার বিপর্যয় এবং এসবের সাথে ব্যক্তি কবির মনোবীজ কবিকে যে নিভৃতির জগতে নিয়েছিল তারই শব্দঘ্রাণ আমরা পাই তাঁর কবিতায়। এখানেই প্রকৃতিকে তিনি নিজের মতো করে ব্যবহার করেছেন এবং বেছে নিয়েছেন মূলত হেমন্ত ঋতুকে। হেমন্ত ঋতু তার প্রিয় ঋতু তাতে কোনো সন্দেহ নেই, সেই কথা তিনি আলাদা করে কোনো গদ্যে হয়ত উল্লেখ করেননি, তবে রূপসী বাংলাসহ তাঁর অন্যান্য কাব্য (এমনকি অপ্রকাশিত ও অগ্রন্থিত কবিতা) পাঠ করলে এই পক্ষপাত স্পষ্ট হয়। আমরা ধরে নিতে পারি, তাঁর স্বভাবের সঙ্গে হেমন্ত ঋতু এমনভাবে সাযুজ্যময় হয়ে উঠেছিল যে তাঁর পঙক্তিই সাক্ষ্য দেয় তাঁর কথা, স্বর কিংবা অভিক্ষেপ যেন এই ঋতুর প্রতিটি রূপকণার সাথে অন্বিত হয়ে পড়েছে। হেমন্তের রোদের যে স্বতন্ত্র রূপ হতে পারে, নদী যেভাবে নরম হয়ে শুয়ে থাকে নারীর মতো, জোছনা বা শিশির যেভাবে আলাদা চেহারায় উঁকি দেয় কিংবা শালিকেরা বা অন্য সব তাঁর প্রিয় পাখিরা যে মায়ার বিভা তৈরি করে তা আমরা উপলব্ধি করি তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে। এইভাবে হেমন্তের ভেতরে অবগাহিত হওয়ার যে চঞ্চলতা, যে সূক্ষ্ম বোধজাত অধীরতা যেভাবে পল্লবিত হয় নানা ব্যঞ্জনায় তা থেকে শিহরিত হওয়ার যে আকুলতা তা আমরা পাই জীবনানন্দের কবিতায়। এ কথাও সত্য যে সাধারণ পাঠক যারা প্রকৃতির বর্ণনা খুঁজতে চান কবিতায় বিশেষত হেমন্তের তারা বঞ্চিত হবেন, কারণ কবি ওই অতি সরলপথে হাঁটেন না, বস্তুত তিনি টুকরো টুকরো ছবি তৈরি করেন যা হেমন্তকে প্রকৃতপক্ষে তার নিজস্ব হেমন্তকে চিনে উঠতে বা কবিকে খানিকটা চিনে উঠতে সহায়তা করে। বাহ্য প্রকৃতির জগৎকে ভেতরের নির্বেদে প্রবেশ করানোর রীতিও জীবনানন্দীয়। যেমন, ‘নরনারী হয়ে নেমে পড়ে প্রকৃতি ও হৃদয়ের মর্মরিত হরিতের পথে/ অশ্রুরক্ত, নিস্ফলতা মরণের খণ্ড খণ্ড গ্লানি/ তাহলেও রবে—তবু আদি ব্যথা হবে কল্যাণী/ জীবনের নব নব জলধারা—উজ্জ্বল জগতে।’ মর্মরিত হরিতের পথে গ্লানিময় জীবনের যে কথকতা তিনি তুলে আনেন তাকে আমরা দেখতে পাই এখানে।
কবি নিজেকে চিনে নিতে বলেছেন হেমন্তের মাঝে; এর এক অর্থ হতে পারে তার ভেতরে যে আবেগ ও অনুভূতির রাজ্য তাকে হেমন্ত দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। অন্য অর্থও হতে পারে: তিনি এভাবেই হয়ত হেমন্তকে চিনেছেন। তবে কবিতার কাছে আমাদের দাবি পূরণ হয় এভাবে যে এক গভীর ও সংবেদন ধরা পড়ে এই সব কথামৃতে: ‘আমাকে দেখেছে ঢের অন্তেবাসী মানুষেরা দীর্ঘদিন/ বিশেষত হেমন্তের দিন এলে—বিবর্ণ পাতার ভয়ে পথে এরা/অথবা নদীর পারে কোনও এক সীমাহীন হিম চাঁদমারি’। অন্য এক কবিতায় কবি লিখেছেন: যতদূর চোখ যায় বিকশিত প্রান্তরের কুয়াশার ব্যাস/ সাদা চাদরের মতো কুয়াশার নিচে শুয়ে/ হরীতকী অরণ্যের থেকে চুপে সঞ্চারিত হয়ে/ নিশীথের ছায়া যেন মেধাবী প্রশান্তি এক রেখে গেছে/ প্রতিধ্বনিহীন, হিম পৃথিবীর পিঠে’। হেমন্ত এখানে হিম কুয়াশার পৃথিবী যেখানে নিশীথের ছায়া পড়ে। কবির এই হেমন্ত- অবগাহন আর কারো মতো নয় এবং তা আমাদের আচ্ছন্ন করে, প্রণোদিত করে। হেমন্তকে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন সারা বিশ্বের নানা প্রপঞ্চের মাঝে, বাংলার হেমন্তের ছায়া কায়া রূপকে পৃথিবীর নানামুখী কোলাহলের সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন। এই সর্বব্যাপ্ত হেমন্তকে তিনি কাব্যকুসুমের আলোয় উদ্দীপ্ত করে তুলেছেন: হেমন্ত ফুরায়ে গেছে পৃথিবীর ভাঁড়ারের থেকে/ এ-রকম অনেক হেমন্ত ফুরায়েছে/ সময়ের কুয়াশায়/ মাঠের ফসলগুলো বার বার ঘরে/ তোলা হতে গিয়ে তবু সমুদ্রের পারের বন্দরে/ পরিচ্ছন্নভাবে চলে গেছে।’ কবি আরো লিখেছেন: মাঠের নিস্তেজ রোদে নাচ হয়ে শুরু হবে হেমন্তের নরম উৎসব। অন্যত্র কার্তিক মাসের ফসল তোলার সময়কে অসাধারণ এক ছবি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন কবি যা তাঁর কবিস্বভাবকে শনাক্ত করে: শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের ওপর মাথা পেতে/ অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের খেতে;/ মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার, —চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ,/ তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান, দেহের স্বাদের কথা কয়; —/ বিকালের আলো এসে (হয়ত বা) নষ্ট করে দেবে তার সাধের সময়।’
কবির হেমন্ত অবগাহন সবচেয়ে প্রগাঢ়ভাবে বিস্তৃত হয়েছে ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যে; সেখানে দক্ষিণবঙ্গের বাংলার নদীমথিত মাটি ও প্রকৃতিকে তিনি চিনেছেন গভীর আশ্লেষে। তিনি যে বর্ণনা দিয়েছেন প্রকৃতিকে কবিতার বিষয় ও তার নিজের অন্বিষ্টতা নিয়ে তা উপলব্ধি করা সহজ নয়, কারণ তিনি প্রকৃতিকে সরাসারি কখনো বর্ণনা করেন না বরং প্রকৃতিকে নতুন সত্তা হিসেবে জাগিয়ে তোলেন এবং নিজের সঙ্গে সম্পর্কিত করেন। নিজের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বোধের সাথে, প্রশ্নের সাথে, অস্তিত্বের নানা অংশের সাথে প্রকৃতিকে যুক্ত করে দেন। হেমন্ত সেখানে বড়ো নিয়ামক। বাংলার প্রকৃতির সমস্ত উপাদানকেও তিনি সংশ্লিষ্ট করেন কবিতায়। এই সংযোগ, এই আততিকে তাৎপর্যময় করে তোলেন কবি। বাংলা কবিতায় এর আগে কোনো কবি এরকম করে ভাবতে পারেননি। আমরা বিভিন্ন পর্যায়ে দেখতে পাব কবি কীভাবে বাংলার প্রকৃতিকে গভীরভাবে চিনে ব্যবহার করেছেন পঙ্ক্তিতে। হেমন্ত এখানেও অবধারিতভাবে তাঁর অনুভূতি রাজ্যের প্রধান দ্যোতক। কবি লিখেছেন সনেটের শরীরে:
যদি আমি ঝরে যাই একদিন কার্তিকের নীল কুয়াশায়;
যখন ঝরিছে ধান বাংলার খেতে-খেতে ম্লান চোখ বুজে,
যখন চড়াই পাখি কাঁঠালিচাপার নীড়ে ঠোঁট আছে গুঁজে,
যখন হলুদ পাতা মিশিতেছে উঠানের খয়েরি পাতায়,
শামুক-গুগলিগুলো পড়ে আছে শ্যাওলার মলিন সবুজে—
তখন আমারে যদি পাও না-ক’ লালশাক ছাওয়া মাঠে খুঁজে,
ঠেস দিয়ে বসে আর থাকি না-ক’ যদি বুনো চালতার গায়;
‘রূপসী বাংলা’র অনেক কবিতায় এভাবেই আমরা কবিকে খুঁজে পাই হেমন্তের টুকরো টুকরো ছবিতে যে হেমন্ত আসলে তিনি তৈরি করেছেন। একজন কবির আত্মার নানা প্রতিধ্বনি যেন প্রকাশিত হচ্ছে হেমন্তের সময়কালে প্রকৃতির অপূর্ব সব উপাদানে।
ভূমেন্দ্র গুহ’র সংকলনের একটি নামহীন কবিতায় (১৩৪৮ সালে লেখা) জীবনানন্দ লিখেছেন: নদীর পারে পথে সবুজ বাড়ির এক শূন্য অবলঙ/ জানালার থেকে গ’লে।—একদিন কার্তিকের চাঁদের আলোয়/ স্টিমার-ঘাটের থেকে ফিরে আমি—নিকটের টিমটিমে বার’এ/ কাচের গেলাস দেখে সহসা জলের লোভ অনুমান করে/ ঢুকি-কি-না-ঢুকি ভেবে—নির্জন বায়ুর ঢোক গিলে/ শহরের পথ ছেড়ে দিয়ে অন্যতর পথে/ নেমে গেছি—সেখানে ঝাউয়ের সারি যক্ষের সমুজ্জ্বল কুলুপের মতো/ ছোট চাঁদটাকে বুকে আটকায়ে অনুভব করে যেতেছিল/ দুপুর-রাতের তৃপ্তি। এইসব গভীর বোধজাত কবির ব্যক্তিগত অধীরতার ছোট ছোট প্রণোদনা কবি ব্যক্ত করে চলেন হেমন্ত ঋতুর সাথে অন্য সব প্রাকৃতিক অনুষঙ্গকে যুক্ত করে। একজন জীবনানন্দ দাশের ভেতরের পৃথিবীকে উপলব্ধি করার জন্য এইসব প্রসঙ্গ বা বর্ণনা আমাদেরকে উদ্দীপ্ত করে, খানিকটা বিভ্রান্ত করে; সেই বিভ্রান্তির সূক্ষ্মজালে আমরা আটকে যাই, একটা সংশ্লেষ তৈরি হয়, আর এভাবে কবিতা আমাদের গ্রাস করে, বিশেষত হেমন্ত ঋতুর নানা খুঁটিনাটি দিয়ে জীবনানন্দ দাশ আমাদের অনুভবে নতুন পথে হাঁটতে শেখান। আমরা কবিকে বুঝতে পারি না, বোঝার বোধহয় দরকারও পড়ে না।
বাংলায় যেভাবে হেমন্ত আসে, যেভাবে বিন্যস্ত হয়, সাধারণ মানুষ যেভাবে হেমন্তকে গ্রহণ করে তার প্রগাঢ় রূপ কবি আঁকতে পেরেছেন। কবির সংবেদন, আকাঙ্ক্ষা, যাপিত জীবনের নানা ক্লেদ, বিবমিশা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে কবিতায়। একই সাথে বাংলার নদীবেষ্টিত প্রকৃতি, ফসলের মাঠ, পাখি, রোদ, কুয়াশা, পাতার মর্মর ধ্বনি, হলুদ সব রঙ, বিবর্ণ পাতার রং কিংবা কবির চোখের দীপ্তিতে মুখরিত সকাল বা সন্ধ্যা আমরা প্রকাশিত হতে দেখি জীবনানন্দ দাশের কবিতায়। তিনি যে বিশেষ প্রচ্ছাপ রাখতে চান মানব মনের গহীনকে প্রকাশ করার জন্য তার জন্য হেমন্ত যেন বিশেষভাবে নির্মিত। বাংলার কোনো কবি হেমন্তকে এইভাবে উন্মোচিত করতে পারেননি। কবির এষণা বা মর্মরিত বেদনা বা কৌতূহল বা সংবেদনশীলতার প্রচ্ছাপ আমরা নতুন মাত্রাসহ উপলব্ধি করি কবির পঙ্ক্তিতে।