বাংলাদেশের কর ব্যবস্থা এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬.৫৬ শতাংশ থেকে ৬.৬ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন। আগের বছরের তুলনায় এই হার আরও কমেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পতন দেশের উন্নয়ন ব্যয়, অবকাঠামো নির্মাণ এবং সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে। তবে সমস্যা শুধু কর কম আদায় হওয়া নয়—মূল সমস্যা হলো করদাতাকে শনাক্ত করার পরও তাদের প্রকৃত কর পরিশোধ নিশ্চিত করতে না পারা। অর্থাৎ পরিচয় আছে, কিন্তু কর প্রদানে কার্যকর অংশগ্রহণ নেই।
২২ এপ্রিল ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশে টিআইএনধারীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২০ লাখ ৮৯ হাজার ৭৫ জন। কিন্তু তাদের মধ্যে প্রায় ৫৯ শতাংশ ব্যক্তি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর রিটার্ন জমা দেননি। অর্থাৎ, অধিকাংশ নিবন্ধিত টিআইএনধারী অনলাইনে সংযুক্ত থাকলেও কর ব্যবস্থায় বাস্তবে অংশ নিচ্ছেন না। এটি আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায়—ভূমি নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, যানবাহন নিবন্ধন, ইউটিলিটি সংযোগ, পাবলিক ক্রয়সহ কমপক্ষে ৩৮ ধরনের সরকারি সেবা নিতে টিআইএন এবং রিটার্ন জমার প্রমাণ দেখাতে হয়। তারপরও যেহেতু কোনও সমন্বিত ও স্বয়ংক্রিয় আপডেট ব্যবস্থা নেই, তাই অনেক ক্ষেত্রে টিআইএন কেবল কাগজে-কলমে থাকা একটি আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে; বাস্তবে এটি কার্যকর আর্থিক পরিচয় হিসেবে কাজ করছে না।
বাংলাদেশ এমন একটি কর ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যেখানে নাগরিকদের বারবার তথ্য দিতে হয়, কিন্তু সিস্টেম নিজে থেকে তথ্য হালনাগাদ করে না। রাষ্ট্র নাগরিকদের কাছ থেকে টিআইএন নেয়, কিন্তু তাদের আর্থিক কার্যক্রম ঠিকভাবে যাচাই করতে পারে না। এটি নাগরিকদের দোষ নয়—দোষ মূলত সিস্টেমের কাঠামোর। এই সমস্যার সমাধান হতে পারে টিআইএনকে নতুনভাবে ভাবা—একটি ইউনিফাইড এনবিআর কার্ড সিস্টেমের মাধ্যমে। এটি হবে ভার্চুয়াল, রিয়েল-টাইমে আপডেট হওয়া একটি আর্থিক পরিচয়, যা নিরাপদ এনবিআর ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকবে।
বর্তমানে, কেউ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুললে ব্যাংক টিআইএন নেয়, কিন্তু সেটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয় না। প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো প্রতি মাসে টিআইএনধারীর দুটি তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপডেট করবে: তার নামে মোট কতটি অ্যাকাউন্ট আছে এবং সব অ্যাকাউন্টের মোট ব্যালেন্স। ব্যাংকের কোনও সুযোগ থাকবে না অন্য তথ্য বদলানোর বা যোগ করার। তাদের কাজ হবে সীমিত, পরিষ্কার ও যাচাইযোগ্য। করদাতারা তাদের ডিজিটাল এনবিআর পোর্টালে এসব আপডেট দেখতে পারবেন। এতে “গোপন অ্যাকাউন্ট” সংস্কৃতি কমে যাবে, অঘোষিত আয় ধরা পড়বে এবং আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়বে।
বাংলাদেশে কর ফাঁকি বাড়ে মূলত আয়ের তথ্য ছড়ানো-ছিটানো থাকার কারণে। কেউ এক জায়গা থেকে বেতন পান, অন্য জায়গা থেকে সম্মানী, আরেক জায়গা থেকে গবেষণা তহবিল বা পরামর্শ ফি—কিন্তু এসব আয়ের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক জায়গায় জমা হয় না। এবার কর্মক্ষেত্রের উদাহরণ ধরুন। একজন শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যাংকার, প্রকৌশলী বা ব্যবসায়িক নির্বাহী যখন মাসিক বেতন পাবেন, তখন তাদের প্রতিষ্ঠান সেই বেতন ও সুবিধার তথ্য নিশ্চিত করে এনবিআর ডাটাবেজে আপডেট করবে। একই ব্যক্তি যদি অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানে গেস্ট লেকচার দেন, সে প্রতিষ্ঠানও একই টিআইএন ব্যবহার করে এ তথ্য সিস্টেমে যুক্ত করবে। আবার যদি তারা কোনও গবেষণা অনুদান, পরামর্শ ফি বা সম্মানী পান, প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানও এই তথ্য আপডেট করবে। অর্থাৎ, একজন মানুষের সকল আনুষ্ঠানিক আয়ের উৎস এক জায়গায় জমা হবে—একটি স্বচ্ছ সিস্টেমে, যা করদাতা নিজেই দেখতে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।
ধরুন একজন সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তা তার মূল চাকরি থেকে মাসে ২,০০,০০০ টাকা বেতন পান। যদি তিনি কোনও প্রশিক্ষণ একাডেমিতে ক্লাস নেন বা কোনও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একটি সেশনে অংশ নেন এবং সেখানে ১,২০,০০০ বা ৬০,০০০ টাকা পান, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো একই টিআইএন ব্যবহার করে এই আয়ের তথ্য সিস্টেমে যোগ করবে। বছরের শেষে করদাতা এবং এনবিআর দু’জনই তার সব বৈধ আয়ের তালিকা এক জায়গায় দেখতে পাবে—কোনও বিভ্রান্তি থাকবে না, আয় লুকানোর সুযোগ থাকবে না, এবং কোনও কাগজপত্র খুঁজে বেড়ানোর দরকার হবে না।
এই ব্যবস্থার জন্য নতুন আইন লাগবে না, লাগবে একটি শক্ত প্রযুক্তিগত ভিত্তি। এনবিআর কার্ড হবে ব্যাংকের ডিজিটাল কার্ডের মতো একটি ভার্চুয়াল পরিচয়—যা নাগরিকরা নিরাপদ একটি ডিজিটাল পোর্টাল থেকে ব্যবহার করবে। বেতন, সম্মানী, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বড় কেনাকাটাসহ রিপোর্টযোগ্য যেকোনও লেনদেনে এনবিআর কার্ড লাগবে। প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু তাদের অংশের তথ্য আপডেট করবে, আর নাগরিকরা সব তথ্য এক জায়গায় দেখতে পাবে। এতে এনবিআর নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারবে—কার আয় করযোগ্য, কে রিটার্ন জমা দিয়েছে, আর কোথাও কোনও গরমিল আছে কিনা। এই ব্যবস্থা নাগরিকদের ভুল করে অনিয়ম করা থেকে রক্ষা করবে এবং সরকারকে টেকসই রাজস্ব নিশ্চিত করবে। ফলে কর-সম্মতি স্বাভাবিকভাবে হয়ে যাবে, চাপের বিষয় হবে না।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ডিজিটালাইজড করেছে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ভূমি রেকর্ড, মোবাইল ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা। এই সব সিস্টেমের তুলনায় এনবিআর কার্ডের জন্য ডাটাবেজ তৈরি করা ব্যয়বহুল বা জটিল নয়। মূল সমস্যা হলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সংযুক্ত করার জন্য সমন্বয় এবং সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব। একটি স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য সিস্টেম নাগরিকদের হয়রানি কমাবে, অযথা কাগজপত্র খুঁজে সময় নষ্ট হওয়া বন্ধ করবে এবং এনবিআরের জন্য সুবিধা হবে—স্বয়ংক্রিয় যাচাই, কর ফাঁকি কমানো এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় আস্থা বৃদ্ধি।
যখন আয়ের তথ্য, ব্যাংকিং তথ্য এবং অন্যান্য আর্থিক কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক জায়গায় মিলিত হবে, তখন করদাতাদের কেবল তাদের পূর্ব-পূরণ করা রিটার্ন পর্যালোচনা ও অনুমোদন করতে হবে। ফাইলিং করার সময় কয়েক মিনিট লাগবে, সপ্তাহ নয়। এর ফলে কর কর্তৃপক্ষ কাগজপত্র খোঁজার বদলে প্রবণতা বিশ্লেষণ করতে পারবে। এটি কেবল প্রযুক্তিগত সংস্কার নয়, বরং শাসন ব্যবস্থার সংস্কার, যা নাগরিকদের রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের ধরন পরিবর্তন করবে।
বাংলাদেশের বড় উন্নয়নের লক্ষ্য রয়েছে, কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব এমনভাবে বাড়ানো দরকার যা ন্যায়সঙ্গত, কার্যকরী এবং নাগরিকদের জন্য সহজ। একটি ইউনিফাইড এনবিআর কার্ড সিস্টেম ঠিক এ ধরনের সমাধান দিতে পারে। ব্যাংক, নিয়োগকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য আপডেট করলে করদাতাদের জন্য কর পরিশোধ সহজ ও স্বচ্ছ হয়ে যাবে। প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু তাদের দায়িত্বের তথ্য আপডেট করবে, আর নাগরিকরা সব কিছু এক নিরাপদ জায়গায় দেখতে পারবে। এনবিআরও নাগরিকদের উপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে তাদের কর বিষয়ক তথ্য ট্র্যাক করতে পারবে। যখন কর প্রশাসন স্মার্ট হবে, তখন নাগরিকরাও স্বাভাবিকভাবে কর ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করবে। বাংলাদেশ টিআইএনকে কেবল একটি ভুলে যাওয়া নম্বর থেকে রূপান্তরিত করতে পারবে একটি জীবন্ত, স্বয়ং হালনাগাদ আর্থিক স্বচ্ছতার ব্যবস্থায়। এটি শুধু রাজস্ব বাড়াবে না, কালো টাকা কমাতেও সাহায্য করবে। এটাই বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ—এবং এটি তৈরি করার জন্য সব সরঞ্জাম আমাদের হাতে আছে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট; সহযোগী সম্পাদক, বিআইজিএম জার্নাল অব পলিসি অ্যানালাইসিস
[email protected]