মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব কিয়েভের জন্য ‘চূড়ান্ত প্রস্তাব’ নয়। ইউক্রেনের মিত্ররা প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ জানানোর পর এ কথা বলেন তিনি। রবিবার (২২ নভেম্বর) ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউক্রেনের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বৈঠকে বসবেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।
‘পরিকল্পনাটি কি ইউক্রেনের জন্য তার চূড়ান্ত প্রস্তাব?’হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘না, এটা আমার চূড়ান্ত প্রস্তাব নয়। যেভাবেই হোক আমাদের যুদ্ধটি শেষ করতে হবে, তাই আমরা এ নিয়ে কাজ করছি।’
শনিবার ইউরোপ, কানাডা এবং জাপানের নেতারা বলেন, মার্কিন পরিকল্পনাটিতে ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তির জন্য অপরিহার্য উপাদান আছে, তবে সীমান্ত পরিবর্তন এবং ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সক্ষমতা সীমিত করার মতো বিষয়গুলোর কারণে এটি ‘অতিরিক্ত কাজ’ দাবি করে।
এর আগে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ইউক্রেন এমন এক প্রস্তাব গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে, যা মস্কোর পক্ষে অনুকূল মনে হচ্ছে। এ অবস্থায় দেশটি ‘আমাদের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন মুহূর্ত’ অতিক্রম করছে।
ট্রাম্প ইউক্রেনকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়েছেন ২৮ দফার পরিকল্পনাটি গ্রহণ করার জন্য। অন্যদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, এটি সমঝোতার একটি ভিত্তি হতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ রবিবার জেনেভার আলোচনায় অংশ নেবেন। যুক্তরাজ্যের পক্ষে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েল বৈঠকে যোগ দেবেন।
শনিবার দক্ষিণ আফ্রিকায় জি-২০ সম্মেলনে দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে কানাডা, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, জাপান, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও নরওয়ের নেতারা সই করেন। সইকারীদের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ দুই কর্মকর্তা ছিলেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, আমাদের বিশ্বাস খসড়া প্রস্তাবটি একটি ভিত্তি, যেটির জন্য আরও কাজ প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ শান্তি টেকসই করতে আমরা আলোচনায় যুক্ত হতে প্রস্তুত। আমরা স্পষ্ট করি যে, সীমান্ত বলপ্রয়োগে পরিবর্তন করা যাবে না।
তারা আরও বলেন, আমরা ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর ওপর প্রস্তাবিত সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বিগ্ন, যা ইউক্রেনকে ভবিষ্যৎ হামলার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
বিবৃতিতে এছাড়া বলা হয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটো সম্পর্কিত উপাদানগুলো বাস্তবায়নে যথাক্রমে ইইউ ও ন্যাটো সদস্যদের সম্মতি লাগবে।
ফাঁস হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি পরিকল্পনায় প্রস্তাব রয়েছে যে, পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্ক অঞ্চলের যে অংশ বর্তমানে ইউক্রেনীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আছে, সেখান থেকে সরে দাঁড়াবে এবং দোনেৎস্ক, লুহানস্ক ও ২০১৪ সালে রাশিয়ার দখলে যাওয়া ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার কার্যত নিয়ন্ত্রণ স্বীকৃতি পাবে।
পরিকল্পনায় ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের সীমান্ত বর্তমান যুদ্ধ রেখায় স্থিত রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এই দুই অঞ্চল আংশিকভাবে রাশিয়ার দখলে।
মার্কিন খসড়া অনুযায়ী, ইউক্রেনের সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ ৬ লাখ সদস্যে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং ইউরোপীয় যুদ্ধবিমানগুলো প্রতিবেশী পোল্যান্ডে অবস্থান করবে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কিয়েভ নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পাবে— যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, আশা করা হচ্ছে রাশিয়া প্রতিবেশী দেশে আক্রমণ করবে না এবং ন্যাটো আর সম্প্রসারিত হবে না।
পরিকল্পনাটিতে প্রস্তাব রয়েছে, রাশিয়াকে আবার বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পুনঃ একীভূত করা— এরমধ্যে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর জি-৭ গ্রুপে রাশিয়াকে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা— যাতে আবার জি-৮ হয়।
শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, জেলেনস্কিকে এ পরিকল্পনা ভালো লাগতে হবে, নইলে ইউক্রেন ও রাশিয়া লড়াই চালিয়েই যাবে।
এর আগে জেলেনস্কি জাতিকে উদ্দেশ করে বলেন, দেশটি ‘অত্যন্ত কঠিন একটি সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে পারে : হয় মর্যাদা হারানো, নয়তো একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হারানোর ঝুঁকি নেওয়া।’
উল্লেখ্য, কিয়েভ যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত অস্ত্র, বিশেষ করে প্রাণঘাতী রুশ বিমান হামলা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ওয়াশিংটনের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্যের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল।
শুক্রবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিশ্চিত করেছেন যে মস্কো মার্কিন পরিকল্পনাটি পেয়েছে। তবে তিনি বলেন, এটি নিয়ে এখনও বিস্তারিত আলোচনা হয়নি।
তিনি বলেন, মস্কো নমনীয়তা দেখাতে প্রস্তুত— কিন্তু যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে।
পুতিন ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন চালানো শুরু করেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে, রুশ বাহিনী দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়েছে— যদিও ভয়াবহ যুদ্ধ ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।