হাজারও সন্দেহ, আছে মৃত্যুভয়, তবু বদলায় না কিছুই

হাজারও সন্দেহ, আছে মৃত্যুভয়, তবু বদলায় না কিছুই

ঢাকার ঠিক মাঝখানে গড়ে ওঠা কড়াইল বস্তি দুটো কারণে বিশেষভাবে পরিচিত। নিম্ন আয়ের মানুষ নিয়ে গবেষণার নমুনা এবং বছর ঘুরে বড় বড় আগুন। যতবার আগুন লাগে, ততবার কড়াইলের ঘনবসতি, অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ, সংকীর্ণ গলি, কাঠ-টিনের ঝুপড়ি— এসব নিয়ে আলাপ হয়, কিন্তু কিছুদিনের মধ্য সেসব আলাপ থেমে যায়, সমাধান হয় না। এমনকি তদন্ত কমিটি বা প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানানো হয় না— ঠিক কী কারণে এই মানুষগুলো বারবার এমন ঝুঁকিতে পড়েন। এখানে বসবাসকারীরা ‘নিশ্চিত মৃত্যু’ জেনেও কেন এলাকা ছাড়েন না।

মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) বিকাল ৫টা ২২ মিনিটে আবারও রাজধানীর বনানীর কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৫শ’ ঘর পুড়ে গেছে। আগুন নেভাতে একে একে যুক্ত হয় ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিট। ফায়ার সার্ভিস দেরিতে পৌঁছা‌নোর বিষ‌য়ে সাংবা‌দিক‌দের প্রশ্নের জবা‌বে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন ও মেন্টেনেন্স) লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী ব‌লেন, “এখানে সরু রাস্তার কার‌ণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসার পরও ঢুকতে পারেনি। এ কারণে দূর থেকে পাইপ টেনে কাজ করতে হয়েছে। প্রথমেই আমাদের খুবই বেগ পেতে হয়েছে আগুনের সোর্সের কাছে পৌঁছাতে।” আগুনের উৎস সম্পর্কে তিনি বলেন, “আগুন নেভানোর কাজ করার সময় দেখা গেছে— যত্রতত্র বিদ্যুতের তার রয়েছে, প্রত্যেক বাসায় গ্যাস সিলিন্ডার রয়েছে। আগুনের সোর্স তদন্ত সাপেক্ষে বলা যাবে।” 

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw692721ac3e53c" ) ); এবারই প্রথম নয়, কড়াইল বস্তিতে গত ১০ বছরে ভয়াবহ অন্তত সাতটি আগুনের তথ্য পাওয়া যায়। ২০১৬ সালের ৪ ডিসেম্বরের রাতে ৫০০ ঝুপড়ি পুড়ে যায়। এর ঠিক এক মাস পরেই আরেকটি বড় আগুনের ঘটনা ঘটে। সেবারও একটা অংশের প্রায় সব ঘর পুড়ে যায়। এর ঠিক আড়াই মাস পর ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ আবারও বড় আগুন লাগে। সেবারও হাজারখানেক  ঘর পুড়ে যাওয়ার কথা জানা যায়। একবছর পর ২০১৮ সালের মার্চে আবারও বড় আগুনে ৫০০ ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেবারও রাতে অনেক ইউনিট মিলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস।  ২০২৪ সালে কড়াইলে দুটো বড় আগুনের ঘটনা ঘটে। সেবছর ২৪ মার্চ বিকালে কড়াইল বস্তির একটি অংশে আগুন লেগে ব্যাপক ক্ষতি হয়। একই বছরের ১৮  ডিসেম্বর অপর একটি আগুনের ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আগুন লাগলেও দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার কারণে বড় কোনও ক্ষতি হয়নি। প্রত্যেকবারই আগুনের কাছে পৌঁছাতে দেরি হওয়া, অবৈধ বিদ্যুত সংযোগ, যত্রতত্র রান্নার ব্যবস্থার ঝুঁকিগুলোর কথা উঠে এসেছে। কিন্তু কোনও সমাধান হয়নি। এখানকার বাসিন্দারা বলছেন, এখানে যেকোনও সময় আগুন লেগে সব পুড়ে যেতে পারে। তারা এটা জেনেই এখানে বসবাস করেন।

দুর্ঘটনা নাকি অন্যকিছু

কড়াইল বস্তি ঢাকার বুকে এক আলাদা জগত। এক সময়ের বাঁশ আর কাঠ দিয়ে বানানো ঘর পরে ইটের দালানে পরিণত হয়েছে। এখানে পানি, গ‍্যাস বিদ‍্যুৎ সংযোগের বৈধতা নিয়ে আছে বিস্তর অভিযোগ। যেকোনও আগুনের ঘটনায় শর্ট সার্কিট, রান্নার চুলা থেকে আগুনের “অনুমান” করা হয় বটে, তবে ক্ষমতার লড়াই থেকে সৃষ্ট শত্রুতা থেকেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে বলে বসবাসকারীদের সন্দেহ।

গবেষণা ও বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, কড়াইল বস্তির জমি মূলত রাষ্ট্রীয় একাধিক সংস্থার মালিকানাধীন হলেও আইনি মালিক যাই থাকুক, স্থানীয়ভাবে জমি-ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ প্রায়ই বাসিন্দা ও কমিউনিটি-নেতাদের মাধ্যমে হয়। শুনতে বস্তি হলেও এখানে এখন কেবল শ্রমজীবী মানুষের বসবাস নয়, বরং এখানে ছোট ব্যবসায়ী আছে, উদ্যোক্তা আছে। আবার কেউ কেবল অভ্যস্ততাবশত ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে বাস করছেন। এখানে কয়েকটি দল আছে এবং সেসব দলের নেতাদের নামে গ্রুপগুলো পরিচিত হয়। তাদের এলাকা ভাগ করা আছে। তারা সবসময় কড়াইল বস্তির বেশিরভাগ নিয়ন্ত্রণ নিতে লড়াইও করতে থাকে। ফলে এখানে আগুন কতভাবে লাগে, তার একটা সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করেন এই বস্তির বাসিন্দারা। বস্তির প্রতিটি ঘরেই রয়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ। এখানে বসবাসরত শামীম নামের এক শ্রমিক জানান, একেকটি ঘরের মাসিকভাড়া ৩ থেকে ১২ হাজার টাকা। সেই ভাড়ার টাকা ভাগাভাগি নিয়েও চলে নানা সংঘর্ষ। একেকটা আগুনের ঘটনার পরে ক্ষমতার হাত বদলও ঘটে। কিছুদিন সরকারের লোকজন ও এনজিওগুলো আসা যাওয়া করে, তারপর আবার সব আগের মতো।

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw692721ac3e5ad" ) ); এতবার আগুনের পরেও কেন কোনও উদ‍্যোগ নেই

ভুক্তভোগী বস্তিবাসীর অভিযোগ, মঙ্গলবার বিকাল ৫টা ২২ মিনিটে আগুন লাগলেও এর প্রায় ৪৫ মিনিট পর ফায়ার সার্ভিস পৌঁছাতে সক্ষম হয়। যানজট এড়িয়ে কিছুটা দেরিতে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট পৌঁছালেও কিছু সময় পর শেষ হতে থাকে গাড়িতে থাকা পানি। পরে বস্তির ঝিলপাড় খালে জেনারেটর বসিয়ে সেখান থেকে পানির পাইপ টেনে নিয়ে যাওয়া হয় আগুনের উৎপত্তি স্থলে। এটা প্রায় প্রতিবারের চিত্র।

কিন্তু এভাবে অবৈধসংযোগ, গায়ে গায়ে লাগানো বাড়ি, সরু রাস্তায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে না পারার মতো বিষয়গুলো প্রতিবারই আলোচনায় আসে। তাহলে এরকম একটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবা হয় না কেন? আগুন বিকালে লাগার কারণে বেশিরভাগ শ্রমজীবী মানুষ ঘরে ছিলেন না। আগুনের সময় বাড্ডায় কাজে ছিলেন এক শ্রমিক নারী। আগুনের খবর শুনে এসে দেখেন, ঘর পুড়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘‘এবার নিয়ে দুইবার এরকম সব হারালাম। এখানে আগুন লাগে কেন বারবার, কোনও সরকারই তদন্ত করে না। আমদের থেকে টাকাতো কেউ কম নেয় না। কষ্টের টাকায় বাঁচার অধিকারও আমাদের নাই।’’

যেকোনও সময় এমন ঘটনা ঘটতে পারে জেনেও কেন এলাকা ছাড়েন না প্রশ্নে বয়োজ্যেষ্ঠ একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, ‘‘এতগুলো বছর এখানে আছি, আমাদের বলা হয়েছে— এটা উচ্ছেদ হলে ভালো, পুনর্বাসন হবে। সেটার একটা লোভ আছে না? কিন্তু এখন শুনছি, আমাদের দেখিয়ে কত মহাজন ফ্ল্যাটবাড়ি করে ফেলেছে। আর আমাদের এখান থেকে সরে যেতে হবে। নদী ভেঙে নিঃস্ব হয়ে এখানে এসে বাসা বাধা একটি পরিবার ১৫ বছর বাস করে কড়াইল বস্তিতে। এই পরিবারের গৃহকর্ত্রী বলেন, ‘‘আমরা আগুনের ভয় জানি। আমাদের এখানে যে লেকের পানি, সেখান থেকে আসা দুর্গন্ধে জান বাইর হয়ে যায়। তারপরেও নিরাপদ বোধ করি। এত বড় ঢাকা শহরে কেউ নাই। কাজ হারালে একজন আরেকজনের মাধ্যমে এখানে কাজ পাওয়া, কোনও বিপদ হলে একটা না একটা সমাধান মিলবে সেটাও জানি। ফলে অন্য কোথাও যাইতে ভয় লাগে।’’ আগুনে এক মিনিটে পুড়ে যাওয়ার থেকে সেই ভয় বেশি কিনা, প্রশ্নে তিনি কোনও কথা বলেন না।

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw692721ac3e5fd" ) ); এখানকার বাসিন্দাদের অবৈধ গ্যাস সংযোগ বা বিদ্যুৎ সংযোগের যে বিষয়টি— এটা বন্ধে আমরা চাইলেই একা সিদ্ধান্ত নিতে পারি না উল্লেখ করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিগত সময়ে আগুন লাগার ঘটনা তদন্ত হয়েছে। সেখানে কখনও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুন লেগেছে। আবার কখনোবা শর্ট সার্কিটে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। বাসিন্দাদের অবৈধ গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংযোগের যে বিষয়টি, বিদ্যুৎ বিভাগ বা তিতাসের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয় আছে। তবে অবৈধভাবে থাকা না থাকার বিষয়টি আমরা আমলে নিয়ে সরকারিভাবে তাদের বাসস্থানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারি।’’

এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে ঢাকা উত্তরের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। বাংলা ট্রিবিউনকে ডিএনসিসির প্রশাসক বলেন, ‘‘কড়াইল বস্তিতে এর আগেও বহুবার আগুন লেগেছে। ওখানে যারা বসবাস করেন, তারা মানবেতর জীবন-যাপন করেন। আমরা এই মুহূর্তে তাদের সহযোগিতার কথা ভাবছি। অন্য সব বিষয়ে পরে আলাপ হবে।’’

হঠাৎ আলোচনায় কড়াইল হাইটেক পার্ক

৯ নভেম্বর বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীরের এক বক্তব্য আবারও সামনে এসেছে মঙ্গলবারের আগুনের ঘটনায়। সেদিন তিনি বলেছিলেন, “আমাদের মহাখালীতে যে কড়াইল বস্তি আছে, সেখানে হাইটেক পার্ক করার কথা ছিল। সেটার প্ল্যান করা আছে। বস্তিবাসীদের কীভাবে পুনর্বাসন করা হবে, সেটারও প্ল্যান করা আছে। পলিটিক্যাল গভর্নমেন্ট এ ইকাজটা করতে পারে না। কারণ বস্তি উচ্ছেদ করতে হবে। বর্তমান যে অরাজনৈতিক সরকার আছে— তাদের জন্য এটা একটা মোক্ষম সুযোগ, এই কাজটা করা দরকার।’’ ২৫ নভেম্বর আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে আবারও সেই আলাপ সামনে আসে— এটা কি তবে উচ্ছেদেরই অংশ? সন্দেহের আলোচনা ডালপালা মেলতে শুরু করলে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন— ‘‘কড়াইল বস্তিতে অবকাঠামো তৈরির কোনও পরিকল্পনা আমাদের নেই। চলমান কোনও প্রকল্পও নাই। হাজার হাজার মানুষ যখন অসহায় ও গৃহহীন, তখন এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকতে সফ্টওয়্যার খাতের বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আহ্বান জানাই।’’

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw692721ac3e62d" ) ); প্রত্যেকবার আগুনের পরপরই শোনা যায়— ওখানে গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ সব অবৈধ এবং যেকোনও সময় আগুন লেগে যেতেই পারে। তারপরও এতগুলো মানুষের জন্য আমরা কী করছি— এ প্রশ্নের জবাবে ব্র্যাকের নগর উন্নয়ন কর্মসূচি ও দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির পরিচালক ড. মোলিয়াকত আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এই মানুষগুলো বছরের পর বছর এখানে থাকে, কারণ তাদের জীবনযাপন। আমাদের বাসার কাজের সহযোগী মানুষগুলো ওখানে থাকে এবং নৌাকা করে লেকটা পার হয়ে কাজে যোগ দেয়। পুনর্বাসনের নামে যদি এদেরকে দিয়াবাড়িতে পাঠান, তাহলে সেটা তার কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে হওয়ায় সে যাবে না। বারবার আগুনের ভয় থাকলেও এসব জায়গায় কষ্টের মধ্যেও বসবাস করবে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘এখানে যেভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ডিশ লাইনের কেবলগুলো রয়েছে, একবার আগুন লাগলে তা ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগবে না। এরা যে ঘরে থাকে, সেখানেই রান্না ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটেরও সব আয়োজন আছে। ফলে তারা এরমধ্যেই আছে।’’

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin