অপারেশনে চোখের রেটিনা কেটে ফেলার অভিযোগ, আই হসপিটালকে লিগ্যাল নোটিশ

অপারেশনে চোখের রেটিনা কেটে ফেলার অভিযোগ, আই হসপিটালকে লিগ্যাল নোটিশ

‘চিকিৎসা অবহেলায়’ শিশুর দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঘটনায় বাংলাদেশ আই হসপিটাল অ্যান্ড ইন্সটিটিউটের চেয়ারম্যান-ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ চার ডাক্তারকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দৃষ্টিশক্তি হারানো ৪ বছরের শিশু আবরার হোসেন ইভানের বাবা মো. সাইফুল ইসলামের পক্ষে আইনজীবী মবিনুল ইসলাম এ লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছেন।

লিগ্যাল নোটিশ পাওয়া চার ডাক্তার হলেন- বাংলাদেশ আই হসপিটাল অ্যান্ড ইন্সটিটিউটের কনসালটেন্ট, পেডিয়াট্রিক অ্যান্ড অপথালমোলজিস্ট ডা. কাজী সাব্বির আনোয়ার, কনসালটেন্ট, ভিট্রিও-রেটিনা স্পেশালিষ্ট অ্যান্ড ফ্যাকো সার্জন ডা. আইরিন হোসেন, চেয়ারম্যান ডা. মাহবুবুর রহমান চৌধুরী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. নিয়াজ আব্দুর রহমান।

লিগ্যাল নোটিশে বলা হয়, বরিশালের বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলামের ৪ বছরের শিশুসন্তান আবরার হোসেন ইভান জন্মলগ্ন থেকেই ডান চোখে একটু কম দেখতে পেতো। গত ৩১ জুলাই ছেলের চোখের চিকিৎসার জন্য তিনি বাংলাদেশ আই হসপিটাল অ্যান্ড ইন্সটিটিউটের চেয়ারম্যান ডা. মাহবুবুর রহমান চৌধুরী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. নিয়াজ আব্দুর রহমানের মালিকানাধীন ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডের হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তিনি কনসালটেন্ট, পেডিয়াট্রিক অ্যান্ড অপথালমোলজিস্ট ডা. কাজী সাব্বির আনোয়ারকে দেখান। তিনি তার চোখ পরীক্ষা করেন এবং শিশু ইভানের ডান চোখে ছানি পড়ে আছে বলে জানান। ডা. কাজী সাব্বির আনোয়ার অপারেশন করে চোখে লেন্স লাগানোর পরামর্শ দেন। তার কথায় শিশু ইভানের বাবা সাইফুল ইসলাম রাজি হন। সেই মোতাবেক তিনি ডাক্তারের দেওয়া সমস্ত রিপোর্ট পরীক্ষা করান।

নোটিশে আরও বলা হয়, ডিসচার্জ সার্টিফিকেট অনুসারে গত বছরের ১ আগস্ট ডা. কাজী সাব্বির আনোয়ার শিশু ইভানের ডান চোখের ছানি অপারেশন করেন এবং কিছু ঔষধপত্র লিখে দিয়ে ১৫ দিন পর দেখা করতে বলেন। এরপর শিশু ইভানকে নিয়ে তার বাবা ১৭ আগস্ট ডা. কাজী সাব্বির আনোয়ারকে দেখান। এবার তিনি একটি ড্রপ লিখে দিয়ে ২ সপ্তাহ পর ফের দেখা করতে বলেন। ২ সপ্তাহ পর ২ সেপ্টেম্বর তারা ফের ডা. কাজী সাব্বির আনোয়ারের সঙ্গে দেখা করলে তিনি এবার কোনও ঔষধ না দিয়ে চোখে লেন্স না লাগিয়ে একটি চশমা প্রেসক্রাইব করেন এবং শিশু ইভানকে তা সারাক্ষণ পরে থাকার পরামর্শ দেন এবং ৩ মাস পর দেখা করতে বলেন।

লিগ্যাল নোটিশ অনুসারে, সাইফুল তার শিশুসন্তান ইভানকে নিয়ে ৪ ডিসেম্বর ফের ডা. কাজী সাব্বির আনোয়ারের সঙ্গে দেখা করে চোখে লেন্স লাগানোর কথা বলেন। কিন্তু তিনি চোখে লেন্স না লাগিয়ে একই হাসপাতালের ডা. আইরিন হোসেনকে দেখাতে বলেন।  ওইদিনই সাইফুল তার শিশু সন্তানের সুচিকিৎসার জন্য ডা. আইরিন হোসেনকে দেখান। তিনি চোখ পরীক্ষা করে বলেন, ডাক্তার চোখের ছানি অপারেশন করার সময় রেটিনা কেটে ফেলেছেন। দ্রুত দু’একটা অপারেশন করতে হবে। এরপর তিনি যথাক্রমে ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর ও ২০২৫ সালের  ৮ জানুয়ারিতে ১ মাসের ব্যবধানে দুইবার অপারেশন করেন। একই চোখে বারবার অপারেশন করায় শিশু ইভান সবসময়ই চোখে তীব্র ব্যথা অনুভব করতো, তার চোখ ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে প্রায় বুজে যায়, চোখ দিয়ে অনবরত ফ্লুইড বের হতে থাকে।

ছেলের কষ্ট দেখতে না পেরে সাইফুল তার ছেলেকে নিয়ে এ বছরের ৪ মার্চ  ডা. আইরিন হোসেনের সঙ্গে দেখা করলে তিনি ট্রিটমেন্ট দিয়ে ডা. কাজী সাব্বির আনোয়ারের কাছে রেফার করেন। পরদিনই ৫ মার্চ রোগী নিয়ে দেখা করলে কোনও ট্রিটমেন্ট না দিয়ে ঈদ-উল-ফিতরের পর ফের ডা. আইরিন হোসেনের কাছে যাওয়ার জন্য রেফার করেন।

লিগ্যাল নোটিশে বলা হয়, এভাবে একটি শিশুর চিকিৎসার নামে তাকে নিয়ে তামাশা করা হয়েছে। গত ১৬ এপ্রিল শিশু ইভানকে নিয়ে ডা. আইরিন হোসেনের সঙ্গে দেখা করলে তৃতীয় দফা এবং সম্মিলিতভাবে চতুর্থ দফা অপারেশন করেন এবং ১ মাস পর দেখা করতে বলেন। চতুর্থ দফা অপারেশনের ১ মাস পর ১৯ মে সাইফুল শিশু ইভানকে নিয়ে ডা. আইরিন হোসেনের কাছে ফলোআপ ভিজিটে আসেন। তিনি ইভানের চোখে পঞ্চম দফা অপারেশনের পরামর্শ দেন। এতে ইভানের বাবা তাদের চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে সন্দিহান হন।

এরপর ইভানের বাবা বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পরদিনই হিকমাহ আই হসপিটালের একজন ফ্যাকো, ল্যাসিক ও রেটিনা সার্জনের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি তাকে জানান, বারবার অপারেশন করায় তার ছেলের চোখ চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে। এটি আর ভাল হবার নয়। অহেতুক আরও অপারেশন করে জটিলতা না বাড়াতে পরামর্শ দেন।

নোটিশে বলা হয়, সর্বশেষ গত ২ জুলাই শিশু ইভানকে নিয়ে তার বাবা ডা. আইরিন হোসেনের কাছে নিয়ে গেলে তারা সময়ক্ষেপণের ফের পুরাতন কৌশল অবলম্বন করেন। ডা. আইরিন হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. নিয়াজ আব্দুর রহমানের কাছে রেফার করেন। এভাবে একজন অসহায় শিশু রোগীর অতি মূল্যবান সম্পদ চোখের চিকিৎসা নিয়ে ছিনিমিনি খেলেন তারা।

নোটিশে অভিযোগ করা হয়, চোখের ছানি অপারেশন করতে গিয়ে অবহেলাভরে আনাড়ি হাতে ডা. কাজী সাব্বির আনোয়ার ৪ বছরের শিশু ইভানের চোখের রেটিনা কেটে ফেলেন। পরবর্তীতে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে সময়ক্ষেপণ করতে একের পর এক অপারেশন করে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা করে দীর্ঘ ১ বছর শিশু ইভানের পরিবার আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ইভানের চোখের আলো চিরতরে নিভে যায়। দীর্ঘ এক বছর অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও ব্যথা বেদনা-সহ্য করে সর্বোপরি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে চরমভাবে মানসিক হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে ইভান।

লিগ্যাল নোটিশে বলা হয়, দীর্ঘ এক বছর অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও ব্যথা বেদনা সহ্য করে সর্বোপরি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে চরমভাবে মানসিক হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়া ৪ বছরের শিশু ইভানের এই দৃষ্টিশক্তি হারানোর ক্ষতি টাকার অঙ্কে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। তবু এ ক্ষতি এক কোটি টাকা নিরূপণ করা হলো। লিগ্যাল নোটিশ পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে শিশু ইভানের বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে নতুবা অথবা শিশু ইভানকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে অথবা ক্ষতিগ্রস্ত শিশু ইভানের পরিবারের সঙ্গে গ্রহণযোগ্য কোনও আপোষ মীমাংসায় আসার কথা জানান ভুক্তভোগী ইভানের পিতা সাইফুল।

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin