ফ্যাসিবাদমুক্তি এত সহজ নয়!

ফ্যাসিবাদমুক্তি এত সহজ নয়!

জুলাই’২৪ এর গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দুর্লভ বিস্ফোরণ। দীর্ঘ ১৫ বছরের আধিপত্যকেন্দ্রিক শাসন ভেঙে পড়লো, রাস্তায় নেমে মানুষ সরকার বদলে দিলো। অনেকেই  ভেবেছিলো, এবার বুঝি ফ্যাসিবাদের অধ্যায়ও শেষ হলো। আসলে এই বিশ্বাস  নিষ্পাপ সরলতা ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ ফ্যাসিবাদ কখনও কেবল সরকারের পতনে শেষ হয় না।

গণআন্দোলনের সাফল্যের পর যখন দেশ ও রাজনীতি নিয়ে কথা হলেই ফ্যাসিস্ট, ফ্যাসিবাদ শব্দগুলোর ঝড় উঠতো তখন আড্ডার টেবিলে আমাদের এক লেখক বন্ধু প্রশ্ন করেছিলেন, ফ্যাসিস্ট কে? আর কে ফ্যাসিস্ট নয়? প্রশ্নটি যত সহজ, তার উত্তর তত নির্মম। ফ্যাসিবাদ শুধুমাত্র লাঠিচার্জ ও নিপীড়ন নয়, এটি এক মানসিক অবস্থা-অতিশয় কর্তৃত্ববাদ, ব্যক্তিপূজা, জাতিগত অহংকার, ভিন্নমতের প্রতি সন্দেহ, গণতন্ত্রকে দুর্বলতা মনে করা, সহিংসতাকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা।

এই সংজ্ঞা সামনে রাখলে স্পষ্ট হয়, বাংলাদেশের কোনও সরকারই এই তকমা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল না। শাসকের পতন ঘটে দ্রুত; কিন্তু সমাজে জমে থাকা ফ্যাসিবাদী মানসিকতা টিকে থাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। এটাই সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্য।

বাংলাদেশে রাষ্ট্র কোনও দিনই জনচুক্তির প্রতিষ্ঠান হয়নি; বরং ক্ষমতাসীনদের দখলদারিত্বের সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৭৫ এর বাকশালের কর্তৃত্ববাদ, পরবর্তী সামরিক শাসনের দীর্ঘ ছায়া, ১৯৯০ এর পরে প্রতিহিংসার রাজনীতি-সবই একই বৃত্তের ভিন্ন রূপ। গত ১৫ বছরের শাসন সেই পুরনো গল্পেরই সবচেয়ে নির্মম সংস্করণ। ফলে সরকার পতনে ফ্যাসিবাদ ভেঙে গেলো- এটা ভাবলে ভুল হবে। কারণ ফ্যাসিবাদ কখনও শুধুই রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বাসা বাঁধে না; এটি থাকে মানুষের মগজে, আচরণে, ভাষায় এবং সামাজিক শক্তির গভীর স্তরে।

জুলাই গণআন্দোলন রাষ্ট্রযন্ত্রকে নাড়িয়ে দিয়েছিল কিন্তু সমাজকে নাড়াতে পারেনি। এখনও অফিস-আদালত-শিক্ষাঙ্গনে যোগ্যতার বদলে দলীয় পরিচয়ে বিচার হয়; যুক্তির বদলে বিদ্বেষ; ভিন্নমত মানেই অপরাধ। এই নীরব, অদৃশ্য সামাজিক ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদের চেয়ে বেশি স্থায়ী, বেশি কৌশলী, বেশি ক্ষতিকর।

ফ্যাসিবাদের এই বীজ শুধু আওয়ামী লীগের বপন নয়। এর পরিচর্চা বিগত সব সরকারই করে গেছে। গত ১৫ বছরে সেই চারা যে ক্যান্সারে রূপ নিয়েছিল তা স্বীকার করা জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে সত্য হলো, ফ্যাসিবাদী আচরণের গন্ধ আজও বাতাসে ভাসছে, এমনকি সেই দলগুলোতেও যারা নিজেদের “ফ্যাসিবাদবিরোধী” বলে দাবি করছে তাদের শরীরেও।

আগামী সরকার গঠনের লড়াইয়ে যে রাজনৈতিক দলগুলো এখন মাঠে, তাদের কথাবার্তা ও আচরণেও ফ্যাসিবাদের গন্ধ অস্বীকার করা যায় না।

দেশের প্রধান রাজনীতিক দল বিএনপির শীর্ষ নেতারা আন্দোলনের উত্তাপে আওয়ামী লীগকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে মাঠ গরম করতেন। কিন্তু শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডাদেশের পরও সেই ভাষা গায়েব হয়ে গেছে। কেন?  কারণ আওয়ামী ভোটব্যাংক এখন নির্বাচনি বাজারের মূল্যবান সম্পদ। ফলে রাজনৈতিক বাক্য পাল্টেছে, কিন্তু রাজনৈতিক চরিত্র পাল্টেছে কি?

ভারতকে কেন্দ্র করে যারা এতদিন আওয়ামী রাজনীতিকে নিরাপত্তা দিত, আজ সেই একই কূটনৈতিক পথ ধরছে ক্ষমতা প্রত্যাশী প্রতিটি দল।

প্রশ্ন হলো, যদি পথ এক হয়, গন্তব্য ভিন্ন হবে কীভাবে? নতুন সরকার কি পুরনোরই আরেক সংস্করণ হয়ে উঠবে না?

কেবল ক্ষমতার পালা বদলে ফ্যাসিবাদকে দূর করা যায় না। ফ্যাসিবাদ ভাঙ্গে তখনই যখন রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্র স্থাপিত হয়, বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করে, রাষ্ট্রযন্ত্র দলীয় নিয়ন্ত্রণ ছাড়ে, সমাজ ভিন্নমতকে সম্মান করতে শেখে এবং নৈতিকতা ক্ষমতার হাতিয়ার না হয়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতি হয়।

বাংলাদেশ আজ দাঁড়িয়ে আছে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। একদিকে নতুন গণতান্ত্রিক পথ গড়ার সুযোগ; অন্যদিকে আবারও পুরনো ফ্যাসিস্ট চক্রে আটকে যাওয়ার বিপদ। ফ্যাসিবাদকে নির্মূল করতে কেবল সরকার পতনই যথেষ্ট নয়। ফ্যাসিবাদ নির্মূল করতে হলে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সহনশীলতা, নাগরিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক আচরণের দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর করতে হবে। এ পরিবর্তন কঠিন ও ধীর। রাজনীতিক, আমলা থেকে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব নয়।

আগেও লিখেছি আবার লিখছি, এই দেশে প্রতিটি শাসনের গায়ে কমবেশি ফ্যাসিবাদের দাগ ছিল কিন্তু গত ১৫ বছরে তা ক্যান্সারে রূপ নিয়েছিল। এ ক্যান্সার থেকে মুক্তির লড়াই হবে বাইরের শত্রুর সঙ্গে নয়-আমাদের নিজেদের ভেতরের ফ্যাসিবাদের সঙ্গে। এ যুদ্ধ কঠিন, দীর্ঘ, এবং অনিবার্য। অতএব বলতেই হবে, ক্ষমতার রাজনীতির জন্য, ভোটের রাজনীতির জন্য রাজনীতিকদের বক্তৃতায় ফ্যাসিবাদমুক্তি তেমন কোনও বিষয় না হলেও প্রকৃতপক্ষে ফ্যাসিবাদমুক্তি এত সহজ নয়।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin