অনলাইন নিউজপোর্টাল ‘ঢাকা স্ট্রিম’-এর গ্রাফিক ডিজাইনার স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের ‘আত্মহত্যা’র ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের ২৪৩ জন নাগরিক। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে যৌন হয়রানির অভিযোগ পাওয়ার পরও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় সংবাদমাধ্যমটির সম্পাদক, প্রকাশক ও মানবসম্পদ বিভাগের প্রধানের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিবৃতিদাতাদের পক্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা এবং কবি ও সাংবাদিক গিরীশ গৈরিক মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) গণমাধ্যমে এক বিবৃতি পাঠান।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে ঢাকা স্ট্রিমের বাংলা কনটেন্ট এডিটর আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, অশোভন আচরণ ও মানসিক নিপীড়নের অভিযোগ এনে প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ বিভাগে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন স্বর্ণময়ী বিশ্বাসসহ তার ২৬ জন সহকর্মী। অভিযোগকারীদের মধ্যে ৯ জন নারী সাংবাদিক ছিলেন।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘প্রতিষ্ঠানটির ২৬ জন সংবাদকর্মীর লিখিত ও প্রমাণসাপেক্ষ অভিযোগের পরও প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি। নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনায় অভিযুক্তকে সাময়িক বরখাস্ত করার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি তা করেনি।’
বিবৃতিদাতারা মনে করেন, ‘এ ঘটনায় সংবাদমাধ্যমটির সম্পাদক-প্রকাশক এবং মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান তাদের নৈতিক ও প্রশাসনিক দায় এড়াতে পারেন না।’ তারা উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন ও অভিযোগ তদন্তের প্রক্রিয়া না মানায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।’
বিবৃতিদাতারা বলছেন, ‘এ ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, এটি বাংলাদেশের নারী কর্মীদের কর্মপরিবেশের ভয়াবহ বাস্তবতাকে প্রকাশ করে। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও মানসিক নির্যাতনের মতো অপরাধ ঘটেই চলেছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার সঠিক বিচার হচ্ছে না। ফলে অসংখ্য নারী নীরবে মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন, কেউ কেউ বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন, কেউ আবার অপমান ও হতাশা সইতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন।’
বিবৃতিদাতারা মনে করেন, ‘স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের মৃত্যু দেশের সাংবাদিক সমাজ, সৃজনশীল মানুষ ও নাগরিক বিবেকের জন্য এক কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছেন।’
তারা বলছেন, ‘‘এ ঘটনায় আমরা গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করছি। স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের মৃত্যু যেন আরেকটি ‘সংবাদ’ হয়ে হারিয়ে না যায়। আমরা চাই তার মৃত্যু হোক পরিবর্তনের সূচনা, ন্যায়বিচারের জাগরণ।’’
বিবৃতিতে তিনটি ‘স্পষ্ট দাবি’ জানানো হয়েছে— যথাযথ তদন্তসাপেক্ষে অভিযুক্তসহ সংশ্লিষ্টদের অবিলম্বে আইনের মুখোমুখি করতে হবে, ঢাকা স্ট্রিম কর্তৃপক্ষের ভূমিকা ও অবহেলা তদন্তের আওতায় আনতে হবে এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিবৃতিতে সম্মতি দিয়েছেন—কবি নির্মলেন্দু গুণ, আইনজীবী জেড আই খান পান্না, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, শিক্ষাবিদ আব্দুল বায়েস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন, অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, কবি গুলতেকিন খান, কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহান, অভিনেতা কচি খন্দকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা দীপংকর দীপন, অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন, কথাসাহিত্যিক ইসহাক খান, আইনজীবী মানজুর আল মতিন, কলামিস্ট জিয়াউদ্দীন আহমেদ, গবেষক সুজাত মনসুর, কথাশিল্পী পারভেজ হোসেন, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ কাফী রতন, জাবি অধ্যাপক অধ্যাপক আবু দায়েন, ড. মাসউদ ইমান মান্নু, অধ্যাপক মাহমুদুল সুমন, ড. কাসফিয়া নাহরিন, অধ্যাপক আইনুন নাহার, অধ্যাপক মাহমুদা আকন্দ, ঢাবি অধ্যাপক ড. রফিক শাহরিয়ার, ড. মো. আবদুর রহিম, সহযোগী অধ্যাপক ড. নীলিমা আখতার, কথাসাহিত্যিক অদিতি ফাল্গুনী, অধ্যাপক কাজী ফরিদ, সহযোগী অধ্যাপক উম্মে ফারহানা, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, কবি ও সাংবাদিক নওশাদ জামিল, কবি ও প্রকাশক শরীফা বুলবুল, কবি ও কথাসাহিত্যিক আহসান হাবিব, কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমান, নাট্যকার ও কথাসাহিত্যিক রুমা মোদক, সাংবাদিক ও শিক্ষক সুদীপ্ত সালাম প্রমুখ।