বাংলাদেশে তাপমাত্রা ২১০০ সালের মধ্যে ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর (বিএমডি), সেভ দ্য চিলড্রেন এবং নরওয়েজিয়ান মেটেরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট-এর উদ্যোগে বুধবার (১৯ নভেম্বর) রাজধানীর হোটেল শেরাটন ঢাকায় উন্মোচন করা হয় বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন ‘দ্য ফিউচার ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ’। প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বিস্তৃত ও প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছে, যেখানে তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এর সঙ্গে তীব্রতর হিটওয়েভ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি এবং জলবায়ুজনিত স্বাস্থঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
অনুষ্ঠানে অংশ নেন সরকারের সিনিয়র কর্মকর্তারা, জলবায়ুবিজ্ঞানী, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানে নরওয়েজিয়ান মেটেরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটের কী-নোট উপস্থাপনা এবং বিএমডির নেতৃত্বে বিস্তারিত কারিগরি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিবেদনে যেসব তথ্য উঠে এসেছে তার মধ্যে রয়েছে, তীব্র ও বিস্তৃত হিটওয়েভ মৌসুমে ১৫–২৫ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, বাংলাদেশের উপকূলীয় ভূমির সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি, বর্ষাকালে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, যা বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াবে এবং চরম গরমের মাত্রা ১ শতাংশ বাড়লে চাইল্ড স্টান্টিং বা শিশু খর্বকায়তার ঝুঁকি ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন বলেন, ‘এই রিপোর্টে বাংলাদেশের জলবায়ু প্রক্ষেপণ খুবই স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ২১০০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ৪.৫ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উপকূলীয় মানুষকে হুমকিতে ফেলবে, আর তীব্র হিটওয়েভ স্বাস্থ্য, কৃষি ও নিরাপদ পানির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করবে। এগুলো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।’
তিনি বলেন, ‘নরওয়ে সরকারের জন্য বাংলাদেশ, বিএমডি এবং জাতীয় অংশীদারদের জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে সহযোগিতা করা তাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে পড়ে। বাংলাদেশ একটি দৃঢ় ও সহনশীল দেশ, এবং এই প্রতিবেদন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জলবায়ু পদক্ষেপে ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতি অপরিহার্য। সামনে নির্বাচন, এবং আমি আশা করি রাজনৈতিক দলগুলো এসব প্রক্ষেপণ তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেবে।’
অধিবেশনের চেয়ার ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের গতি দ্রুততর হচ্ছে, এবং আমাদের গ্রহের উষ্ণায়ন এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল রেকর্ডকৃত সর্বোচ্চ উষ্ণ বছরগুলোর একটি এবং এই বছরের অক্টোবর ইতোমধ্যে বৈশ্বিক ইতিহাসের সর্বাধিক উষ্ণ অক্টোবরগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বর্তমান হারে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে মধ্য-শতাব্দীতে ১–২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শতাব্দীর শেষে ১.৫–৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে। বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন আসবে, এবং বর্ষায় বৃষ্টিপাত ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে—বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান (এনএপি)–এর মাধ্যমে জলবায়ু সহনশীল কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, টেকসই নগরায়ণ এবং প্রকৃতিনির্ভর সমাধানসহ গুরুত্বপূর্ণ অভিযোজন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে যে ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় বৈজ্ঞানিক জলবায়ু প্রক্ষেপণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।’
সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশ জোর দিয়ে জানায় যে, ভবিষ্যৎ জলবায়ু প্রক্ষেপণকে অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন, কমিউনিটি প্রস্তুতি এবং শিশু-কেন্দ্রিক জলবায়ু সহনশীলতার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি। বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে ক্রমবর্ধমান জলবায়ু বিপর্যয় থেকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করবে।
‘দ্য ফিউচার ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ’ প্রতিবেদনটি বিএমডি এবং নরওয়ের মেটেরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট যৌথভাবে প্রণয়ন করেছে, যেখানে সেভ দ্য চিলড্রেন কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে। প্রতিবেদনটি জাতীয় পরিকল্পনা, অভিযোজন কৌশল এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রমে ব্যবহারযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রদান করে।