মানুষের হারিয়ে যাবার শব্দ আছে। আমি টের পাই। যেদিন শিপ্রার সাথে আমার শেষ দেখা হলো, সেদিন ক্যাফের বাইরে স্ট্রিট-লাইটের আলোয় গলে যাওয়া সূর্য দেখতে দেখতে আমি প্রথম টের পাই—হারিয়ে যাবার শব্দ। এ অনেকটা মাকড়সার জাল বুনবার শব্দের মতো, আমি ঠিক বোঝাতে পারব না।শিপ্রা বলেছিল, যে শহরে তুষারপাত হয়, সে শহর আমার খুব প্রিয়, জানিস তো তুই।আমি ওর মুখোমুখি চুপচাপ বসেছিলাম।আর টের পাচ্ছিলাম একটি মাকড়সা আমার পুরোনো ক্যানভাসে জাল বুনে যাচ্ছে—ফিট্ ফিট্ ফিট্ ফিট্।সেদিনের পর শিপ্রাকে আর দেখিনি।শিপ্রার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল অদ্ভুত। না প্রেম, না অপ্রেম, না বন্ধুত্ব। কিছু একটা ছিল। ঠিক কী ছিল আমি বোঝাতে পারব না। নারী-পুরুষের সব সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা আমার আজকাল অশ্লীল মনে হয়।একসময় আমরা শহরে রিকশা চড়ে ঘুরতাম, চোখের সামনে যা কিছু পড়তো তাদের নতুন নতুন নাম দিতাম। এ নামকরণের খেলা শুরু হবার পেছনে একটা কাহিনি আছে।শিপ্রা গাছ ভালোবাসতো। প্রায় সব গাছ মেয়েটা চিনতো। একবার কৃষ্ণচূড়ার মতো দেখতে একটা গাছ দেখলাম পলাশীর মোড়ে। তাতে তখন বেগুনি রঙের ফুল ফুটেছিল।আমি শিশুতোষ কৌতূহলে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী গাছ রে?
শিপ্রা আমাকে অবাক করে দিয়ে বলেছিল, জানি না।এ রকম কখনো হয়নি আগে। ভেবে বলেছিলাম, নামহীন গাছ দেখতে ভালো লাগছে না। এটার একটা নাম দে।তুই দে, কবি-সাহিত্যিক মানুষ তুই।আচ্ছা। এটার নাম তবে শিপ্রাচূড়া।শিপ্রা হঠাৎ তার তলোয়ারের মতো দেখতে ভ্রূ কুঁচকে রেগে গিয়ে বলল, খুব বাজে একটা নাম।তারপর রিকশাচালককে থামাল। আর হাসতে হাসতে বলল, মামা, এই মালটাকে রিকশা থেকে ফেলে দেন তো।একবার গুলশানের ক্যাফে ডে লা ম্যাডেলাইনে আমি আর শিপ্রা রাত দু'টো পর্যন্ত বসে বসে অয়েল প্যাস্টেল দিয়ে একটা ছবি এঁকেছিলাম। মৃদু হলুদ আলো আর মুনলাইট সোনাটার সুর আমাদের দু'জনকে ধ্যানস্থ করে তুলেছিল।১৬"×১৬" সাইজের একটা হ্যান্ডমেইড কাগজ। কিছুক্ষণ আমি আঁকি, ও ভাবে আঁকা দেখতে দেখতে। আবার আমারটা শেষ হলে ও আঁকে, আমি দেখি আর ভাবি। আগে থেকে কোনো পরিকল্পনা থাকে না যে কী আঁকব। আমি শুরু করেছিলাম একটা নক্ষত্র পতিত হচ্ছে—এরকম দৃশ্যায়ন করে। তারপর পতনের নিচে ও আঁকলো বিরানভূমি, নিঃসঙ্গ রাখাল। আমি খালি জায়গায় আঁকলাম চারপাশের কিছু মানুষ, কোট-শার্ট-প্যান্ট পরা। গরুর মতো ঘাস খাচ্ছে।ছবি আঁকা শেষ হলে পেছনের টেবিল থেকে এক বিদেশি বুড়ো লোক আমাদের কাছে এলো। ইশারায় ডাকল ম্যানেজারকে।তারপর ফরাসি ভাষার কী কী যেন বলল। ম্যানেজার হেসে আমাদের বলে, আপনাদের কপাল খুব ভালো। উনি এই পেইন্টিংটা কিনতে চান। ১ হাজার ডলার দেবেন। আপনারা চাইলে দাম আরো বাড়াতে পারেন। শুনে আমার হৃৎপিণ্ড ধুকপুক ধুকপুক করছিল। বলে কী! মাত্র দু-তিন ঘণ্টা বসে নিতান্ত শখের বসে কিংবা পাগলামোয় আঁকলাম, তা নাকি লাখেরও বেশি দামে বিক্রি করা যাবে! আমার টাকার দরকার ছিল প্রচণ্ড। শিপ্রা জানে সব, ওর কাছ থেকেও কয়েকদিন আগে ধার করেছি হাজার পাঁচেক। আবার ওরও যে এখন খুব সচ্ছল অবস্থা তাও নয়। ভেবেছিলাম শিপ্রা খুশি হয়েই রাজি হবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ও বলল, এবং সেটা বেশ রেগে গিয়েই, আপনি কি আমাদের চারুকলার কোনো হাভাইত্যা আর্টিস্ট পাইছেন?ভাষা ব্যবহারে প্রমিত থেকে বাইরে বের হয়ে আসা মানে, শিপ্রার ক্ষেত্রে, ওর মনোজগতে প্রলয় ঘটে গেছে।ম্যানেজার আমতা আমতা করছিল; ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া কিছু মুহূর্ত বরফের টুকরোর মতো জমাট বেঁধেছিল তখন।আমরা বিল মিটিয়ে বের হয়ে গিয়েছিলাম।বাইরে তখন স্ট্রিট-লাইটের সারি জ্বলছে। আর ইতিউতি প্রাইভেট কার বেরিয়ে যাচ্ছে শাঁ শাঁ করে। আকাশের দিকে তাকিয়ে আমার মন ভালো হয়ে গেল। ঘন রাত্রির চাদরে জোনাকির মতো অজস্র নক্ষত্র বিছিয়ে রয়েছে। আর কিছু নক্ষত্র নড়বড়ে। যেন এখনি পড়ে যাবে পৃথিবীর মাটিতে। পাশে ফিরে দেখি সেও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ...এ এক আজগুবি রাত, যে রাতে আলোর দূষণ ঘটা শহরেও নক্ষত্রের খেলাধুলা দেখা যায়। কান পাতলে নক্ষত্র পতনের শব্দও শোনা যেতে পারে।শিপ্রা তখন বলল, আমার না ভুতুকে দেখতে মন চাচ্ছে।হঠাৎ ভুতুকে কেন?এরকম এক রাতে সিটি কর্পোরেশনের লোকেরা ওকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, কত ঝামেলা করেই না ছাড়ালাম জানিস তো।আমাদের গন্তব্যের অভিমুখ তখন সরে গেল টিএসসির দিকে। ওখানে গিয়ে শিপ্রা চেঁচাতে লাগল, এই ভুতু এই!এভাবে চেঁচাতে চেঁচাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেট পর্যন্ত এলো, এবং গেট দিয়ে হেলতে দুলতে ছুটে এলো বিশাল কুকুরটা।তুই ভীষণ ঢিলা হয়ে গেছিস ভুতু।হাঁটু গেড়ে বসে ভুতুর মাথা চুলকে আদর করতে করতে বলেছিল সে। আর আমার দিকে ফিরে বলল, ভুতুর না অনেক বয়স হয়ে গেছে।ভুতুর পাশের ফুটপাতে শিপ্রা কাঁধের ব্যাগটা রেখে ভুতুর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, রাতে খাওয়া হয়েছে তোর?ভুতু ওর মুখ চাটতে লাগল। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, মেয়েটার একটুও ঘেন্না হয় না এখন? তার সমস্ত পশনেস কি এখানে এলে বিলীন হয়ে যায়?তোর রাতে খাওয়াদাওয়া হয়নি বুঝেছি। কী করা যায় বলতো! আচ্ছা আমাকে খা। তোর পূর্বপুরুষরা একসময় রসিয়ে রসিয়ে মানুষের মাংস খেত।শিপ্রাকে খুশি করতে আমি ভুতুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে গেলাম, কিন্তু কুকুরটা তড়িৎ গতিতে মাথা সরিয়ে নিল।বললাম, আচ্ছা শিপ্রা, কুকুররা কি মানুষের ভালোবাসা বোঝে? কে ভালোবেসে আদর করে, আর কে মন্দবেসে, তা বোঝা যায়?অবশ্যই যায়। যেমন এখন তোর মনে ময়লা জমে আছে। আর তুই ভুতুকে ছুঁয়েছিস।
ওর কথা শুনে হাসি পেলো। ভুতুর শরীর নোংরা, গা থেকে গন্ধ বের হচ্ছে, চার পায়ে কাদা জমে আছে, আর শিপ্রা প্রশ্ন তুলছে আমার মনের ময়লা নিয়ে।শিপ্রার ব্যাগটা কাত হয়ে গেছিল; এতে আমাদের আঁকা ছবিটা আংশিক বেরিয়ে এসেছিল। ভুতু ওদিকে ফিরে তার মাতৃদেবীকে খুশি করতে ছবিটা সামনের দু'পা দিয়ে বের করল, আমি বাঁধা দেওয়ার আগেই দেখি পায়ের কাদায় ছবিটি গেল নষ্ট হয়ে।হঠাৎ আমার শিপ্রার প্রতি গাঢ় অভিমান জমলো। তখন বিক্রি করে দিলে ভালো হতো না? এতগুলো টাকা।ভুতু ছবিটা মুখে ধরে শিপ্রার কাছে নিয়ে এলে সে হেসে বলেছিল, দ্যাখ দ্যাখ ইমতু, ছবিটা এবার পরিপূর্ণ হলো। আমাদের আঁকায় ভুতুও অংশ নিল। দারুণ না! এটা আমি বাসায় বাঁধাই করে রাখব। ভুতু আর তুই, আমার প্রিয় দুইজনের সঙ্গে লাইফ টাইম একটা স্মৃতি হবে এটা দেখিস।আমার সমস্ত অভিমান ঝরে পড়লো ফুল হয়ে উদ্যানের নিমগাছটার নিচে।একবার আমার ন্যুড আর্টের সাবমিশন ডেটের আগের দিন উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরছি আজিজ মার্কেটের সামনে। একজনের সঙ্গে কথা হয়েছিল, যে মডেল হতে ইচ্ছুক টাকার বিনিময়ে, নাম বললে চারুকলার অনেকেই চিনতে পারবে। কিন্তু সেই নারী বেশি টাকার লোভে পড়ে আরেকজনের কাজে চলে গিয়েছিল৷ তখন দেবীর মতো আবির্ভূত হলো শিপ্রা। উলুখড়ে গিয়েছিল বই কিনতে। হাতে দেখি মিলান কুন্দেরার ‘দ্য আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং’ উপন্যাসের আসল কপি। আমাকে দেখে চিৎকার দিল, কী রে ভবা পাগলা, এ অবস্থা কেন তোর!
বললাম সমস্যার কথা। আমাকে অবাক করে দিয়ে সে নিজেই মডেল হতে চাইল। বিহ্বলের মতো ওকে নিয়ে এলাম আজিমপুরে আমার চিলেকোঠার একরুমের ফ্ল্যাটে।ওই একটা ঘরেই আমার আঁকার স্টুডিয়ো, খাওয়া-ঘুমের বন্দোবস্ত আর হতাশা যাপনের ক্ষেত্র তৈরি করে নিয়েছিলাম।আজিমপুরের নীচু ছাদ ঘরে একটি টুলের ওপর নেফারতিতির চাহনি ছুড়ে এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে বসল শিপ্রা। আমি কয়েক মিনিট স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম। জানালা দিয়ে দুপুরের নরম আলো বেড়ালের মতো ওমলোভী হয়ে শিপ্রার স্তন, নাভি আর উরু জুড়ে চুইয়ে পড়ছিল। আর মুখ হালকা ছায়াময়।মনিকা বেলুচ্চিকে অতিক্রম করে যাওয়া সৌন্দর্য শিপ্রার—মহাসমুদ্রের তলদেশে স্তব্ধ পড়ে থাকা পান্নার নেকলেসের মতো; গভীর আর রহস্যে ভরা।আমি আঁকছি ঘোরগ্রস্তের মতো। প্রায় অর্ধেকটা আঁকা শেষ। এ সময় ডিভানে রাখা শিপ্রার ফোনটা বেজে উঠল। একবার...দু'বার... তিনবারের বেলায় ওকে বললাম, ফোনটা ধর।ও বিরক্তি নিয়ে উঠে ধরল। ওপাশ থেকে কেউ একজন প্রশ্ন করেছিল, এর উত্তরে ও বলে যাচ্ছিল—ইমতুর বাসায়...না, ওর কালকে ন্যুড অ্যাসাইনমেন্ট সাবমিট করার লাস্ট ডেট, মডেলও পাচ্ছিল না, তাই আমিই এলাম...না, না..আরে ছেলেটার জন্য মায়া লাগছিল ভীষণ—দেখো আবিদ, বিষয়টা খুব সরল, এত জটিলভাবে দেখার কিছু নাই।আবিদ ছিল শিপ্রার প্রেমিক। বুয়েটে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র। শিপ্রার সঙ্গে সম্পর্কে আসার আগে ওর পেছনে হত্যে দিয়ে পড়েছিল দীর্ঘদিন।শিপ্রা আবার বসেছিল টুলে এসে। আমি বুঝছিলাম ওর মনে নেমে এসেছে বিষাদ রজনি। কিন্তু কিছু না বলে কাজটা শেষ করলাম। অর্ধেকটা আঁকার পর যতটা ভালো মনে হচ্ছিল, শেষ করার পর ততটাই বিলো অ্যাভারেজ লাগছিল। আসলে জীবন্ত কিছুকে ক্যানভাসে ফোটাতে হলে সাবজেক্টের মনের রোদ বৃষ্টিও ধর্তব্যের মধ্যে চলে আসে।শিপ্রাকে লেমনেড বানিয়ে দিলাম। ও ততক্ষণে জামাকাপড় পরে ছাদের রেলিঙের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তখন সাঁঝবেলা। অনতিদূর মন্দির থেকে ভেসে আসছিল ধূপের গন্ধ। শিপ্রার পাশে ফিরে দাঁড়ালে ও মেঘার্দ্র স্বরে বলল, জানিস ছোটোবেলা থেকে আমার একটা গোপন ফ্যান্টাসি ছিল যে এক কৃষকের বউ হব। টিনের একটা ঘর থাকবে আমাদের। দুপুরে বরের জন্য আতপ চালের ভাত আর কইমাছ রেঁধে গামছায় বেঁধে ক্ষেতে নিয়ে যাব—খাইয়ে দিব নিজের হাতে তুলে।আমি বলেছিলাম, এবং টিনের ঘরের পাশে বয়ে যাবে একটি মিষ্টি নদী। নাম হতে পারে রূপশালি বা সাগরপর্ণা।শিপ্রা অবাক হয়ে বলল, আমার কল্পনায় নদীও ছিল, তুই বলে দিলি কীভাবে!কারণ, আমারও ফ্যান্টাসি ছিলো কৃষক হবার। নদীর পাশে ছোট্ট ঘরের বাড়ি আর একখানা চাষের জমি। এই তো জীবন।শিপ্রা চোখ কটমট করে বলল, আমাকে পটাতে এটা তুই এখন বানালি। ইশ, সে নাকি কৃষক হবে, অথচ আর্টিস্ট হইতে প্যারিস যাওয়ার ধান্দা করতেছে।শিপ্রার কথা শুনে মনটা ঈষৎ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। শিপ্রা বুঝতে পেরে শুনিয়েছিল একজোড়া রবীন্দ্র সংগীত, যদিও আমার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল স্প্রিং ওয়াল্টজের বিষণ্ন সুর। ওকে রিকশায় তুলে দিতে নিচে এসেছিলাম। সিঁড়ির অন্ধকারে আমাকে জড়িয়ে ধরে শিপ্রা আচমকা চুমু খেল, একদম জাপটে ধরে। পৃথিবী তখন তার ঘূর্ণন থামিয়ে মহাশূন্যের অতল কুয়ায় পড়ে যাচ্ছিল বলে বোধ হচ্ছিল আমার। চুমুতে নোনতা স্বাদ, টের পাচ্ছিলাম শিপ্রার চোখের লুকানো সমুদ্র থেকে কয়েক ফোঁটা জল মুখ বেয়ে গড়িয়ে নামাটা।তারপর গলিটা দিয়ে দু'জনে হাঁটছিলাম।শিপ্রা বলেছিল, আমার নগ্ন শরীর দেখার পরও তোর কোনো কামনা-বাসনা জাগেনি, তুই অনেক বড়ো শিল্পী হতে পারবি।ধুর। না পাওয়ার সাথে বড়ো শিল্পী হবার কী সম্পর্ক?আছে রে ভবাপাগলা। তোর ধ্যানে তখন কামের চেয়ে সৃষ্টি প্রধান হয়ে ধরা দিয়েছে।বুঝলি কীভাবে?তোর চোখ দেখে।আমি মনে মনে খানিক হাসলাম। যাক, শিপ্রাকে সর্বাংশে বুদ্ধিমতী ভাবার কোনো কারণ নেই। সেও ভুলভাল ভাবে। ও জানে না, একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমার মতো অজস্র মানুষ ইন্দ্রিয়ের অভিসন্ধি চোখের ভাষায় মিথ্যা অনুবাদ করতে বেশ পারঙ্গম।বলেছিলাম শুরুতে, আমার জীবন থেকে মানুষের হারিয়ে যাবার শব্দ আমি শুনতে পাই। বেশ আগেই পাই। অনেকটা নস্ট্রাডামুসের মতো। শিপ্রা যেদিন বলেছিল তুষারপাতের শহর তার খুব প্রিয়, সেদিন পুরো সন্ধ্যা পর্যন্ত আমার কানে বেজেছিল এই শব্দ। কিছুটা মাকড়সার জাল বুনবার শব্দ, কিছুটা যেন মন্দ্রসপ্তক।শিপ্রা আমাকে না জানিয়েই বিয়ে করে নিয়েছিল এক ফরেন ক্যাডার অফিসারকে। রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে ছিল তার পোস্টিং। বরের সাথে সেই শহরে চলে যাবার কয়েক মাস পর জানতে পারি এ ঘটনা।আমার তখন কেমন লেগেছিল, সে অনুভূতি বোঝাতে পারব না, কেবল মনে হচ্ছিল পেরেক ঢুকিয়ে কান দুটো বধির করে ফেলে ভ্যানগগের মতো আমি একটি নতুন ক্যানভাসে মন দিই; কেননা আমি আর কখনো মানুষের হারিয়ে যাবার শব্দ শুনতে চাই না।