রাজনৈতিক দলগুলোর কোনও কর্মকাণ্ড সমালোচনার মুখে পড়লে তারা নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। এই প্রবণতা দীর্ঘদিনের হলেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যাখ্যাটাকে যুক্তি দিয়ে ‘ন্যারেটিভ আকারে’ হাজির করা এবং যেকোনও ন্যারেটিভের ‘পাল্টা ন্যারেটিভ’ দাঁড় করিয়ে সমর্থকদের কাছে সাইবার লড়াইয়ের উপাদান হাজির করার চল বেশি দিনের নয়। যারা অনলাইনের এই দৌড়ে কাজ করেন খোদ তারাই বলছেন, বর্তমান সময়ে এই পক্ষ-বিপক্ষের এত রকমের ব্যাখ্যা অনলাইনে সব সময় হাজির থাকে যে তথ্য বিভ্রাটে পড়তে বাধ্য নেটিজেনরা। কারণ এই লড়াইয়ে সত্য মিথ্যা উভয়ই প্রতিষ্ঠা পায় যুক্তির জোরে। এগুলো নিয়ে অনলাইন অফলাইনে যারা কাজ করেন তারা বলছেন, অনলাইনে এখন যে ন্যারেটিভ–পাল্টা ন্যারেটিভের দৌড় চলছে, এখানে একটা কথা পরিষ্কার বুঝতে হবে, তথ্যের গতি সত্যের গতি নয়। রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ অবস্থান ব্যাখ্যা করবেই—এটা গণতান্ত্রিক কাঠামোর অংশ। কিন্তু সেটাকে যখন পরিকল্পিতভাবে ‘ন্যারেটিভ ইঞ্জিনিয়ারিং-এ রূপ দেওয়া হয়, তখন সাধারণ ব্যবহারকারী সত্য-মিথ্যার জটলায় পড়ে যায়।
কেবল রাজনৈতিক দলগুলো নয়, বর্তমান সরকারকেও অনেকগুলো পরিস্থিতিতে ন্যারেটিভ পাল্টা ন্যারেটিভের এই যোগাযোগে উপস্থিত হতে দেখা যায়। এরমধ্যে অনলাইনে নানা ইস্যুতে বেশ কয়েক রকমের অভিযোগ উত্থাপন হলে প্রধান উপদেষ্টার দফতর থেকে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয় সেটাকে ‘জরুরি’ ও প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা। তারা বলছেন, এটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পাল্টা ন্যারেটিভ তৈরি করে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি ড. আলী রীয়াজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত যৌন নিপীড়নের অনলাইন অভিযোগের পর ‘মেয়েটিকে চেনেন না’ বলে আলী রীয়াজের দেওয়া বিবৃতি সরকারের ফেসবুক পেজ থেকে ও প্রেস উইং থেকে দেওয়া নিয়ে সমালোচনায় নতুন পালক জন্ম দেয়। এরই মধ্যে শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) আলোচনায় আসে সরকারের পক্ষ থেকে গুগলের কাছে দুই শতাধিক সমালোচনামূলক কনটেন্ট সরানোর বিষয়। এদিন রাতে প্রেস উইং থেকে এর একটি ব্যাখ্যা পাঠানো হয়, যেখানে তারা হিসাব উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে বিস্তারিত জানান। সেটাকে বর্তমান সময়ের পাল্টা ন্যারেটিভেরই উদাহরণ বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
প্রেস উইংয়ের পাঠানো ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সরকার বাংলাদেশের নাগরিকদের এই নিশ্চয়তা দিচ্ছে যে, মিসইনফরমেশন, প্রোপাগান্ডা এবং মিসইনফরমেশন–কেন্দ্রিক চরিত্র হননের বাইরে দেশের কোনও পত্রিকার নিউজ, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত পোস্ট, ভিডিও কনটেন্ট, রিলস, অনলাইনে প্রকাশিত আর্টিকেল, অভ্যন্তরীণ কোনও সমালোচকের রাজনৈতিক সমালোচনামূলক কোনও কনটেন্ট সরাতে সরকার কোনও প্ল্যাটফর্মকে অনুরোধ করেনি।
আবার এও বলা হয়েছে যে, বর্তমান সরকার সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে আওয়ামী লীগের সিআরআই বা এ জাতীয় কোনও বটবাহিনী পরিচালনা করে না। বিটিআরসি বা এনটিএমসিসহ বাংলাদেশের কোনও এজেন্সি বা সংস্থা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের কনটেন্ট ডাউন করার ক্ষমতা রাখে না, সেজন্য যেকোনও অনুরোধ সোশ্যাল মিডিয়া ও টেক প্ল্যাটফর্মকে জানাতে হয়।
জানুয়ারি-জুন ২০২৫ সময়ে গুগলের ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট অ্যানালাইসিস করে দেখা যায়, ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে মোট ২৭৯টি অনুরোধ যায়। এটা আওয়ামী লীগ সরকারের জুন-ডিসেম্বর ২০২২ সময়কালে পাঠানো ছয় মাসের মোট সংখ্যা ৮৬৭ এর তিন ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম। কেন এ ধরনের ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে যেখানে আওয়ামী লীগের তিনভাগের একভাগ ভালো বা মন্দের হিসাব দিতে হবে উল্লেখ করে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বলেন, ‘আপনি কতটুকু স্বৈরাচার, আপনি কতটুকু দমন করেন তা পরিমাণগত দিয়ে হবে না, যাচাই করতে হবে গুণগত তথ্য দিয়ে- আপনি আসলে কী চান? যা দেখছি এই সরকার আগের সরকারকে অনুসরণ করতে বেশি আগ্রহী।’
ন্যারেটিভ-পাল্টা ন্যারেটিভ ছিল, আছে
অনলাইনে ন্যারেটিভ ও পাল্টা ন্যারেটিভ সব সময়ই ছিল। তবে গত দুই বছরে সেটি ধীরে ধীরে বেড়ে এখন শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা। তারা বলছেন, ন্যারেটিভ পাল্টা ন্যারেটিভ হলো এমন একটি বিষয় যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী একে অপরকে চ্যালেঞ্জ করে একই বিষয়ের দুই ধরনের ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে থাকে।
ন্যারেটিভ হলো যে বিষয়টা আপনি বিশ্বাস করাতে চান, তেমন একটা গঠনমূলক গল্প, ব্যাখ্যা বা ফ্রেম। আর পাল্টা ন্যারেটিভ হলো সেই গল্প ফ্রেমকে ভেঙে নতুন গল্পের যৌক্তিক অ্যাঙ্গেল বের করা। ফ্যাক্ট চেকিং, বিশ্লেষণ, বিকল্প ব্যাখ্যা—সবই পাল্টা ন্যারেটিভ। শঙ্কার হলো, কোন বিষয়টি সামনে আসবে আর কোনটি আড়ালে যাবে এটাও ন্যারেটিভের খেলা।
সাম্প্রতিক সময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ডাকা শাটডাউনের আগের দুই দিন ও পরের দিনজুড়ে অনলাইনে ছিল নানা পাল্টা ন্যারেটিভের ছড়াছড়ি। কে ককটেল মারছে ও আগুন দিচ্ছে সে নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে নানা তথ্যে একসময় মূলধারার গণমাধ্যমের বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কথা-ছবিই বিশ্বাস করতে শুরু করে জনগণ।
অনলাইনের ন্যারেটিভ–পাল্টা ন্যারেটিভের দৌড় বিষয়ে সাইবার বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘সাইবার জগতে আমরা যে ট্রেন্ড দেখি, তা হলো একটি ব্যাখ্যা প্রকাশের পর মুহূর্তেই তার বিপরীত ব্যাখ্যা হাজির হয়। এই প্রতিযোগিতা এমন পর্যায়ে গেছে যে এখন মানুষ ঘটনাকে নয়, ন্যারেটিভকে বিশ্বাস করতে বেশি ঝোঁকে। এতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে তথ্যের বিভ্রাট, যা সমাজে অবিশ্বাস ও বিভক্তি তৈরি করে।’
এই সিচুয়েশনটাকে ‘পোস্ট ট্রুথ ইরা’ হিসেবে এক্সপ্লেইন করা যেতে পারে উল্লেখ করে ফ্যাক্ট চেকার কদরুদ্দিন শিশির বলেন, “এখানে ‘অবজেক্টিভ ফ্যাক্ট’ এর চেয়ে ‘পারসোনাল ট্রুথ’ বা ‘পারসোনাল বিলিফ’ বেশি ক্রেডিবল হয়ে ওঠে। আমি ফ্যাক্ট চেক করে একটা অবজেক্টিভ তুলে ধরলাম। অনেকের কাছে এটার কোনও মূল্যই নাই। কারণ এটি তার পক্ষে যায়নি। বরং আরেকজন হয়তো একই বিষয়ে একটা অপিনিয়ন দিলো অথবা অসত্য একটা তথ্য দিলো; ওই ব্যক্তির কাছে এভিডেন্স বেইজড ফ্যাক্টের চেয়ে ওই অপিনিয়ন বা অসত্যটাকে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে। এইটা হয় যখন একটা সোসাইটিতে পলিটিকাল এবং আইডোলোজিক্যাল ডিভাইড অনেক ডিপ হয়ে যায়, কারও ওপর কারও বিশ্বাস আস্থা না, বরং ঘৃণা এবং সন্দেহ থাকে।”
কত রকমের ব্যাখ্যা, কোনটা নেবো
প্রতিদিন বাংলাদেশের আলোচিত খবর নিয়ে যেমন টেলিভিশনগুলো সংবাদ, সংবাদ বিশ্লেষণ ও টকশো প্রচার করছে তার বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে বসছেন নানান জন। একদিকে কেউ বলছেন, কী ঘটছে কেন ঘটছে; আরেকদিকে সেই বলাটাকে ধরে আরেকজন বলছেন- কেন সেই ব্যাখ্যা ঠিক না। আবার এটা গোষ্ঠীবদ্ধভাবেও হচ্ছে, যদিও তারা সেই যুথবদ্ধতা বুঝতে দিতে চান না। একদল একটা ন্যারেটিভ উৎপাদন করছে, আরেকগোষ্ঠী সেটাকে হয় ঠেকাতে বা সেটা কেন ঠিক না সেটা উৎপাদনে রোজ একটা সময় দিচ্ছে। মাঝখানে যারা দর্শক তাদের জন্য বিশ্বাস অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বটা বড় হয়ে হাজির হচ্ছে।
করণীয় বলতে গিয়ে তানভীর হাজান জোহা বলছেন, ‘এই পরিবেশে নেটিজেনদের মিডিয়া লিটারেসি বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। নইলে ন্যারেটিভের ভিড়ে সত্য হারিয়ে যেতে থাকে, আর রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তির নিরাপত্তা—সব কিছুই ঝুঁকির মুখে পড়ে।’