মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে আসন্ন বৈঠকের আগে নতুনভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়ালো চীন। দেশটি বৃহস্পতিবার ঘোষণা দিয়েছে, তারা বিরল খনিজ (রেয়ার আর্থস) রফতানির ওপর নতুন ও ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। এর আওতায় এখন শুধু খনিজই নয়, এসব খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত প্রযুক্তি এবং বিদেশে সেগুলোর ব্যবহারও সীমিত করা হবে, বিশেষ করে সামরিক ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে।
বিশ্বের বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে চীনের। মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি, এমনকি যুদ্ধবিমান তৈরিতেও এসব উপকরণ অপরিহার্য। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যকৌশলে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে বেইজিং এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
এ মাসের শেষদিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় এপেক সম্মেলনের ফাঁকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন পদক্ষেপকে সেই বৈঠকের আগের একটি কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন তালিকায় পাঁচটি অতিরিক্ত বিরল খনিজ হোলমিয়াম, এরবিয়াম, থুলিয়াম, ইউরোপিয়াম ও ইটারবিয়াম এবং সংশ্লিষ্ট ম্যাগনেটিক উপাদান যুক্ত হয়েছে। ফলে ১৭ ধরনের বিরল খনিজের মধ্যে এখন ১২টির রফতানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হলো।
খনিজ উত্তোলন, গলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং চুম্বক তৈরির প্রযুক্তি রফতানিতেও লাগবে সরকারের অনুমতি। এমনকি বিদেশি কোম্পানিগুলো যদি চীনা প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব উপকরণ উৎপাদন বা রফতানি করতে চায়, সেক্ষেত্রেও তাদের লাইসেন্স নিতে হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষা করা’, যাতে উপকরণগুলো ‘সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সামরিক বা সংবেদনশীল খাতে ব্যবহৃত না হয়’।
একইসঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পে নিজেদের প্রাধান্য রক্ষায় চীন লিথিয়াম ব্যাটারি ও সিনথেটিক গ্রাফাইট অ্যানোড উপকরণের ওপরও রফতানি নিয়ন্ত্রণ ঘোষণা করেছে। এই পদক্ষেপ ৮ নভেম্বর থেকে কার্যকর হবে। আর চীনের বাইরে এসব প্রযুক্তি ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে ১ ডিসেম্বর থেকে।
চীন বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের ১৪টি সামরিক ও প্রযুক্তি কোম্পানিকে ‘অবিশ্বস্ত সত্তা তালিকা’-তে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর ফলে এসব প্রতিষ্ঠান চীনে ব্যবসা, বিনিয়োগ বা চীনা কোম্পানির সঙ্গে লেনদেন করতে পারবে না।
এর মধ্যে রয়েছে কানাডার প্রতিষ্ঠান টেকইনসাইটস, যারা সম্প্রতি জানিয়েছিল যে, হুয়াওয়ের তৈরি এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চিপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এর পর কোম্পানিটি তদন্তের মুখে পড়ে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে নিজের রফতানি নিয়ন্ত্রণে ‘লং-আর্ম জুরিসডিকশন’ প্রয়োগ করে তৃতীয় দেশের কোম্পানিগুলোকেও চাপ দেয়, এবার চীন সেই কৌশলকেই উল্টো ব্যবহার করছে।
চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত দিলেও এই পদক্ষেপে আবারও উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন নতুনভাবে কিছু চীনা প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা বেইজিং তীব্রভাবে সমালোচনা করে।
চলতি বছরের এপ্রিলেই চীন প্রথম সাতটি বিরল খনিজ ও তাদের ম্যাগনেট রফতানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত ‘পারস্পরিক শুল্ক’-এর জবাবে। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধাক্কা লাগে। পরবর্তীতে জুনে দুই দেশ এক চুক্তির মাধ্যমে আংশিকভাবে সংকট প্রশমিত করে।
তবে বৃহস্পতিবারের নতুন ঘোষণায় বিশ্ববাজারে আবারও অস্থিরতা ফিরে এসেছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, কিছু বিদেশি সংস্থা ও ব্যক্তি চীনের খনিজ ও প্রযুক্তি সামরিক খাতে ব্যবহার করেছে, যা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি।
তিনি আরও বলেন, এই কার্যক্রম আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ন করছে এবং বিশ্বব্যাপী অপ্রসারণ প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আসন্ন শি-ট্রাম্প বৈঠকের আগে চীনের এই পদক্ষেপ শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত বার্তাও বহন করছে। আর সেই বার্তা হলো, বিশ্বের সাপ্লাই চেইনের লাগাম এখনও বেইজিংয়ের হাতে।
সূত্র: সিএমজি, সিএনএন