পাকিস্তানকে কাছে টানছেন ট্রাম্প, নজর রাখছে ভারত

পাকিস্তানকে কাছে টানছেন ট্রাম্প, নজর রাখছে ভারত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন গতি পাচ্ছে। গত সপ্তাহে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল অসীম মুনিরের হোয়াইট হাউজ সফর এবং ট্রাম্পের প্রতি তাদের প্রশংসাসূচক বক্তব্যে এই ঘনিষ্ঠতা স্পষ্ট হয়েছে। এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল আরও অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বৃদ্ধি। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে এ খবর জানিয়েছে।

গত জুলাই মাসে পাকিস্তানের জন্য শুল্ক হার কমানোর বিনিময়ে জ্বালানি, খনিজ ও কৃষি খাতে মার্কিন বিনিয়োগের যে চুক্তি হয়েছিল, তার জন্য শরিফ হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান।

ওভাল অফিসের বৈঠকের ছবি প্রকাশ করেছে হোয়াইট হাউজ। সেখানে দেখা গেছে, সেনাপ্রধান মুনির ট্রাম্পকে বিরল মৃত্তিকা খনিজে ভরা একটি বাক্স উপহার দিচ্ছেন। চলতি বছরে এটি মুনিরের দ্বিতীয় যুক্তরাষ্ট্র সফর।

যদিও পাকিস্তানে বিশাল তেলের মজুদ থাকার ট্রাম্পের দাবি নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু জুলাই মাসে চুক্তি ঘোষণার সময় ট্রাম্পের মন্তব্যে নয়াদিল্লির প্রতি খোঁচা ছিল স্পষ্ট। তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন যে ভারত ‘একদিন পাকিস্তানের তেল কিনতে পারে।’

গত সপ্তাহে শরিফ ট্রাম্পকে ‘শান্তির মানুষ’ হিসেবেও আখ্যা দেন এবং মে মাসে ভারত-শাসিত কাশ্মীরে ভারতীয় পর্যটকদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার ফলে সৃষ্ট স্বল্পকালীন সংঘাতের পর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি সহজ করতে ট্রাম্পের ভূমিকার প্রশংসা করেন। অন্যদিকে, ভারত অবশ্য যুদ্ধবিরতিতে ট্রাম্পের কোনও ভূমিকা থাকার কথা অস্বীকার করেছে। মুনির তো ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য বলেও মন্তব্য করেছেন।

হোয়াইট হাউজে পাকিস্তানের এই উত্থান এমন সময়ে ঘটলো যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক ক্রমশ নিম্নমুখী। ট্রাম্প ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখবেন বলে যে আশা ছিল, তা ফিকে হয়ে এসেছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের তুলনায় বর্তমানে দুই নেতার মধ্যে দূরত্ব অনেক বেশি বলে মনে হচ্ছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার তেল আমদানি অব্যাহত রাখায় ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ৫০ শতাংশ শুল্ক বজায় রেখেছে, যা দুদেশের বাণিজ্য সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।

মার্কিন-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতার কারণে ভারতের নীতিনির্ধারক মহলে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নয়াদিল্লির থিংক ট্যাংক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (ওআরএফ) স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের প্রধান হর্ষ পন্ত বলেন, যদি পাকিস্তান মার্কিন কৌশলের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তবে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির হিসাব পাল্টে যেতে পারে। পন্তের মতে, যদি ভারত দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে, তবে ইন্দো-প্যাসিফিকে ভারত কীভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে, তা মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হবে।

এর ফলে কোয়াড অংশীদারত্বসহ চীনের প্রভাব মোকাবিলায় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ উদ্যোগগুলোও প্রভাবিত হবে।

ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে আরও জটিল করেছে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তি। এতে ‘যেকোনও একটি দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসনকে উভয়ের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে গণ্য করা হবে’ এমন একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের এই জোট ভারতের জন্য কৌশলগত উদ্বেগের কারণ।

তবে, পাকিস্তানের সাবেক ভারতীয় দূত অজয় বিসারিয়া মনে করেন, ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা এখনই খুব বেশি চিন্তিত নন। তিনি বলেন, পাকিস্তান নিজের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব—এই তিন প্রধান আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকের কাছে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখতে সচেষ্ট।

বিসারিয়া আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের বর্তমান এই মৈত্রী সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যাবে বলে ভারতের নেতৃত্ব আত্মবিশ্বাসী। পাকিস্তানের এই ভারসাম্য বজায় রাখার সক্ষমতার স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কে হতাশার অনিবার্যতাকে বিবেচনায় নিয়ে ভারত এই কৌশলগুলোর প্রতি সতর্ক আছে, কিন্তু অত্যন্ত উদ্বিগ্ন নয়।

যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত মীরা শঙ্কর মনে করেন, ট্রাম্প ভারত ও পাকিস্তান উভয়কেই লেনদেনভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেন, যা মূলত অর্থনৈতিক লাভের দিকে নিবদ্ধ।

তিনি সতর্ক করে বলেছেন, পাকিস্তান ছোট ছোট সুবিধা দিয়ে নিজেদের ‘প্রয়োজনীয়’ প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্রের এই অগ্রাধিকারকে কাজে লাগাতে শিখেছে। তবে শঙ্কর মনে করেন যে, মার্কিন-পাকিস্তান সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত অস্থির ও অনির্ভরযোগ্য।

জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ডিন অমিতাভ মাত্তু বলেন, ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক একটি চক্রাকার ঘটনা। স্নায়ুযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রতিবারই যুক্তরাষ্ট্র ‘কার্যকরী কারণে’ পাকিস্তানকে পুনরায় আবিষ্কার করেছে।

তিনি আরও বলেন, ওয়াশিংটন এখন আগের চেয়ে পাকিস্তানের দ্বৈততা সম্পর্কে বেশি অবগত এবং ইন্দো-প্যাসিফিকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ভারতের প্রতি গভীরভাবে নিবেদিত। মাত্তুর মতে, ইসলামাবাদের প্রতি ওয়াশিংটনের এই অনুরাগ নয়াদিল্লিকে পরিত্যাগ করা নয়, বরং একটি অস্থির অঞ্চলে হেজিংয়ের কৌশল, যদিও ট্রাম্প প্রশাসন ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

 

Comments

0 total

Be the first to comment.

অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন: তাঁবুতে চলছে নেপালের সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম BanglaTribune | এশিয়া

অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন: তাঁবুতে চলছে নেপালের সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম

কাঠমান্ডুতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে প্রধান ভবন ধ্বংস হওয়ার পর নেপালের সুপ্রিম কোর্ট রবিবার থেকে নিজেদের...

Sep 14, 2025

More from this User

View all posts by admin