ময়লা ফেলাটাই যেন কাজ

ময়লা ফেলাটাই যেন কাজ

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর দিয়ে সাঁই সাঁই করে ছুটে চলেছে গাড়ি। ঢাকা শহরের সৌন্দর্যের ভিডিও করতে গাড়ির জানালা খুলে দিলেন, হাতের চিপসের খালি প্যাকেটটা এই ফাঁকে বাইরে ফেলে দিলেন। আরেক জানালা দিয়ে একই সময়ে আপনার পাশের জনের মনে হলো—হাতে থাকা সিপির চিকেন বলের খালি কাঠি, আর সসের শ্যাসেটা ফেলে দেওয়া দরকার। তাতে গাড়িতে আর খাবারের গন্ধও থাকবে না। ফলে আপনার গাড়িটা পরিষ্কার থাকলো। কিন্তু আপনার তৈরি আবর্জনা কোথায় ফেললেন, কার ওপর ফেললেন, সেটা দেখা আপনার কর্তব্য নয় বলে আপনি মনে করেন। আপনার ফেলে দেওয়া নোংরা আবর্জনা পরিষ্কারের জন্য আছে সিটি করপোরেশন। এই নাগরিক বোঝাপড়া আমাদের নগরটিকে আবর্জনায় পরিণত করেছে। রাস্তায় দুই পাশজুড়ে কলার খোসা, খাদ্যদ্রব্যের খালি প্যাকেট, ফেলে রাখা ভাত-তরকারি। এরই মাঝে নাক চেপে, পাশ কাটিয়ে নির্বিকার হেঁটে চলেছেন পথচারীরা।

এই ঘটনার মতোই আরেকটা চেনা ঘটনা—বাসার লিভিং রুম পরিষ্কার করতে গিয়ে দুটো টিস্যু, একটা কটনবাগ আর ছোট একটা চকলেটের খালি প্যাকেট নিয়ে দুমড়ে-মুচড়ে জানালা দিয়েই ফলে দিলেন ছয় তলা থেকে। এই আবর্জনা গিয়ে পড়বে দোতলায় দুই ফ্ল্যাটের মাঝখানে যে ফাঁকা কমন স্পেস আছে সেখানে। খারাপ লাগার কিছু নেই, সেখানে আগে থেকেই ব্যবহার্য সব জিনিসই কেউ না কেউ ফেলেছেন—যার যার বাসা, রান্নাঘর বা বাথরুম থেকে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, একটা সিস্টেম তৈরি হওয়া দরকার। সেটা না করা পর্যন্ত আপনি নাগরিকদের দোষারোপ করতে পারবেন না। তবে আমরা নিজেরাও বেশ অপরিচ্ছন্ন ও অদায়িত্বশীল। এভাবে নগরীটা মরতে বসেছে। সেটাও আমাদের ভাবায় না। এই বিষয়টা শঙ্কার। আপনি আপনার চারপাশ নিয়ে মিনিমান সতর্ক না। নগর পরিকল্পনাবিদরা জানান, স্কুল থেকে শিশুদের হাতেকলমে নাগরিক হয়ে ওঠা শেখাতে হবে—ময়লা আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলতে হয় না, পরিচ্ছন্নতা কেন দরকার, সেসব তাদের শেখানোর বিকল্প নেই।

  jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw690829b5063a4" ) );

২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনে প্রতিদিন উৎপন্ন ১৭ হাজার টন বর্জ্য। এই বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের জন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ২১৩ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, ঢাকা উত্তরে ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টন, চট্টগ্রামে ২১৩৫ টন, নারায়ণগঞ্জে ১০০০ টন, গাজীপুরে ৪০০০ টন এবং বাকি সব জায়গা মিলে ৫০০ টনের কম বর্জ্য উৎপন্ন  হয়।

সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর যেখানে-সেখানে আবর্জনার স্তূপ। ফুটপাতজুড়ে সারি সারি চায়ের দোকানের সামনেই যাবতীয় ময়লা ফেলে রাখা হয়েছে।

নাগরিক অধিকার দাবি করা নাগরিকরাও কেন আশপাশ পরিষ্কার রাখা শিখলো না প্রশ্নে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও নগর পরিকল্পনাবিদ আখতার মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আধুনিক তত্ত্ব আরবানিজম দিয়ে বুঝানো হয় যে যারা নগরে থাকবেন, তারা নগরের আচরণ রপ্ত করবে। মানুষ নগরে বসবাস করলে সেই আচরণ তাকে মেনে চলতে হবে। কিন্তু ঢাকার ক্ষেত্রে তেমনটা দেখা যায় না। আমাদের এই শহরে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ রাস্তার পাশ ঘেঁষা যে নালাটা, সেটা প্লাস্টিকসহ নানা বর্জ্যে ভরে যাওয়া। সেগুলো আমরাই ফেলেছি। আমরা আমাদের দায়িত্ব কর্তব্য ভুলে যাই। সারাক্ষণ সিটি করপোরেশন, সরকারকে দোষারোপ করতে থাকি। এই যে নাগরিক দায়িত্ববোধ তৈরি না হওয়া—এটা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ।’’

সচেতনতা তৈরির কোনও কার্যক্রম দেখেন কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘না এ ধরনের কিছু দেখি না। এখন যে পরিস্থিতি হয়েছে, একইসঙ্গে দুই স্তরে এই কার্যক্রম করতে হবে। একদিকে বাসার বয়স্কদের বারবার তাদের দায়িত্ব জানাতে হবে, আরেকদিকে শিশুদের তাদের স্কুলের শুরু থেকে এসব শেখাতে হবে—হাতে কলমে। সে জানবে ভালো নাগরিক হতে কী করতে হয়। তবে হয়তো লম্বা সময়ের পরে আচরণে পরিবর্তন আসবে ‘’

তিনি বলেন, ‘‘আমাদের মধ্যে দ্বৈত সত্তা কাজ করে। যতক্ষণ আমরা প্রাইভেট স্পেসে থাকি, আমরা পরিচ্ছন্ন থাকলেও যেই পাবলিক পরিসরে যাই, তখন আর নিজেদের দায়িত্ব আছে সেটা মনে থাকে না। তখন সব দায়িত্ব সরকারের বলে ভাবি, এই ভাবনায় বদল দরকার।’’

সচেতনতা কার্যক্রম চোখে না পড়লেও সেটা অব্যাহত আছে বলে জানান তিনি।

যেখানে সেখানে ময়লা না ফেলতে মানুষকে সচেতন করার কোনও কার্যক্রম সিটি করপোরেশনের আছে কিনা প্রশ্নে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা প্রতি শনিবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধনের বিশেষ কর্মসূচি পরিচালনা করছি। একই সঙ্গে মানুষ যেন যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা না ফেলে, তার জন্য উদ্বুদ্ধ করছি। এক্ষেত্রে আমরা লিফলেট বিতরণ করছি। এছাড়া শুক্রবার মসজিদে জুমার নামাজের সময় এলাকাভিত্তিক মানুষকে সচেতন করার জন্য প্রচারণা শুরু করেছি। সেখানে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাহায্য নিয়ে এই প্রচারণা করি।’’

গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে ব্যাপক প্রচারণার মধ্য দিয়ে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা জরুরি কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের মনে হয়েছে—ওরকম প্রচার-প্রচারণার চেয়ে সশরীরে এলাকাভিত্তিক প্রচার-প্রচারণা বেশি উপযোগী এবং বেশি কাজে দেবে।’’

এলাকাভিত্তিক অপ্রতুল ডাস্টবিনের বিষয়ে এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘‘আমরা পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে সায়েদাবাদে ছোট ছোট ডাস্টবিন স্থাপন করেছি। আমরা দেখতে চেয়েছি—এটা ঠিক কতটুকু কাজে দেয়। মানুষ এই পরিকল্পনায় কতটুকু রেসপন্স করে। সেই হিসেবে আমরা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে এই প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করবো।’’

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw690829b5063e3" ) ); যেখানে সেখানে ময়লা না ফেলতে মানুষকে সচেতন করার কোনও কার্যক্রম ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আছে কিনা, এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসি’র প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এক্ষেত্রে আমরা তরুণদের দিয়ে সচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছি। তাছাড়া ম্যাজিস্ট্রেট আছেন, বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছেন, অভিযান পরিচালনা করেছেন। আমরাও বিভিন্ন প্রোগ্রামে মানুষকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানাই। একজন সুনাগরিকের দায়িত্ব কী বৈশিষ্ট্য কী—এসব স্মরণ করিয়ে দেওয়া, এই আরকি।’’

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে ঢাকা শহরে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার ডাস্টবিন বসানো হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। কিন্তু ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণে শুরুতে ডাস্টবিন উপচে ময়লা ফুটপাতে পড়ে থাকতে দেখা যায় এবং এরপর কয়েক মাসের মধ্যে সেগুলো বেশিরভাগ চুরি হয়ে যায়।

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin