‘পুস্তকালয়’ শিরোনামে ঢাকার গ্রিন রোডের বৃত্ত আর্টস ট্রাস্ট গ্যালারিতে গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছিল কর্মশালা-ভিত্তিক যৌথ প্রদর্শনী। প্রদর্শনী কিউরেট করেন মোকাদেসুর রহমান ও মাহমুদা সীদ্দিকা।
গ্যালারির দরজা খুলে আমরা ঢুকে পড়ি ভিন্ন ধারার এক গ্রন্থাগারে। যেখানে পাঠক, বলা ভালো দর্শকের জন্য আলাদা আলাদা করে খুলে সাজিয়ে রাখা হয়েছে সারি সারি বই। বইগুলো কি পড়ার জন্য, নাকি দেখার জন্য, নাকি ছুঁয়ে দেখার জন্য?! ছুঁয়ে দেখা মানে স্পর্শ করা নয়, শিল্পীর সাথে ভাবের আদান-প্রদান।
এই প্রদর্শনীর বইয়ের ভাষা শুধু শব্দের গঠনে তাৎপর্যপূর্ণই নয়, বরং অনেক বেশি দৃশ্যগত। যা নীরবে বলে যায় যাপিত জীবন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সীমানার প্রহসন, ভাষার সীমাবদ্ধতা, সঞ্চিত অভিজ্ঞতা বা ফিসফিস করে বেজে ওঠা স্মৃতির তরঙ্গ।
কিউরেটর মাহমুদা সীদ্দিকা বলেন, ‘পুস্তকালয়’ শিল্পগ্রন্থের জগতে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সম্মিলিত প্রয়াস। দীর্ঘ যাত্রার এই কর্মশালা শুরু হয় ২০২২ সালে বৃত্ততে। একটি বই নির্মাণ কর্মশালার মাধ্যমে এই প্রকল্পের সূচনা হয়। ক্রমে এই গ্রন্থগুলো সময়, স্থান ও অভিজ্ঞতার সীমানা পেরিয়ে বহুরৈখিক কণ্ঠে পরিণত হয়েছে। অবশেষে তারা আবার ফিরে এসেছে নিজেদের উৎপত্তিস্থলে। এখানে বই শুধু পাঠ্য বস্তু নয়, বরং এক পরীক্ষাধর্মী শিল্পমাধ্যম। এটি এমন এক পরীক্ষাগার হয়ে ওঠে, যেখানে শিল্পীরা বইকে পুনরায় কল্পনা করেন পাঠযোগ্য নয়, বরং ছুঁয়ে অনুভবযোগ্য এক অবজেক্ট হিসেবে।
বৃত্ত আর্ট ট্রাস্ট কিউরেটরিয়াল জায়গা থেকে বরাবরই বিকল্প চিন্তাকে ধারণ করেছে। ‘পুস্তকালয়’ সেই ধারাবাহিকতারই এক সম্প্রসারণ, বৃত্তর এই সম্মিলিত চেতনায়, বই শুধুই একটি মূল্যবান বস্তু নয়; বরং এটি একটি জীবন্ত রূপ, যা ভাঁজ করা যায়, সেলাই করা যায়, আঁকিবুঁকি করা যায়।
কিউরেটরদের পাশাপাশি এই ব্যস্ত সময়েও কাজ আলাপ করার সুযোগ করে দেন কয়েকজন শিল্পী।
শিল্পী তৈয়াবা বেগম লিপি বলেন, ‘এখানকার অনেকগুলো কাজই আগে ইন্ডিয়া আর্ট ফেয়ারে এবং পরে সেরেনডিপিটি আর্ট ফেস্টিভ্যালে গিয়েছে। সেখানে খুব সুন্দর প্রেজেন্টেশন ছিল। আমাদের বড়ো একটা ইন্সটলেশন ছিল। তাতে বইগুলো ছিল ইন্সটলেশনের অংশ।’
স্মৃতি ও স্থানের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে শিল্পী আনিসুজ্জামান সোহেল বলেন, ‘আমরা সকলেই আমাদের জীবনে স্থানচ্যুতির স্মৃতি বহন করি। যা খণ্ড খণ্ড চিত্র হয়ে থেকে যায়।’
শিল্পী শিমুল সাহা তার ‘ভাস্বর’ বইটি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ‘আকৃতি ও ব্যবহারিক দিক থেকে একটি জানালা এক এক মানুষের কাছে এক এক ধরনের অর্থ প্রকাশ করে। এটি বন্ধ ও খোলা অনুযায়ীও এর অর্থ পরিবর্তিত হয়।’
তিনি জানান, এই প্রকল্পে কাজ করার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার ১৫ জন ভিন্ন ভাষাভাষীর লেখক তাকে সহযোগিতা করেছেন।
শিল্পী শারদ দাশ ‘মায়ের ভাষাই শিখি’ নামে একটি প্রাক-প্রাথমিক বই তৈরি করেন তার নিজস্ব চিন্তা থেকে।
তিনি বলেন, ‘তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ম্রো ভাষায় বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়েছিল, তবুও ম্রো বর্ণমালার সাথে পরিচিত করার এবং একই সাথে বাংলা ও ইংরেজি বর্ণমালা শেখানোর জন্য একটি মৌলিক বইয়ের প্রয়োজন ছিল। তাই এমন একটি বই তৈরির উদ্যোগ নেই। যা ছিল এই আর্ট ক্যাম্পের সময় শুরু হওয়া প্রকল্পের ফলাফল।’
এই বইটি মাতৃভাষার গুরুত্বের উপর জোর দিয়ে ম্রো জনগণের ভাষা, জীবনধারা ও সংস্কৃতি উপস্থাপন করে।
শিল্পী জানান, বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর ভাষা সুরক্ষা ও সংরক্ষণ কমিটি বইটিকে ম্রো শিশুদের জন্য একটি প্রাক-প্রাথমিক বই হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাকে পুরস্কৃত করেছেন।
শিল্পী ফারাহ নাজ মুন বলেন, “আমার একটি বইয়ের নাম ছিল, ‘বেড়া’। আমি তখন মাইগ্রেশন বা বর্ডার নিয়ে অনেক বইপত্র পড়ছিলাম। ঋত্বিক ঘটকের যমজ ভাই-বোনের গল্প পড়ছিলাম। এরকম আরো গল্প আমাকে করুণভাবে ছুঁয়েছিল। সেসবই আমার ইন্সপিরেশন।’
প্রদর্শনীতে আরো অংশগ্রহণ করেছেন মাহবুবুর রহমান, ইয়াসমিন জাহান নূপুর, শিমুল দত্ত, ফারহানা ফেরদৌসী, জুয়েল এ রব, ফারজানা হক, মোকাদেসুর রহমান ও মাহমুদা সীদ্দিকাসহ ২৩ জন শিল্পী।
প্রদর্শনীটি শেষ হয় ১৮ অক্টোবর।