‘ফ্লেশ’ কেন বুকার পেল?

‘ফ্লেশ’ কেন বুকার পেল?

বিচারকমণ্ডলীর সভাপতি রডি ডয়েল বলেন— “বিচারকরা শর্টলিস্ট করা ছয়টি বই নিয়ে ঘন্টা পাঁচেকেরও অধিক সময় ধরে আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু এরমধ্যে যে বইটির কথা বারবার সামনে আসে, সেটা হলো ‘ফ্লেশ’। ‘ফ্লেশ’-এর অনন্যতাই এর কারণ। আমরা আগে কখনো এরকম কিছু পড়ে উঠিনি। এতে নানান অন্ধকার বিষয় উঠে আসলেও, উপন্যাসটি বেশ সুখপাঠ্য।এই উপন্যাস শেষ করার পরেও আমরা জানি না প্রধান চরিত্র ইস্তভান কী রকম দেখতে। কিন্তু একে লেখার খামতি বলে মনে হয় না। বরং উল্টোটা মনে হয়। এটাই এ উপন্যাসের শক্তি। কিছুটা যেন শব্দের অনুপস্থিতি বা ইস্তভানের নিজের কোনো শব্দ না থাকার কারণেই আমরা চরিত্রটিকে আরো গভীরভাবে অনুভব করতে পারি। উপন্যাসের শুরুতে দেখি ইস্তভান কাঁদে, কারণ তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিটি তাকে কাঁদতে মানা করেছে। আবার সে যে টাক মাথার মানুষ সেটাও আমরা বুঝতে পারি অন্য একজন পুরুষের চুল নিয়ে তাকে হিংসে করতে দেখে। আবার আমরা এও বুঝতে পারি, কয়েকটি খালি পৃষ্ঠা দেখে, ইস্তভান শোকে বিহ্বল।আমার পড়া এমন কোনো বই নেই যা তার পৃষ্ঠার খালি জায়গাকে এতো ভালো ভাবে কাজে লাগিয়েছে। যেন লেখক ডেভিড সালাই চান পাঠক লেখার খালি অংশ তার সঙ্গে পূরণ করুক। চরিত্র সৃষ্টিতে সালাইয়ের পাশাপাশি পাঠকরাও অংশ নিক।উপন্যাসটি সুসংহত। এতেই সালাইয়ের লেখার শক্তি প্রকাশ পায়। এখানে লেখার প্রতিটি শব্দ গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি শব্দগুলোর মাঝের ফাঁকা স্থানও নানান অর্থময়তার দিকে আমাদের নিয়ে যায়।উপন্যাসটি জীবনের কথা বলে। জীবনের অদ্ভুতুড়ে ব্যাখ্যাহীন বিষয়-আশয়ের কথা বলে। আর যখন আমরা উপন্যাসটি পড়ি, যখন আমরা পাতাগুলো উল্টাই, তখন অনুভব করি আমরা বেঁচে আছি এবং উপন্যাসটি পড়ছি— আশ্লেষে নিচ্ছি এই অসাধারণ উপন্যাসটির স্বাদ।" jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw69134d0e36dca" ) ); ‘ফ্লেশ’-এর বিষয়বস্তুসংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রবল গতিময় উপন্যাস ‘ফ্লেশ’ আমাদের দেখায় এক মানুষের জীবন, কৈশোর থেকে বার্ধক্য অব্দি যিনি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েন এমন সব ঘটনার ভেতর দিয়ে, যেগুলোর ওপর তার নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।পনেরো বছর বয়সী ইস্তভান তার মায়ের সঙ্গে থাকে হাঙ্গেরির এক শান্ত অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে। নতুন শহর, নতুন স্কুল, সবকিছুই তার অচেনা। লাজুক স্বভাবের কারণে সে সহজে কারো সঙ্গে মিশে উঠতে পারে না, ফলে একা হয়ে পড়ে। তার একমাত্র সঙ্গী হয়ে উঠে পাশের ফ্ল্যাটের এক বিবাহিত নারী, যার বয়স তার মায়ের বয়সের কাছাকাছি। তাদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে এক গোপন সম্পর্কে পরিণত হয়, যার অর্থ বা পরিণতি ইস্তভান নিজেও বুঝতে পারে না। তারপর থেকেই তার জীবন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।সময় এগিয়ে চলে। ইস্তভান ভেসে উঠে একবিংশ শতাব্দীর অর্থ আর ক্ষমতার স্রোতে। সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে লন্ডনের অতিধনীদের জগতে পৌঁছে যায় সে। ভালোবাসা, ঘনিষ্ঠতা, মর্যাদা আর সম্পদের টান তাকে পৌঁছে দেয় অকল্পনীয় প্রাচুর্যে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আকাঙ্ক্ষাগুলোই তার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।'ফ্লেশ' এমন এক উপন্যাস যা গভীরভাবে প্রশ্ন করে—জীবন আসলে কীসের দ্বারা চালিত হয়, কোন জিনিস তাকে অর্থপূর্ণ করে তোলে, আর কী তাকে ভেঙে ফেলে। jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw69134d0e36dfe" ) ); কে এই ডেভিড সালাই?ডেভিড সালাই বুকার বিজয়ী প্রথম হাঙ্গেরিয়ান-ব্রিটিশ লেখক। কানাডায় জন্ম নেয়া সালাই বসবাস করেছেন লেবানন, হাঙ্গেরি, যুক্তরাজ্যে এবং বর্তমানে ভিয়েনায়। তিনি গল্প উপন্যাস মিলিয়ে ৬টি গ্রন্থ লিখেছেন, যেগুলো ২০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এছাড়াও বেশ কয়েকটি বিবিসি রেডিও নাটক লিখেছেন ।

সালাইয়ের প্রথম উপন্যাস ‘লন্ডন অ্যান্ড দ্য সাউথ ইস্ট’ ২০১৮ সালে বেটি ট্রাস্ক এবং জিওফ্রে ফ্যাবার মেমোরিয়াল পুরস্কার পেয়েছিল। ‘অল দ্যাট ম্যান ইজ’ ২০১৬ সালে বুকার প্রাইজের জন্য শর্টলিস্ট হয়েছিল এবং গর্ডন বার্ন প্রাইজ আর প্লিমটন প্রাইজ ফর ফিকশন জিতেছিল। ২০১৯ সালে সালাই তার ছোটোগল্পের বই টার্বুলেন্সের জন্য এজ হিল প্রাইজও জেতেন।তাছাড়া ২০১০ সালে ‘সেরা ২০ ব্রিটিশ লেখক: অনূর্ধ্ব ৪০’ এর তালিকায় স্থান পেয়েছেন, নির্বাচিত হয়েছেন ‘গ্রান্টার সেরা তরুণ ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ২০১৩'।তবে সালাই বুকার বিজয়ী একমাত্র হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত লেখক নন। ২০১৫ সালে এ পুরষ্কারটি পেয়েছিলেন এ বছর সাহিত্যে নোবেল জয়ী লাসলো ক্রাসনাহোরকাই।পাণ্ডুলিপি থেকে

যখন তার বয়স পনেরো, সে ও তার মা নতুন এক শহরে চলে আসে, সে ভর্তি হয় নতুন স্কুলে। বয়সটাই এমন যে এ সময়ে নতুন জায়গায় খাপ খাওয়ানো সহজ নয়—স্কুলের সামাজিক কাঠামো তখন শক্তভাবেই গড়ে উঠেছে, আর নতুন বন্ধু তৈরি করতে তার সবসময়ই কিছুটা অসুবিধা হয়। কিছুদিন পর অবশেষে সে এক বন্ধুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়, যে কিনা নিজেও একাকী স্বভাবের। তারা মাঝে মাঝে স্কুলের পরে একসঙ্গে সময় কাটায়, শহরে সদ্য খোলা পাশ্চাত্য ধাঁচের শপিং মলে। “তুমি কখনো করেছ?” ওর বন্ধু জিজ্ঞেস করলো।“না”, ইস্তভান বললো।“আমিও না”, ওর বন্ধু বললো, তার বলার ধরণ কীভাবে যেন স্বীকারোক্তির ব্যাপারটাকে অনেক সহজ হিসেবে ফুটিয়ে তুললো। সেক্স নিয়ে কথা বলার একটা স্বাভাবিক আর স্বতঃস্ফূর্ত ভঙ্গি আছে তার। সে ইস্তভানকে বলে, স্কুলের কোন কোন মেয়েকে সে মনে মনে ভাবতে ভালোবাসে, আর তাদের পেলে ঠিক কী কী করবে তাদের সাথে তা নিয়ে কল্পনা করে। ও জানায়, সে নাকি দিনে চার-পাঁচবারও হস্তমৈথুন করে, যা শুনে ইস্তভানের মনে হীনমন্যতা জাগে, কারণ সে সাধারণত এক বা দুইবারের বেশি করে না। ইস্তভান যখন সেটা স্বীকার করে, তখন বন্ধুটি হেসে বলে, “তোমার সেক্স ড্রাইভ নিশ্চয়ই একটু কম, দুর্বল ধরনের।” এটা হতেও পারে, অন্তত তার জানামতে তো হতেই পারে।অন্যদের ক্ষেত্রে কেমন হয়, তা তো সে জানে না।সে শুধু নিজের অভিজ্ঞতাটুকুকেই চেনে। jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw69134d0e36e29" ) ); বিচারকদের মন্তব্য“এটি এমন একজন পুরুষের গল্প, যার নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। যে বিচ্ছিন্ন তার আকাঙ্ক্ষা থেকেও। যদিও সে তার শ্রেণিগত অবস্থার উন্নতি করে এবং হাঙ্গেরি থেকে লন্ডনে যায়, তবু তাকে অনুসরণ করে তার দুঃসহ অতীত।"

“সালাইর এক অসাধারণ দক্ষতা রয়েছে কেবল ভালো ভালো অংশগুলো বলার। ‘ফ্লেশ’-এ উঠে এসেছে এক পুরুষের শৈশব থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠার এক গভীরতাগামী যাত্রা। তবুও প্রধান চরিত্রের জীবনের কিছু ফাঁকফোকর রয়ে যায় এতে, যেগুলো সালাই অমীমাংসিত রাখেন যেন পাঠকেরা উদারভাবে সেগুলো পূরণ করার সুযোগ পায়।”

“'ফ্লেশ' বেঁচে থাকার শিল্পকে চিত্রিত করে। আর এই বেঁচে থাকার সাথে জড়িয়ে থাকা দুঃখকেও গভীরভাবে তুলে আনে বর্ণনায়। উপন্যাসের নায়ক ইস্তভানের আবেগগত বিচ্ছিন্নতা গল্পের স্বতঃস্ফূর্ত গতির সমান্তরালে এগিয়ে চলে। এই উপন্যাসের ধরণটি ইঙ্গিতময়তার মধ্য দিয়ে দেখায়— আমাদের নেওয়া সিদ্ধান্ত থেকে নিজ নিজ শরীরের বিচ্ছিন্নতার গভীর এক থিমকে।”

Comments

0 total

Be the first to comment.

হুমায়ূনের তিন নারী চরিত্র BanglaTribune | প্রবন্ধ/নিবন্ধ

হুমায়ূনের তিন নারী চরিত্র

হুমায়ূন আহমেদের ছোটোগল্প ‘রূপা’, ‘শঙ্খমালা’ এবং ‘নন্দিনী’—প্রতিটি নামের অন্তঃস্থিত একগুচ্ছ বাস্তবতার...

Nov 13, 2025

More from this User

View all posts by admin