নির্বাচনে নারীর প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিতের দাবি

নির্বাচনে নারীর প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিতের দাবি

‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংরক্ষিত আসনে নারীদের সরাসরিই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ করে দিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে উদারতার পরিচয় দিতে হবে। এখনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের উপেক্ষার বিষয়টি দেশের জন্য অশনিসংকেত। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভায় নারীকে অপাংক্তেয় করার বিষয়টি হতাশাজনক।’

বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) রাজধানীর খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম আয়োজিত এক সম্মেলনে এসব কথা বলেন বক্তারা। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নারী প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।

নারীপক্ষের সভাপতি গীতা দাসের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমিন মোর্শেদ, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, স্বনির্ভর বিষয়ক সহ-সম্পাদক নিলুফার চৌধুরী মনি, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের নেত্রী  খন্দকার আয়েশা সিদ্দিকা, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, ডা. তাজনূভা জাবিন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ- (মার্কসবাদী)'র সমন্বয়ক মাসুদ রানা, বিএনপির নেত্রী মাহবুবা সুলতানা হাবিবাসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ফিলিস্তিনে গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা ও সংহতি জানানো হয়। ঘোষণাপত্র পাঠ করেন বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত এবং ওয়াসেমা ফারজানা। এ সময় নিজেদের মতামত তুলে ধরেন বক্তারা।

মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ‘আগামী নির্বাচনেই ৫০ শতাংশ সাধারণ আসনে নারীদের সরাসরি মনোনয়ন দিতে হবে। কারণ পরবর্তীতে এ দাবি পূরণ করা হবে, এ ধরনের প্রতিশ্রুতি এক ধরনের ভাঁওতাবাজি। অতীতেও এমন নজির রয়েছে। আর ঐকমত্য কমিশনে নারীদের উপেক্ষার বিষয়টিও লজ্জার।’

মহিলা ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমিন মোর্শেদ বলেন, ‘গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পরও নারীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। এটি দুঃখজনক। রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের ৫ ও ১০ শতাংশ আসনের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করছে। এটাও আমাদের দেখতে হচ্ছে। তবে আমি বলবো আগামী নির্বাচনে দলের বাইরেও নারীদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কমপক্ষে ১০ জন নারীকে বাছাই করতে হবে।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলো কতটুকু ছাড় দিয়েছে, সে ব্যাপারে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ক্ষবে। ধর্মের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে নারীদের পিছিয়ে রাখার সুযোগ নেই। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সংসদে ৫০ শতাংশ নারী থাকতে হবে। সে দাবি অন্যায্য নয়।’

নারীবিষয়ক সংস্কার কমিটির সদস্য ড. মাহিন সুলতানা বলেন, ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর ভূমিকা না থাকলে তাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। তাই এবারের নির্বাচন একটি বড় সুযোগ। এ ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্বকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।’

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ বলেন, ‘যতদিন রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হবে, ততদিন নারীদের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। দলগুলো সব সময় পেশীশক্তিকে মূল্যায়ন করে থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্য করতে হবে যেন ওয়ার্ড থেকে শুরু করে সব জায়গায় নারী কমিটি দেয়। না হয় সে দলের নিবন্ধন বাতিল করতে হবে। তবে সরাসরি নির্বাচনের পাশাপাশি সংরক্ষিত আসনও রাখতে হবে।’

একই দলের স্বনির্ভর বিষয়ক সহ-সম্পাদক নিলুফা চৌধুরী মনি বলেন, ‘সংস্কার কমিশনে ৫ শতাংশ মনোনয়নের জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তবে সেটাও কতটুকু বাস্তবায়ন হবে, তা বলা কঠিন। আমরা কোটা চাই না। এর বাইরে নারীর সম্মান রক্ষা কিভাবে করা যায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে।’

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকী বলেন, ‘বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীরা ভয়ংকর প্রতিকূলতার মধ্যে রয়েছে। তারপরও তাদের রাজনীতিতে আসতে হবে। এতে নোংরা অপপ্রচার কিছুটা কমবে।’

জামায়াতের নারী শাখার নেত্রী ডা. হাবিবা বলেন, ‘নারীর সম্মান ও অধিকার নিশ্চিতে সবাইকে এক হতে হবে। বিগত দিনে নারীদের রাজনৈতিকভাবে অনেক হয়রানি করা হয়েছে।’ তিনি জানান, তার দলে নারী প্রতিনিধিত্ব যথেষ্ট হারে রয়েছে।

একই দলের আরেক নেত্রী খন্দকার আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ‘সরাসরি নারী প্রতিনিধিত্ব নির্বাচনের বিষয়টিতে আমাদের সমর্থন রয়েছে।’ তিনি জানান, তার দলে ৪৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।

ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন বলেন, ‘নারীর প্রতিনিধিত্ব কতটুকু হচ্ছে তা নিশ্চিত করতে হবে। এখনও দাবি করতে হচ্ছে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নারীদের সংরক্ষিত আসনে ভোট হবে। আমাদের বিচার ব্যবস্থায়ও নারীদের প্রতিনিধিত্ব তেমন নেই।’

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, ‘রাজনীতিতে নারীদের উপেক্ষা একটি সাধারণ বিষয়। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতি অর্থ ও পেশীশক্তি নির্ভর। এমনটি হলে নারীরা টিকবে না। শুধু তাই নয় সেখানে সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’

এনসিপির আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাজনুভা জাবিন বলেন, ‘সংরক্ষিত নারী আসনের অভিশাপ থেকে নারীদের বের করার জন্য ৯০ সাল থেকেই আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কোনও উদ্যোগ কখনই নেওয়া হয়নি। ঐকমত্য কমিশনে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল না। তা লজ্জার। কারণ সেখানে নারীদের অধিকার নিয়ে দরকষাকষি করেছেন পুরুষ নেতারা।’

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (মার্কসবাদী)’র সমন্বয়ক মাসুদ রানা বলেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাব দেখেছি। তারা মনে করে নারীদের মনোনয়ন দিলে তারা ভালো করতে পারবে না। তবে আমরা কমিশনের সব সিদ্ধান্ত মেনে নেইনি।’

আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)’র নেত্রী ফারজানা সাত্তার বলেন, ‘২৪-এর আন্দোলন নারী ঢাল হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু পরবর্তীতে তাদেরকে অবহেলার পাত্র বানানো হয়েছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেত্রী উমামা ফাতেমা বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীরা এখনও গুরুত্বপূর্ণ। তাই আগামী নির্বাচনে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।’

ডাকসু প্রতিনিধি হেমা চাকমা বলেন, ‘ডাকসুতেও নারী প্রার্থী কম। মাত্র ৭ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছে। ভিপি, জিএস ও এজিএস পদে নারী প্রতিনিধি নেই। যেকোনো রাজনৈতিক দলেই নারীদের একপাশে সরিয়ে রাখা হয়। যা নারীদের জন্য অসম্মানজনক।’

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin