ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে ১৯৮৩ সালে সংঘটিত নৃশংস নেলি গণহত্যার তদন্ত প্রতিবেদন অবশেষে প্রকাশ্যে আনছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা শনিবার (২৬ অক্টোবর) ঘোষণা করেছেন, আসন্ন ২৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আসাম বিধানসভার শীতকালীন অধিবেশনে পেশ করা হবে তিওয়ারি কমিশনের রিপোর্ট, যা গত প্রায় চার দশক ধরে অপ্রকাশিত ছিল।
১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি আসামের মধ্যাঞ্চলের নেল্লি ও আশপাশের গ্রামগুলোতে ঘটে যায় ভারতের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা। সরকারি হিসেবে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৮১৯ জন। এদের মধ্যে ১ হাজার ৩২৭ জন নারী এবং ২৫৩ জন শিশু। তবে মানবাধিকার সংস্থা ও গবেষকদের মতে, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা সরকারি হিসেবের চেয়ে অনেক বেশি।
তৎকালীন পরিস্থিতিতে উন্মত্ত জনতা দা, বর্শা ও লাঠি হাতে নিয়ে স্থানীয় আদিবাসী ও বাঙালি মুসলমানদের বসতিতে হামলা চালায়। তারা ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়, পালানোর চেষ্টা করা মানুষদের পথরোধ করে নির্মমভাবে হত্যা করে। অধিকাংশ নিহতই ছিলেন নারী ও শিশু। পুলিশের ভূমিকা ছিল কার্যত নিষ্ক্রিয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে কেবল সিআরপিএফ পৌঁছানোর পর।
এই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের তদন্তে রাজ্য সরকার গঠন করেছিল তিওয়ারি কমিশন, যা ১৯৮৫ সালে রিপোর্ট জমা দেয়। কিন্তু গত ৪০ বছরেও রিপোর্টটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। অবশেষে হিমন্ত বিশ্বশর্মার সরকার সেটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এক সাংবাদ সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ১৯৮৩ সালে নেল্লিতে একটি ভয়াবহ গণহত্যা ঘটেছিল। সেই সময় রাজ্য সরকার একটি কমিশন গঠন করেছিল, নাম ছিল তিওয়ারি কমিশন। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই কমিশনের রিপোর্ট কখনও রাজ্য বিধানসভায় উপস্থাপন করা হয়নি। আসন্ন ২৫ নভেম্বরের অধিবেশনে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে তিওয়ারি কমিশনের রিপোর্ট পেশ করব।
তিনি আরও বলেন, এটি আসামের ইতিহাসের একটি অংশ, যা বিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানীরা নানা দিক থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। রিপোর্ট প্রকাশ হলে মানুষ অন্তত জানতে পারবেন, সেই সময়ে আসলে কী ঘটেছিল।
১৯৮০-এর দশকের শুরুতে আসামে চলছিল ‘বিদেশি-বিরোধী আন্দোলন’- মূলত বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসীদের শনাক্ত ও বহিষ্কারের দাবিতে। আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন। তাদের দাবি ছিল, বিদেশি নাগরিকদের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলা হোক, যাতে আসামের জনসংখ্যাগত ভারসাম্য নষ্ট না হয়।
এই আন্দোলনের জেরে ১৯৮২ সালে আসাম বিধানসভা ভেঙে দেওয়া হয় এবং ১৯৮৩ সালের জানুয়ারিতে ঘোষণা করা হয় চার দফায় অনুষ্ঠিতব্য বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচন। আসাম আন্দোলনের সমর্থকরা নির্বাচন বয়কটের আহ্বান জানালেও সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার মধ্যেই ভোট অনুষ্ঠিত হয়। তাতে জয়ী হয় কংগ্রেস, এবং হিতেশ্বর সইকিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে। তবে নির্বাচনের আগেই এবং চলাকালীন সময়ে নেলি এলাকায় দফায় দফায় হামলা ও হত্যাযজ্ঞ ঘটে। আক্রমণকারীরা বাঙালি মুসলমানদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, নারী ও শিশুদের ওপর চলে অকথ্য নির্যাতন।
১৯৮৫ সালে আসাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে নেলি গণহত্যা নিয়ে বারবার রাজনৈতিক বিতর্ক উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞের তদন্ত প্রতিবেদন গোপন রাখার অভিযোগ। এবার হিমন্ত সরকারের সিদ্ধান্তে চার দশক পর সেই গোপন নথি আসছে জনসমক্ষে।
ইতিহাসবিদদের মতে, তিওয়ারি কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হলে ‘আসামের রাজনৈতিক ইতিহাস ও জাতিগত সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত’ হয়ে উঠবে।