তাইওয়ান নিয়ে জাপান-চীন উত্তেজনা কেন চরমে?

তাইওয়ান নিয়ে জাপান-চীন উত্তেজনা কেন চরমে?

তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে জাপানের সঙ্গে বিরোধ নিয়ে জাতিসংঘের দ্বারস্থ হয়েছে চীন। ২০২৩ সালের পর পূর্ব এশিয়ার দুই প্রতিবেশির মধ্যে সম্পর্ক আবারও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চীনের স্থায়ী প্রতিনিধি ফু কং শুক্রবার (২১ নভেম্বর) জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বরাবর পাঠানো চিঠিতে লেখেন, জাপান যদি তাইওয়ান প্রণালিকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র হস্তক্ষেপের চেষ্টা করে, তবে তা আগ্রাসনের শামিল হবে।

গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ বলে সবসময় দাবি করে আসে বেইজিং। প্রয়োজনে বলপ্রয়োগে দ্বীপটি দখলে নেওয়ার সম্ভাবনাও কখনও খারিজ করেনি তারা।চলমান কূটনৈতিক বাদানুবাদ শুরু হয় চলতি মাসের শুরুর দিকে জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাইকাচির একটি মন্তব্যকে ঘিরে। ওই কথায় বেইজিং ক্ষেপে গিয়ে প্রত্যাহারের দাবি তুললেও তাকাইচি তা কানে তোলেননি।

তবে এই দ্বন্দ্ব দ্রুতই দুই দেশের ব্যবসা খাত জড়িত এক ধরনের বাণিজ্যযুদ্ধে রূপ নিয়েছে এবং দীর্ঘদিনের বিবাদমান এক ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা উত্তেজনাকে আরও ঘনীভূত করেছে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাইকাচি যা বলেছিলেন

চলতি মাসের ৭ তারিখ পার্লামেন্টে বক্তব্য দিতে গিয়ে তাইওয়ানপন্থি হিসেবে পরিচিত তাইকাচি বলেন, চীনের নৌ অবরোধ বা তাইওয়ানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ জাপানের পক্ষ থেকে সামরিক প্রতিক্রিয়া আনতে পারে। এ ধরনের স্পষ্ট অবস্থান কোনও জাপানি নেতা প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেননি।

তাইকাচি বলেন, চীন যদি যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করে ও সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে তা জাপানের অস্তিত্বের হুমকি পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তার এই বক্তব্যের পরদিনই চীনের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা প্রতিবাদ জানিয়ে মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি তোলা হয়।

জাপানের ওসাকায় পদায়িত চীনের কনসাল জেনারেল সুয়ে জিয়ান একদিন পর এক্সে কঠোর মন্তব্য করে বলেন, আমাদের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা নোংরা ঘাড়টি ফেলে দেওয়ার সময় হয়েছে। সবাই প্রস্তুত তো?

ওই পোস্ট পরে প্রত্যাহার করা হলেও দ্রুতই সেটি জাপানের মহলে উত্তেজনা ছড়ায় এবং একাধিক কর্মকর্তা চীনা কূটনীতিককে বহিষ্কারের দাবি তোলেন।

জাপানের চিফ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি মিনোরু কিহারা বেইজিংয়ের কাছে পোস্টটির প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন এটি চরম অনুপযুক্ত। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পোস্টটি মুছে ফেলতে দাবি জানায়। যদিও চীনা কর্মকর্তারা ওই বক্তব্যে কনসালের ব্যক্তিগত মতামত বলে দায় সারার চেষ্টা করে।

১৪ নভেম্বর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাপানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে সতর্ক করে যে, তাইওয়ানে হস্তক্ষেপ করলে জাপান “ভয়াবহ পরাজয়ের” মুখে পড়বে। পরদিন জাপানও চীনা রাষ্ট্রদূতকে তলব করে প্রতিবাদ জানায়।

বিতর্কিত মন্তব্যের তিন দিন পর তাইকাচি পার্লামেন্টে জানান যে, তিনি ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে চলবেন। তবে মন্তব্য প্রত্যাহারের কোনও ইচ্ছা তার নেই।

দ্বন্দ্ব যেভাবে আরও ঘনীভূত হলো

এই বাগযুদ্ধ পরে এক ধরনের বাণিজ্যযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। ১৪ নভেম্বর জাপানের বিরুদ্ধে ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞা জারি করে চীন। এটি জাপানের পর্যটন শিল্পকে লক্ষ্য করে বলে মনে করা হচ্ছে, যেখানে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রায় ৭৫ লাখ চীনা পর্যটক জাপান গিয়েছিলেন। ১৫ নভেম্বর তিনটি চীনা এয়ারলাইন জাপানগামী রুটে টিকিট বদল বা ফেরত দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও জাপানে অধ্যয়নরত বা সেখানে পড়তে ইচ্ছুক চীনা শিক্ষার্থীদের জন্য সতর্কতা জারি করে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই দেশেই একে অপরের নাগরিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা বিদ্বেষের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। তবে এসব হামলার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র স্পষ্ট নয়।

এছাড়া, ভূখণ্ডগত উত্তেজনাও বাড়ছে। গত রবিবার চীনের কোস্টগার্ড পূর্ব চীন সাগরের বিতর্কিত দ্বীপসমূহে টহল দেওয়ার ঘোষণা দেয়। জাপান ওই দ্বীপগুলোকে সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ এবং চীন দিয়াওইউ দ্বীপপুঞ্জ বলে। জাপান চারটি চীনা কোস্টগার্ড জাহাজের সাময়িকভাবে তাদের জলসীমায় প্রবেশকে “লঙ্ঘন” হিসেবে নিন্দা জানায়।

গত সপ্তাহে চীন অন্তত দুটি জাপানি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী স্থগিত করেছে এবং জাপানি সামুদ্রিক খাবার নিষিদ্ধ করেছে। বৃহস্পতিবার এক ঘোষণায় নভেম্বরের শেষ দিকে নির্ধারিত জাপান-কোরিয়া-চীন সংস্কৃতি মন্ত্রীর বৈঠকও স্থগিত করে বেইজিং।

অবজ্ঞা প্রদর্শনের অভিযোগ

১৮ নভেম্বর দুই দেশের কূটনীতিকেরা বেইজিংয়ে বৈঠকে মিলিত হন, যেখানে উভয় পক্ষ তাদের অভিযোগ তুলে ধরে। বৈঠকে চীনের সিনিয়র কর্মকর্তা লিউ জিনসঙ পাঁচ-বোতামবিশিষ্ট কলারবিহীন একটি স্যুট পরেছিলেন, যা ১৯১৯ সালে জাপানি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চীনা ছাত্রদের বিদ্রোহের সঙ্গে সম্পৃক্ত। জাপানি সংবাদমাধ্যম এই পোশাকটিকে “অবজ্ঞার প্রতীক” হিসেবে উল্লেখ করেছে।

সংবাদমাধ্যম আরও বলছে, বৈঠকের পর ভিডিও ও ছবিতে দেখা গেছে লিউ পকেটে হাত রেখে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, যা উচ্চ পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক পরিবেশে অসম্মানজনক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। বেইজিংয়ের বৈঠক উত্তেজনা কমাতে পারেনি। চীনা প্রতিনিধিরা মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে, আর জাপানি কূটনীতিকেরা বলেন তাইকাচির মন্তব্য জাপানের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

চীন-জাপান বিরোধের ইতিহাস

দুদেশের দীর্ঘ এবং বিশেষত চীনের জন্য বেদনাদায়ক এক ইতিহাস রয়েছে। প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধের (১৮৯৪–৯৫) পর সাম্রাজ্যবাদী জাপান চীনের বড় অংশ দখলে নেয়, তাইওয়ান নিয়ন্ত্রণে আনে, এবং কোরিয়াকে বলপ্রয়োগে সংযুক্ত করে। ১৯৩৭ সালে দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ শুরুর পর জাপান পূর্ব ও দক্ষিণ চীনের অংশ দখল করে এবং সেখানে পুতুল সরকার স্থাপন করে। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে জাপানের পরাজয়ে চীনা ভূখণ্ডে তাদের বিস্তার থামে।

১৯৪৯ সালে চীনের গৃহযুদ্ধ শেষে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় এলে কুওমিনতাং তাইওয়ানে পালিয়ে যায় এবং সেখানে আলাদা সরকার প্রতিষ্ঠা করে। তবে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত জাপান তাইওয়ানকেই আনুষ্ঠানিকভাবে “চীন” হিসেবে স্বীকৃতি দিত।

১৯৭২ সালে জাপান অবশেষে বর্তমান গণপ্রজাতন্ত্রী চীনকে স্বীকৃতি দেয় এবং “এক চীন নীতি” মেনে নেয়। এরপর তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিন্ন করলেও বাণিজ্যসহ অনানুষ্ঠানিকভাবে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রেখেছে। জাপান একইসঙ্গে “কৌশলগত অস্পষ্টতা” নীতি অনুসরণ করে—চীন যদি তাইওয়ানে হামলা চালায়, সে ক্ষেত্রে টোকিও কী করবে তা অস্পষ্ট রেখে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও একই।

চীন ও জাপানের মধ্যে বাণিজ্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হে ইয়ংচিয়ান চলতি সপ্তাহে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জাপানি প্রধানমন্ত্রী তাইকাচির মন্তব্যের কারণে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক “মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত” হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পর চীন জাপানের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি বাজার—যেখানে জাপান প্রধানত শিল্পযন্ত্রপাতি, সেমিকন্ডাক্টর ও গাড়ি রফতানি করে। জাতিসংঘের কমট্রেড ডেটাবেস অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চীন প্রায় ১২৫ বিলিয়ন ডলারের জাপানি পণ্য কিনেছে। আর তৃতীয় বৃহত্তম বাজার দক্ষিণ কোরিয়া ৪৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কিনেছে।

চীন জাপানের শামুক ও স্ক্যালপের অন্যতম বড় ক্রেতা। রফতানিমুখী জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষত সামুদ্রিক খাবার রফতানিকারীরা, এই উত্তেজনার প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

জাপানের অর্থনীতির ওপর বেইজিং অতো নির্ভরশীল না হলেও, টোকিও তাদের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। চীন জাপানে মূলত ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি, পোশাক, যন্ত্রাংশ ও যানবাহন রফতানি করে। ট্রেডিং ইকোনমিকসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে টোকিও চীন থেকে ১৫২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে।

টোকিওকে বাণিজ্যিকভাবে শায়স্তা করতে বেইজিংয়ের এটিই প্রথম নজির নয়। ২০২৩ সালে ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানি সমুদ্রে ছাড়ার পর চীন সব জাপানি খাদ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। যদিও জাতিসংঘের পরমাণু সংস্থা পদক্ষেপটিকে নিরাপদ বলেছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা চলতি বছরের ৭ নভেম্বর তুলে নেওয়া হয়, ঠিক যেদিন তাইকাচি ওই বিতর্কিত মন্তব্য করেন।

২০১০ সালেও চীন সেনকাকু বা দিয়াওইউ দ্বীপের কাছে এক চীনা জেলে আটক হওয়ার পর সাত সপ্তাহের জন্য জাপানে বিরল খনিজ রফতানি বন্ধ করে দিয়েছিল।

Comments

0 total

Be the first to comment.

নেপালের পার্লামেন্ট ভাঙার প্রশ্নে থমকে আছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আলোচনা BanglaTribune | আন্তর্জাতিক

নেপালের পার্লামেন্ট ভাঙার প্রশ্নে থমকে আছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আলোচনা

নেপালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্র পাউদেল এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কা...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin