জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জোবায়েদ হোসেন হত্যা মামলায় দুজন সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা হলেন—জোবায়েদের ভার্সিটির ছোট ভাই সৈকত হোসেন এবং বর্ষার মামা সালাউদ্দিন স্পেশালাইজড হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার ডা. ওয়াহিদুর রহমান।
বুধবার (১৯ নভেম্বর) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বংশাল থানার এসআই আশরাফ হোসেন ওই দুই সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করার আবেদন করেন। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নিজাম উদ্দীন তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। প্রসিকিউশন বিভাগের এএসআই শরিফুল ইসলাম এতথ্য জানান।
জোবায়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই সৈকত জবানবন্দিতে বলেন, ‘আমি জগন্নাথ ইউনিভার্সিটির ২১-২২ সেশনের ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী। জোবায়েদ ভার্সিটির বড় ভাই। আমি জোবায়েদ ভাইয়ের ক্লোজ ছোট ভাই হওয়াতে বর্ষা আমার নাম্বার জোবায়েদ ভাই থেকে নেয়। মাঝে মাঝে হোয়াটসঅ্যাপ হায়, হ্যালো কথাবার্তা হতো। ২-৩ মাস আগে বর্ষা আমাকে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। তখন থেকে বর্ষার সঙ্গে আমার আর যোগাযোগ হয়নি। জোবায়েদ ভাই প্রায় এক বছর ধরে বর্ষাকে বাসায় টিউশন পড়াতো।’
সৈকত আরও জানায়, ‘ভার্সিটি এলাকায় থাকাকালে গত ১৯ অক্টোবর বিকাল ৫টা ৫৮ মিনিটের দিকে বর্ষা তাকে ম্যাসেঞ্জারে ম্যাসেজ দেয়, ভাইয়া কই তুমি। সে জানায়, ক্যাম্পাসে। বর্ষা বলে, স্যারের আম্মুর নাম্বার আছে। সৈকত জানতে চায়, কেন কী হয়েছে? বর্ষা বলে, লাগবে তার। ভাইয়ের কিছু হয়েছে কিনা জানতে চায় সৈকত। তখন বর্ষা জানায়, ভাইরে কে জানি মাইরা ফেলছে। সৈকত জানতে চায়, মাইরে ফেলছে বলতে? বর্ষা জানায়, খুন করে ফেলছে। সৈকত বলে, হায় আল্লাহ কী বলো এসব? তারপর সে বর্ষাকে কল দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। এরপর সৈকত ভার্সিটির বড় ভাইদের বিষয়টি জানায়। পরে তারা ঘটনাস্থলে যায়।
বর্ষার মামা ডা. ওয়াহিদুর রহমান জবানবন্দিতে বলেন, ‘গত ১৯ অক্টোবর সাপ্তাহিক নৈশ্যকালীন ডিউটি থাকায় বাসায় অবস্থান করছিলাম এবং ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখছিলেন। হঠাৎ তার স্ত্রীকে দ্বিতীয় তলার চাচাতো ভাই ফোন করে জানায়, সিঁড়িতে কোনও একজন লোক পড়ে আছে। তারা তখন সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে দেখেন সিঁড়ির মাঝামাঝি একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তাদের চিৎকার চেঁচামেচিতে বাড়ির লোকজন জড়ো হয়ে যায় এবং সেখানে শনাক্ত হয়, তার ভাগ্নি বর্ষার প্রাইভেট টিউটর জোবায়েদ সাহেবের মৃত দেহ। তিনি তাৎক্ষণিক ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে অবহিত করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি জানতে পারেন তার ভাগ্নি বর্ষার সঙ্গে মাহির নামক এক ছেলের প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং জোবায়েদ মাস্টারের সঙ্গে ও বর্ষার প্রেম ছিল। এই দ্বন্দ্বের কারণে মাহির রহমান, জোবায়েদ মাস্টারকে হত্যা করে ঘটনার দিন দৌড়ে পালিয়ে যায়।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, মো. জোবায়েদ হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করতেন। প্রতিদিনের মত গত ১৯ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে বংশাল থানাধীন ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে নুর বক্স লেনের ১৫ নম্বর হোল্ডিং রৌশান ভিলায় বর্ষাকে পড়ানোর জন্য যান। সন্ধ্যা ৫টা ৪৮ মিনিটের দিকে ওই ছাত্রী জোবায়েদ হোসেনের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই সৈকতকে ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে জানায়, জোবায়েদ স্যার খুন হয়ে গেছে, কে বা কারা জোবায়েদ স্যারকে খুন করে ফেলছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. কামরুল হাসান ৭টার দিকে জোবায়েদের ভাই এনায়েত হোসেনকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানান। এনায়েত তার শ্যালক শরীফ মোহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে সাড়ে ৮টার দিকে ঘটনাস্থল রৌশান ভিলায় পৌঁছান। ভবনের নিচতলা থেকে ওপরে ওঠার সময় সিঁড়ি এবং দেয়ালে রক্তের দাগ দেখতে পান। ওই ভবনের তৃতীয় তলার রুমের পূর্ব পাশের সিঁড়িতে জোবায়েদের রক্তাক্ত মরদেহ উপুড় অবস্থায় দেখতে পান।
ঘটনার দুদিন পর ২১ অক্টোবর জোবায়েদের ভাই এনায়েত হোসেন বংশাল থানায় মামলা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, আসামিরা পরস্পর সহযোগিতায় জোবায়েদকে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলার ডান পাশে আঘাত করে হত্যা করেছে।
মামলায় বর্ষা, তার প্রেমিক মো. মাহির রহমান, মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লান ২১ অক্টোবর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। বর্তমানে তারা কারাগারে রয়েছে।