সপ্তাহের শেষ দিন, উইকেন্ড শুরুর বিকাল। এই দিন মনে হালকা ভাব বোধ হওয়ার কথা, গত পাঁচ দিনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলার মতো উদ্যম বোধ করা উচিত বৈকি। কিন্তু আমার মনে তেমন কোনো ফুরফুরে ভাব আসছে না। বরং নিজের ভেতরটা এক ধরনের ছন্নছাড়া চৈত্রের লু হাওয়ার বিলাপে গুমরে উঠছে। যদিও এখন চৈত্রকাল নয়, বরং তুষার শুভ্র শীতকাল। অফিস শেষে, ক্লান্ত হাতে পার্কিং লটে গাড়ির ওপর জমে থাকা সফেদ ঝুরঝুরে তুষারের স্তূপ সরাতে গিয়ে অনুভব করি, আমি ঘরে ফিরতে চাই না, পালাতে চাই। ঘর থেকে দূরে কোথাও পালাতে চাই। নিজের ভেতরের এই ইচ্ছা আমার কাছে অনাহূত বা অপরিচিত নয়, দীর্ঘ দিন ধরে নিজের ভেতর এই তাড়না বহন করে চলেছি। প্রায়শই, আমার সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে কোথাও নিরুদ্দেশ হতে ইচ্ছা করে। এমনতর ইচ্ছার কথা অন্যরা জানলে নিশ্চয় ভাববে, সংসার করতে করতে এমন আকাঙ্ক্ষা তো অনেকের মনেই আসে, তাই বলে কী সবাই নিরুদ্দেশ হয়, নাকি হতে হয়?
সবাই হয় না, আমিও হই না। কেউ কেউ হয়ত হয়ও, তাই তো নিজের ভেতর আকাঙ্ক্ষা দিনে দিনে অঙ্কুরোদগম হতে দেই, একদিন ঠিক চৈত্রের বেভুল বাতাসের তোড়ে উড়তে উড়তে ঝরা পাতা হয়ে কোথাও উড়ে যাবে! নিজের না হোক, কারো না কারো পায়ে পায়ে লুটাব।
জামিল, আমার স্বামী, আমাদের দুই দশকের বেশি শখের সংসার জীবন, যৌথ জীবনে কমিটমেন্টের কোথাও ঘাটতি হয়নি এই পর্যন্ত। তারপরও, দু’জনের মাঝে কোথাও যেন একটা সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হয়ে গেছে, নিজেদের অজান্তে। যেমন, বহু দিনের বসবাস করা চেনা গৃহে দেয়ালের গায়ে সূক্ষ্ণ, লম্বা দৃশ্যমান ফাটল আবিষ্কার করে মানুষ তাজ্জব হয়ে তাকিয়ে থাকে, ভেবে বিস্মিত হয়; কবে কখন এই ফাটল সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি আমি আমাদের মাঝে অকস্মাৎ এই জাজ্বল্যমান দূরত্ব রেখা আবিষ্কার করে গেল কিছু বছর বিমূঢ় হয়ে আছি। জামিলের সাথে কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম ‘ফাটল’ নিয়ে, কিন্তু ও ভাবে আমাদের সম্পর্ক ঠিকই আছে। আমি নাকি মন উচাটন ভাবনা ভাবতে পছন্দ করি। মানুষের বয়স বাড়লে, সংসারের বয়স বাড়লে এমনই হয়, এভাবে তো সব চলে, সংসার মানে যেন জ্যামিতিক হিসাব, মিলতে বাধ্য। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুতে পরিমিতিবোধ সম্পর্কে সৌম্যতা আনে। হায়! আমার হিসাব মিলে না, আমার সৌম্যতা আসে না, ব্যক্তিত্ব বাড়ে না। তাই আমি চৈত্রের ধুলায় উড়ে পড়ে কারো পায়ে লুটাতে চাই।আমার আর জামিলের দিনগুলো ধূসর এবং শীতল; দৈনন্দিন সামাজিকতা আর সংসারের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে আবদ্ধ থেকে। সন্ধ্যাগুলো হয়ে ওঠে আরও একঘেয়ে, দৃশ্যমান টেলিভিশনের সামনে নীরবে কোনো পানীয়ের পাত্র হাতে, কোনো বইয়ের পাতায় মুখ ডুবিয়ে বা কোলে রাখা ল্যাপটপের কিবোর্ডে আঙুল চালিয়ে। আমরা নিজেদের মধ্যে খুব একটা কথা বলি না, সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে যত এগিয়েছে, আমরাও তত বুঝেছি বা জেনেছি; কথা ছাড়াও পারস্পরিক ভাব বিনিময় বা প্রয়োজন জানা সম্ভব। দীর্ঘ দিন, মাস বা বছর একই ছাদের নিচে যৌথ জীবন যাপনের এই এক সুবিধা বা অসুবিধা। মাঝে মাঝে আমার, হয়ত জামিলেরও; কিছু আবোল-তাবোল কথা বকতে ইচ্ছা করে, কিন্তু এখন আমরা আর তেমনটা বলি না বা করি না, যা কোনো এককালে আমাদের রোজকার ছিল, এখন তা বাতাসে মিলিয়ে যাওয়া চিমনির ধোঁয়ার মতো অতীত স্মৃতি। আদতে আমরা হয়ত বুঝতেই পারছি না, এক সময় যে পাগল পাগল বন্ধুত্ব নিয়ে আমরা এক হয়েছিলাম, আমাদের মাঝ থেকে সেসব পাগলামি হারিয়ে গেছে, আমাদের বন্ধুত্ব মরে গেছে; যা আমরা স্বীকার করতে চাই না, কিন্তু এই সত্য আমাদের মধ্যে ঘটে গেছে, আমাদের মিথস্ক্রিয়ার ক্ষেত্রও ছোট হয়ে গেছে। এসব অভিযোগ, অনুযোগ একান্ত আমার নিজের ভেতর পুষে রাখা, একান্ত নিজের ভাবনা; এত সব সত্ত্বেও আমাদের একটা সফল সুন্দর যৌথ জীবন কাটছে, বৈকি।
অভিযোগ অনুযোগ একান্ত আমার, তাই এই নিরুত্তাপ জীবন যাপনের ভারও আমার একার। জামিল তার জীবন যাপনকে নিস্পৃহ বা একঘেয়ে বলতে নারাজ, এটাই ওর জীবন যাপনের স্টাইল। ও জানে, মার্জিন লাইন বা পরিমিতিবোধ। কোনো এক কালে আমি উচ্চস্বরে হাসতে পছন্দ করতাম, এখন অন্যের উচ্চকিত কণ্ঠে ভ্রুকুটি করি। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেলেও আমার ভেতর পুরোনো বদ অভ্যাসগুলোর জন্য নীরবে ক্ষরণ হতেই থাকে।গাড়ির ছাদ থেকে ছোট ব্রাশ দিয়ে তাজা তুষারের স্তূপ ঝাড়তে ঝাড়তে খেয়াল করি, সুন্দর নরম রোদ উঠেছে। সারা দিনের তুষার ঝরা থেমে গেছে কখন যেন, আকাশের এক কোণে হালকা রঙা বড়সড় এক রংধনু হেলে আছে। এই নরম রোদ, ওই রংধনু, দেশের শ্রাবণ মাসের টানা দুই তিন দিনের বৃষ্টি শেষে যেমন কাঁচা সোনা রঙা রোদ উঠে তেমনটা মনে হচ্ছিল। আমি শ্রাবণের বর্ষা না পেয়ে পায়ের নিচে জমে থাকা তুষার স্তূপের নিচে ডুব দেই, আমার নাক, শ্বাসনালিতে ঠান্ডা ঝড়ো বাতাসের বেগে হিম তুষার ঢুকে পড়ে, নিশ্বাস নিতে গিয়ে অনুভব করি কণ্ঠনালি হয়ে আমার বুকের পাঁজরে পাঁজরে হিম শীতলতা ছড়িয়ে পড়েছে। এই বোধ আমার মাথার মধ্যে এক স্থবির অনুভূতির জন্ম দেয় অথবা যেন এই বিকালের সোনা ঝরা নরম আলো আর সফেদ তুষারের ভেল্কিবাজী, সব মিলে এক ঘোর লাগা বিভ্রম আর পলায়ন মনোভাব আমাকে এক কিম্ভূত মিথস্ক্রিয়ার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।আমি বাসার উদ্দেশ্যে ড্রাইভ করি, সামনে বিশাল দানব আকৃতির ট্র্যাক্টর, ধীর গতিতে রাস্তার তুষার পরিষ্কার করতে করতে চলছে, আমার পেছনেও গাড়ির বেশ লম্বা লাইন; পিঁপড়া গতি; এই বর্ণিল বিকালে কারো যেন কোথাও যাবার তাড়া নেই। কলিম শরাফির সেই গানের ভাবার্থের মতোই সবাই নিজেদের ‘পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া রে সেই দুঃখের চোখেরও পানি…’ ভাব নিয়ে রাস্তায় বসে আছে। আমারও তাড়া নেই, তারপরও আমি ভীষণ ব্যস্ত হয়ে হঠাৎ ডানের অচেনা রাস্তায় গাড়ির মোড় ঘুরিয়ে দেই। সামনে দীর্ঘ শাখা বিহীন পথ, অল্প স্বল্প গাড়ির চলাচল। পথের দুই পাশে বিরান ফসলি জমি, গরমের মৌসুমে এই সব জমিতে সোনালি গমের শীষ ঢেউ তুলে বা সবুজ ভুট্টার চারা হাওয়ায় দোল খায়। এখন ধূ ধূ বিরান কারবালা ছাড়া আর কিছুই নয়। বেশি সময় দৃষ্টি রাখা যায় না, তুষারও মরীচিকার মতোই চোখে বিভ্রম তৈরি করে।সামনে খোলা দীর্ঘ পথ পেয়ে কী হয় জানি না, আমি সামনেই এগিয়ে যাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠি, কিছুটা দ্রুত গতিতেই লোকালয় ছেড়ে যেতে থাকি। এই দিকে বেশ দূরে দূরে কিছু খামার আছে, আগে দুয়েকবার আসা হয়েছিল, কখনো কখনো খামারের ফ্রেশ ডিম বা নতুন আলু কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম। এইবেলা আমার কোথাও যাবার তাড়া নেই, তারপরও এমন ভাবে ছুটি যেন কোথাও পৌঁছাতে হবে আমাকে, দেরি হলে ভীষণ অনিষ্ট হয়ে যাবে।গাড়ির জানালায় তখনও দিনের আলো নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে শেষ রশ্মিটুকু আঁকড়ে ধরে আছে। নরম আর মোলায়েম আলো, এ আলোয় গরমের তেজ নাই যেমন, তেমনি এর কনকনে হাওয়ার তেজ হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেবার জন্য দুর্দান্ত। শীতকালে, নর্ডিক দেশগুলোতে আমাদের দেশের মতো করে শেষ বিকাল বা গোধূলি বেলা আসে না। দুপুরের পর অতর্কিত রাত নেমে আসে আর রাতগুলো হয় ভীষণ রকম দীর্ঘ আর শীতঘুমে অলস সরীসৃপের মতো নিশ্চল।আমি জানি একটুপরই সেই অন্ধকার নেমে আসবে, ঘন অন্ধকার। এই পথ ধরে আমার ঘরে ফিরতে ফিরতে কালো অন্ধকারে চারপাশ ঢেকে যাবে। সে রকম অন্ধকারে আমার ড্রাইভ করতে বা অন্য কোনো সমস্যা হবে না, কিন্তু এই যে আমার ফিরতে দেরি হবে তার জন্য জামিল কী উদ্বিগ্ন হবে? ভাববে, আমি কী হারিয়ে গেছি? এই ভাবনা আমার মাথায় চেপে বসে, এবং পুরোপুরি পেয়ে বসে ভাবনাটি।মূল রাস্তা ছেড়ে ডানে বাঁয়ে করে কয়েকটি পথ, উপপথ পেরিয়ে জঙ্গলের লাগোয়া, কিন্তু পাতাশূন্য, বরফে মোড়া কিছু বড়ো গাছের ঘের দেওয়া একটি লাল রঙা শীতকালীন কেবিনের উঠানে এসে থামি। আপাতত অপ্রত্যাশিত মনে হলেও এই কেবিন আমার কাছে মোটেও অপরিচিত নয় কিংবা হয়ত আমি এই কেবিনকে উপলক্ষ করে এতটা পথ ছুটে এসেছি।এরই মাঝে সূর্য ডুবে গেছে। আকাশে প্রায় পরিপূর্ণ এক চাঁদ, তার আলো চারিদিকের সফেদ তুষারের ওপর আছড়ে পড়াতে এক মায়াবী আলোর বিচ্ছুরণে পুরো প্রকৃতি বাংলাদেশের কুয়াশায় মোড়ানো ফজরের ওয়াক্তের মতো পরিষ্কার দৃশ্যমান। যেন কান পাতলেই শুনব মুয়াজ্জিনের মিহি স্বরের সেই আহ্বান, ‘ আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম…” সামনে সাদা নরম তুষারের ঢাকা ছোট একটি উঠান আর ফায়ার প্যালেসে জ্বালানোর জন্য কেটে রাখা সারিবদ্ধ ছোট ছোট কাঠের টুকরো। কেবিনের বন্ধ দরজার ফাঁক গলে ওপাশ থেকে এক ফালি সরু আলো উঠানে চিত হয়ে শুয়ে আছে, কেবিনের ছাদের চিমনিতে উষ্ণ ধোঁয়ার কুণ্ডলী। সব কিছু এমন সুনসান আর ছবির মতো সুন্দর তারপরও আমি দমে যাই। আমি তো জানি ওই বন্ধ দরজার ওপাশে কে আছে। গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করার আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, ফিরে যাই। কিন্তু ততক্ষণে কেবিনের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে রয়। ওর পিছনে ঘরের আলোর কারণে মুখ স্পষ্ট নয়, তুষার বিছানো ওঠানো ওর বিশাল ছায়া বরং প্রখর। অগত্যা গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে কিছুটা অস্বস্তিতে আমি বাহানা খুঁজি নিজের কাছেই।রয়। আমাদের পরিচয় আছে, বন্ধুর বন্ধু। বেশ কয়েকবার আমাদের দেখা হওয়ার পর এখন আমরাই বন্ধু। সে শহরের পরিচিত ফটোগ্রাফার এবং লেখক, সবচেয়ে বড়ো পরিচয় সে একজন পর্বতারোহী। তার কাজের জন্য দেশে জুড়ে খ্যাতি রয়েছে। বন্ধুর সঙ্গে চিত্র প্রদর্শনী এবং শহরের লাইব্রেরিতে লেখকের সঙ্গে পাঠকের সরাসরি আলোচনার ইভেন্টগুলোতে যাওয়ার কারণে রয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। তারপর আলাপ, কফি পান, দু’একবার শহরের পাবে দেখা, তারও পর, বন্ধুদের সঙ্গে মাছ ধরতে এসে রয়ের কেবিনে আসা হয়েছিল। শহরে ওর একটি অ্যাপার্টমেন্ট আছে কিন্তু বেশি সময় নাকি থাকা হয় এই নির্জন কেবিনে, জঙ্গলের কাছাকাছি। প্রথমবার কেবিনে এসে দেখেছিলাম, এক রুমের কেবিনটি বই, ফটোগ্রাফ আর আঁকায় ঠাসা। ভীষণ অগোছালো কেবিনের মুগ্ধতাও ছড়ানো ছিল।
গাড়িতে বসা আমাকে দেখে সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে হেসে ওঠে, বাহ্ তুমি! খুব ভালো সময়ে এসেছো…
কথা বলতে বলতে রয় এগিয়ে এসে গাড়ির দরজা খুলে ধরে, নেমে এসো…
আমি উৎসুক কণ্ঠে জানতে চাই, ভালো সময় মানে?
তোমাকে মনে মনে খুঁজছিলাম…
কিছু না বলে আমি ভ্রুকুটি করে তাকালে সে সশব্দে হেসে ওঠে, মনে আছে, মহাভারতা নিয়ে আমাদের আলোচনা বাকি আছে। এই কিছু সময় আগে কফির মগ হাতে তাই ভাবছিলাম।
আমি রয়ের পিছু পিছু দরজা ঠেলে ওর এক রুমের কেবিনে ঢুকলে কড়া কফি আর কাঠপোড়া গন্ধের যুগলবন্দি স্বাগত জানায়। বাইরের কনকনে ঠান্ডার পর ঘরে উষ্ণতার ওম আলিঙ্গন আমাকে আন্তরিক স্বাগত জানায়। আমি কেবিনের ভেতর একবার চোখ ঘুরিয়ে রয়ের দিকে ফিরে বলি, শব্দটা মহাভারতা নয়, মহাভারত হবে।
তারমানে আ’র উচ্চারণ হবে না?
না। এবার আমি অকপট মিথ্যায় বলি, এসেছিলাম এক ফার্মে, ডিম আর মধুর জন্য, কিন্তু অন্ধকার হয়ে এলো বলে ফার্মটি খুঁজে পাওয়া গেল না।
সেক্ষেত্রে নর্ডিক শীতের সন্ধ্যাকে আমি ধন্যবাদ জানাই, আমার হাতে গরম কফির পেয়ালা ধরিয়ে এবার স্মিত হাসে রয়।
হঠাৎ এসে তোমাকে বিব্রত করলাম না তো….
এই সব ভদ্রতা বাদ দিয়ে তুমি বরং এবার রিলাক্স হয়ে বসো। আমি তোমাকে ভাবছিলাম, ওই যে বললাম তো, মাহাভারতা, না না মহাভারত নিয়ে তোমার সঙ্গে কিছু আলোচনা করতে চাই।
আমরা পাশাপাশি একটি বড়ো সোফায় বসি, সোফাটি বেশ আরামদায়ক, ওপরটা ভেড়ার চামড়া দেওয়া বাড়তি ওমের জন্য। আমি কফির পেয়ালায় চুমুক দিয়ে জানতে চাই, বইটি পড়া শেষ?
মহাভারত? হ্যাঁ, শেষ। গ্রিক মিথলজির মতোই ইন্টারেস্টিং। সব দেব-দেবীরা কি ওমন স্খলিত চরিত্রের হয় নাকি?
শুধু স্খলিত চরিত্রই দেখলে?
না না, আরও অনেক কিছু। উচ্ছৃঙ্খল রাজনৈতিক ধূর্ততা। নারীদের দুর্দান্ত রাজনৈতিক দূরদর্শিতা আর কূটকৌশল, রাজনীতির দাবার চাল বদলে দেওয়া…
দাবা নাকি পাশা?
হ্যাঁ, পাশাই বটে!
আমি গরম কফির মগ দুহাতের মুঠোয় ধরে আর একবার পুরো ঘরে চোখ ঘুরিয়ে বলি, তোমার কেবিনটি কিন্তু দারুণ!
তোমার পছন্দ হয়?
হ্যাঁ, খুব। মনে হয় আমারও যদি এমন একটি লুকিয়ে থাকার মতো কেবিন থাকতো….
হেই লেডি, আমি কিন্তু এখানে লুকিয়ে থাকি না।
আমি হেসে বলি, ওই লোক চক্ষুর আড়াল, মানেই তো লুকিয়ে থাকা।
না। নিজের সঙ্গে থাকা। চাইলে তুমিও মাঝে মাঝে এসে এখানে থাকতে পারো। মানে যখন আমি শহরে থাকবে তখন তুমি এখানে এসে নিজের মতো করে থাকলে। কোথায় চাবি থাকে তোমাকে দেখিয়ে দেব।
আচ্ছা দেখা যাবে সে….
আজ কি তুমি আমার সঙ্গে ডিনার করবে?
না থাক। আমি বরং কফিটা শেষ করে চলে যাই।
তুমি যদি কিছু সময় থাকো, আমার সঙ্গে ডিনার করো আমার ভালো লাগবে। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে রয়। ওর চোখ কালো তো নয়ই নীলও নয়, নিথর শ্যাওলা সবুজ রঙা চোখ। যেন, সবুজ কচুরিপানা আর লাল পদ্মে পরিপূর্ণ গভীর এক পুকুর, যার তলদেশে লুকিয়ে রয়েছে রূপকথার সেই ভীষণ রাক্ষসের প্রাণভ্রমরার বিশাল বন্ধ সিন্ধুক। এই চোখের ভাষা আমার পরিচিত নয়, তারপরও তাকিয়ে অনুবাদের চেষ্টা করি। নিজের ভেতর কিছুটা পুলকিত বোধ করি, আমি এখন পৃথিবীর শেষ প্রান্তে এক আধা পরিচিত ভাইকিংয়ের সঙ্গে নির্জন কেবিনে পাশাপাশি বসে রয়েছি। এক মুখ দাড়ি গোঁফ আর ঝাঁকড়া চুলের পনি টেইল করা রয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলি। আমাকে হাসতে দেখে কিছুটা বিব্রত স্বরে রয় বলে, হাসছো কেন? আমি কি ভুল কিছু বলেছি?
আমি রয়ের হাতের ওপর আমার হাত রাখি, বলি; না তুমি মোটেও ভুল কিছু বলো নাই। আমি হাসছি, এই জায়গায় এসে আমার ভালো লাগছে তাই।
তাহলে তুমি নিশ্চয় আমার সঙ্গে ডিনার করছো? প্রচুর কানটেরালা মাশরুম গ্রীষ্মে পাহাড় থেকে তুলে সংগ্রহ করেছিলাম, তা দিয়ে সুপ করেছি, সঙ্গে বাগেট আর পিনোট নয়ারের কিছুটা পুরোনো রেড ওয়াইন, কি বলো?
আমাকে তো ড্রাইভ করে ফিরতে হবে, ওয়াইন না….
ওকে, জাস্ট এক গ্লাস ওয়াইন এরপর শুধু কালো কফি।
কথা শেষ করে রয় চুপ করে কিছু একটা শোনার চেষ্টা করে। হঠাৎ দাঁড়িয়ে আমার হাত ধরে বলে, এসো, একটা জিনিস দেখাই…
রয় আমাকে এনে দাঁড় করিয়ে দেয় জানালার সামনে, পর্দা সরানো কাচের শার্সির ওপাশে তুষারে ঢাকা নুন সাদা উঠান। চাঁদের আলোয় সে উঠানে গলা রূপার বন্যা বয়ে যাচ্ছে, তারমাঝে মাঝে আমার গাড়ীটি ঝিরঝিরে তুষারে ভিজছে আর পাশে শাখা প্রশাখায় সমৃদ্ধ বিশাল শিং উঁচিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে এক হরিণ!
আমার অনুচ্চারিত ভাবনার শব্দটি কেমন করে যেন রয় শুনতে পায়, সে এক হাতে ঘরের বাতির সুইচ অফ করে দিয়ে সন্তর্পণে আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়; আমার কানের কাছে ঠোঁট এনে ফিসফিসিয়ে বলে; এলগ্।
আমার মুখে কোনো ভাষা আসে না, পুরো ব্যাপারটি আমার কাছে রূপকথার মতো বিস্ময়কর লাগে। সেই সঙ্গে নিজেকে ভাগ্যবানও; তা না হলে এমন অলৌকিক দৃশ্য দেখার ভাগ্যও কি কারো হয়! এলগ্! সে কান খাড়া করে কিছু শোনার চেষ্টা করে, এমন সময় ওর পেছনে এসে দাঁড়ায় আর একটি এলগ্, উচ্চতায় প্রথম জনার চেয়ে সামান্য ছোট হবে। প্রথম জনা ঘাড় বাঁকিয়ে দ্বিতীয় জনার ঘাড় শুঁকে দিলে দ্বিতীয় জনা তার আরও গা ঘেঁষে এসে দাঁড়ায়। ওরা দু’টিতে রাজসিক ভঙ্গিতে এমন গলা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, নিজেদের গা ছুঁইয়ে থাকে; চাঁদের আলোয় ভিজতে থাকে, যেন পৃথিবীটা একমাত্র ওদের অধিকারে! ওরাই এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের আদি অন্ত আদম হাওয়া। আমার মুখে কোনো শব্দ আসে না, দৃষ্টিতে মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে এই দৃশ্য যতটা সম্ভব দেখতে থাকি। রয় না আমি? কে যে কার কাছে সরে গিয়ে আরও নিবিড় হয়ে দাঁড়াই আমরা, পরস্পরের শরীরের উষ্ণতা অনুভব করতে পারি, তারপরও নীরবে আমরা বাইরের দিকে তাকিয়ে নিজেদের উষ্ণতাকে উপেক্ষা করি। কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক ঘণ্টা পর আমাদের সংবিৎ ফিরে এলে আমরা চাঁদের আলোয় আলোকিত ঘরে এলোমেলো হেঁটে গিয়ে নিজেদের শূন্য আসনে বসি। আমি ফিসফিস করি, অপূর্ব...
প্রতি উত্তরে রয় কি কিছু বলে নাকি নীরব থাকে? এবার রয় সন্তর্পণে ওঠে গিয়ে গ্রামোফোনে রেকর্ড চালায়, আমার সামনে এসে হাত বাড়িয়ে দেয়, আমি নিঃসংকোচে সে হাত ধরে দাঁড়াই, আর নেইল ইয়ং তার মায়াবী কণ্ঠে গেয়ে ওঠে, ‘come a little bit closer, hear what i have to say...’। আমরা হালকা পায়ে আধো অন্ধকার ঘরে দোলে দোলে নাচতে থাকি, নেইল ইয়ং তার জাদুকরী কণ্ঠে গেয়ে যায়, বাইরে সফেদ তুষারের রাজ্যে এক জোড়া এলগ্ বাঁধ ভাঙা জ্যোৎস্নায় দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে অনুচ্চারিত ভাষায় কত কিছুই না বলে যায়। কেবিনের ভেতর আমি আর রয়, সব কিছু এত মায়াময়; এত অপার্থিব; সঙ্গীকে মনে হয় সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত জন, নিজেকে দুঃখ বিহীন একজন! আমাদের ঘিরে যেন বিস্ময়কর এক কুহকী হাওয়া ঘুরতে থাকে, এত অল্প কিছুতে সুখ লুকিয়ে ছিল, আনন্দ লুকিয়ে ছিল? আমার ভেতর দীর্ঘ বছরের জমে থাকা বরফের চাঙর ভাঙতে থাকে আর পরতে পরতে আমি নিজের ভেতর নিজের উষ্ণতা ফিরে পেতে থাকি। আমি অনুভব করি, আমি কাঁদছি...আমি পরিচিত রাস্তা ধরে ছুটে চলছি, রাস্তার দু’পাশের তুষার আবৃত ঘুমিয়ে থাকা ফার্মগুলো তখনও জেগে ওঠেনি। রাস্তার বেঁধে দেওয়া গতিসীমার চেয়ে জোরে গাড়ি চালাই, আমাকে ফিরতে হবে। আমাকে কোথাও ফিরতে হবে, খুব তাড়া আছে আমার।