নিজের নতুন দলেই চ্যালেঞ্জের মুখে করবিন, হারালেন নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ

নিজের নতুন দলেই চ্যালেঞ্জের মুখে করবিন, হারালেন নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ

ব্রিটিশ বাম রাজনীতির বর্ষীয়ান নেতা জেরেমি করবিন নিজের গড়া দল ইওর পার্টির নেতৃত্ব থেকে কার্যত উৎখাত হয়েছেন। রবিবার লিভারপুলে দলের প্রতিষ্ঠা সম্মেলনে সদস্যরা তার প্রস্তাবিত একক নেতৃত্ব কাঠামো প্রত্যাখ্যান করে সামষ্টিক নেতৃত্ব ব্যবস্থার পক্ষে ভোট দেন। ৫১.৬ বনাম ৪৮.৬ শতাংশের সামান্য ব্যবধান হলেও এটি করবিনের শিষ্য, কভেন্ট্রি সাউথের এমপি জারাহ সুলতানার বড় জয়ে পরিণত হয়েছে।

৭৬ বছর বয়সী করবিনের জন্য এটি হওয়ার কথা ছিল নতুন রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা। লেবার পার্টির বাইরে এসে নিজের সমাজতান্ত্রিক দল গড়ে শেষবারের মতো নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল তার সামনে। কিন্তু বাস্তবে তিনি দেখলেন, তৃণমূল গণতন্ত্রের যে মূল্যবোধ তিনি আজীবন লালন করেছেন, সেই গণতন্ত্রই তার হাত থেকে নেতৃত্ব ছিনিয়ে নিলো।

সম্মেলন শুরুর আগের রাতেই বেশ কয়েকজন প্রতিনিধিকে বহিষ্কারের ঘটনায় শনিবার পরিবেশ তিক্ত হয়ে ওঠে। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে জারাহ সুলতানা প্রথম দিনের অধিবেশন বর্জন করেন। বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি এই বহিষ্কারকে ডাইনি খোঁজা বলে আখ্যা দেন। তার মুখপাত্র জানান, দলে সব সমাজতন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে হবে। পরোক্ষভাবে করবিনকে তিনি দমনমূলক নেতৃত্ব হিসেবে উপস্থাপন করেন।

রবিবার দলের সংবিধান নিয়ে ভোটাভুটি ছিল করবিনের কর্তৃত্বের চূড়ান্ত পরীক্ষাও বটে। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, দল কীভাবে ১০ জন মিলে পরিচালনা করবে, এটি জনগণের পক্ষে বোঝা কঠিন। কিন্তু তার এই সতর্কবার্তা কোনও প্রভাব ফেলেনি। নতুন নিয়ম অনুযায়ী আর কোনও একক নেতা থাকবে না। দলের নীতি নির্ধারণ করবে সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত নির্বাহী কমিটি। জনসমক্ষে প্রতিনিধিত্ব করবেন একজন চেয়ার, একজন ডেপুটি চেয়ার ও একজন মুখপাত্র। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, সদস্যরা চাইলে অন্য রাজনৈতিক দলের সদস্যপদও রাখতে পারবেন। করবিন এই নিয়মের কঠোর বিরোধিতা করছিলেন।

বাম রাজনীতিতে যখন গ্রিন পার্টির মতো শক্তি তরুণ ভোটারদের কাছে টানছে, তখন ইওর পার্টির এই অভ্যন্তরীণ ভাঙন বড় সংকেত হয়ে দেখা দিচ্ছে। স্বতন্ত্র অ্যালায়েন্সের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ এমপি আগেই দল গঠন প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। দলীয় বিবাদে করবিন এখন নিজের গড়া সংগঠনে কোণঠাসা, আর সুলতানাকেও সামলাতে হবে জটিল ও বহুমুখী নেতৃত্ব কাঠামো।

বহু দশক ধরে করবিন ছিলেন ব্রিটিশ বাম রাজনীতির নৈতিক কণ্ঠস্বর। তিনি কখনও ক্ষমতার লোভ করেননি। কিন্তু যখন তিনি সেই আদর্শকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাইলেন, তখনই দল তার হাতছাড়া হলো। ইওর পার্টি, আওয়ার পার্টি কিংবা ফর দ্য মেনি­, নাম যাই হোক, এই দল আর করবিনের নয়। এটি এখন যৌথ নেতৃত্বের হাতে, আর মতাদর্শিক ফ্রন্টলাইনে আছেন তারই সাবেক শিষ্য জারাহ সুলতানা।

লিভারপুলের সম্মেলন হল ছেড়ে বেরিয়ে আসার সময় প্রতিনিধিদের মুখে নতুন ভবিষ্যতের প্রত্যাশা নয়, ছিল এক যুগের অবসানের ছাপ। আজীবন জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের যে রাজনীতি করবিন চর্চা করেছেন, সেই জনগণই এবার তার হাত থেকে নেতৃত্ব নিয়ে নিলো গণতান্ত্রিক ভোটের মাধ্যমেই।

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin