নেপালে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগামী বছরের মার্চে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে। দেশজুড়ে সহিংস বিক্ষোভে সরকার পতনের পর নতুন অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শুক্রবার রাতে এ ঘোষণা এসেছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, এ সিদ্ধান্ত সংবিধানবিরোধী এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস এ খবর জানিয়েছে।
শুক্রবার রাতেই প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাওডেল এক বিবৃতিতে বলেছেন, ২০২৬ সালের ৫ মার্চ ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এ সময়েই সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কিকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করানো হয়। ঘোষণায় বলা হয়েছে, ভোটের তারিখ নির্ধারণ করেছেন কার্কি নিজেই।
প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করলে সরকার কার্যত ভেঙে পড়ে। সোমবার থেকে চলা সহিংসতায় এখন পর্যন্ত ৫০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার জেরে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে রাজধানী কাঠমান্ডুসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। বিক্ষোভকারীরা সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ করে। বহু সরকারি নথি, কাগজপত্র ও ব্যাংক রেকর্ড পুড়ে গেছে।
পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এসেছে। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নীলকান্ত উপ্রেতি বলেন, এ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ সংবিধানবিরোধী। তবে কোনও সাংবিধানিক পথও খোলা নেই। কার্কি একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি হিসেবে এসব জানেন। তিনি চাইলে এর ব্যাখ্যা আরও ভালোভাবে দিতে পারতেন।
বিক্ষোভের সময় প্রেসিডেন্ট পাওডেলকে সেনারা নিরাপদে সরিয়ে নেয়। রাজনৈতিক নেতাদেরও সেনা ব্যারাকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। রাজধানীতে কারফিউ জারি ছিল টানা পাঁচদিন। সেনারা টহল দেয় শহরের প্রধান সড়কে।
তবে ছয় মাসেরও কম সময়ে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন নেপালের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা এখনও সেনা ব্যারাকে আটকে আছেন। কয়েকজন মন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, গত তিন দিন ধরে তাদের মোবাইল ফোনও সেনারা ব্যবহার করতে দিচ্ছে না। ফলে রাজনৈতিক সমন্বয় অচল হয়ে পড়েছে।
যদিও প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টারা বলছেন, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো কার্কির নিয়োগে সম্মত। কিন্তু শুক্রবার শপথ অনুষ্ঠানে তিন প্রধান দলের কোনও শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন না। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতেরা সেখানে উপস্থিত থাকলেও নেপালের নির্বাচিত নেতাদের অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
নেপালের তিন প্রধান দল—ওলির নেতৃত্বাধীন সিপিএন–ইউএমএল, নেপালি কংগ্রেস ও মাওবাদী সেন্টার—ভেঙে দেওয়া পার্লামেন্টে ২৭৫ আসনের মধ্যে ১৯৯ আসন দখল করে রেখেছিল। এখন সংসদ নেই, কার্যত সব রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে।
নেপালে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ায় আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে দেশটির অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল নেপালি কংগ্রেস। শুক্রবার রাতে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের ভার্চুয়াল বৈঠকে পার্লামেন্ট অবলুপ্তির বিপক্ষে কঠোর অবস্থান গ্রহণের সিদ্ধান্তে একমত হয়েছেন দলটির নেতৃবৃন্দ। দলের মুখ্যসচিব কৃষ্ণ প্রসাদ পাওদেলের ইস্যু করা এক বিবৃতিতে নেপালি কংগ্রেস বলে, পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া দেশের সংবিধানের কাঠামো এবং সর্বোচ্চ আদালতের দিকনির্দেশনার পরিপন্থি।
প্রধান দলগুলোর মুখপাত্ররা কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টও নিস্তব্ধ ছিল। মাওবাদী সেন্টার ভার্চ্যুয়াল বৈঠক করে। দলটির নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দাহাল এক বিবৃতিতে বলেছেন, পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা গুরুতর দ্বিমত পোষণ করছি।
নেপাল বার অ্যাসোসিয়েশনও বিবৃতি দিয়ে এ সিদ্ধান্তকে গণতন্ত্র ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ফেডারেল ব্যবস্থার জন্য ‘বিপজ্জনক আঘাত’ আখ্যা দিয়েছে। সংগঠনটি সংসদ পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে।
সহিংসতার পর সরকারি অফিসগুলোর স্বাভাবিক কাজকর্ম এখনও চালু করা যায়নি। রাজধানীর বহু ভবন ধ্বংস হয়েছে। মন্ত্রীরা কাজ করার মতো গাড়ি পাচ্ছেন না। নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, নিরাপত্তা ও অর্থায়ন এখন বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার উপ্রেতি বলেন, এটি চ্যালেঞ্জবিহীন নয়, তবে অসম্ভবও নয়। মার্চের তারিখ খুবই উচ্চাভিলাষী। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিতে হবে, আর সে জন্য সংসদের অনুমোদন দরকার। কিন্তু সংসদই নেই। তবু প্রস্তুতি দ্রুত শুরু করতে হবে।
তিনি বলেন, সব রাজনৈতিক শক্তিকে একত্রে নিয়ে আসাই হবে প্রথম অগ্রাধিকার। নির্বাচন আয়োজন সম্ভব করতে হলে অবিলম্বে সমন্বয়ের কাজ শুরু করা ছাড়া বিকল্প নেই।