মাত্র ২৭ দিন দায়িত্বে থেকে পদত্যাগ করলেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু। মন্ত্রিসভার ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সরকারের পতন দেশটিকে এক নতুন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ফ্রান্স এখন কার্যত এক প্রশাসনিক অচলাবস্থায়।
কী ঘটেছে?
সোমবার লেকর্নু নিজে ও তার পুরো মন্ত্রিসভার পদত্যাগপত্র প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর কাছে জমা দেন। মাত্র ১২ ঘণ্টা আগেই তার নতুন মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। ফলে মাত্র ২৭ দিন দায়িত্বে থেকে লেকর্নু আধুনিক ফরাসি ইতিহাসের সবচেয়ে স্বল্পমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী হলেন।
৩৯ বছর বয়সী এই সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ম্যাক্রোঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। তিনি ২০২২ সালে ম্যাক্রোঁর পুনর্নির্বাচনের পর পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী এবং গত গ্রীষ্মে পার্লামেন্ট ভেঙে আগাম নির্বাচন আহ্বানের পর তৃতীয়।
পদত্যাগের ব্যাখ্যায় লেকর্নু বলেন, আমি সমঝোতায় প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু প্রতিটি দল চেয়েছে অন্য সবাই তাদের পূর্ণ কর্মসূচি মেনে নিক। সামান্য সহযোগিতাতেই এটি কাজ করতে পারত, কিন্তু দলীয় সংকীর্ণতা ও ব্যক্তিগত অহং বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার আকস্মিক পদত্যাগে বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। প্যারিসের সিএসি ৪০ সূচক ২ শতাংশ ও ইউরোর মান ০.৭ শতাংশ কমে যায়। ইতালি ও গ্রিসের পরই ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফ্রান্সের ঋণ-জিডিপি অনুপাত তৃতীয় সর্বোচ্চ, যা প্রায় ইইউ-নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ।
কেন এমন হলো?
সংকটের সূত্রপাত ২০২৪ সালের আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে দেশটি তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে—বামপন্থী জোট, চরম দক্ষিণপন্থি দল ন্যাশনাল র্যালি (আরএন) এবং ম্যাক্রোঁর মধ্য-ডানপন্থি জোট। কোনও পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।
অর্থনৈতিক চাপ ও ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাজনীতিকে আরও জটিল করেছে। ম্যাক্রোঁ পুনরায় প্রার্থী হতে পারবেন না। ফলে প্রতিটি দলই এখন নিজের অবস্থান মজবুত করতে চায়।
লেকর্নুর প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল বাজেট ঘাটতি কমাতে কৃচ্ছতাসাধনের বাজেট পাস করা। এই কাজেই তার আগে দুই প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া বাইরু ও মিশেল বার্নিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সংসদ সদস্যদের বিরোধিতায় তারাও বিদায় নেন।
লেকর্নুর পদত্যাগের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল ডানপন্থি দল লে রিপাবলিকানদের (এলআর) প্রতিক্রিয়া। দলটি অভিযোগ তোলে, নতুন মন্ত্রিসভার গঠন অতীতের রাজনীতির সঙ্গে গভীর ছেদ আনার প্রতিশ্রুতি রাখেনি।
রবিবার রাতে মন্ত্রিসভার সদস্যদের ঘোষণা হওয়ার পর ডান ও বাম দুই পক্ষ থেকেই তীব্র সমালোচনা ওঠে। কেউ বলেন, সরকার অতিরিক্ত ডানপন্থি, আবার কেউ বলেন পর্যাপ্ত ডানপন্থি নয়। এমনকি সরকার পতনের হুমকিও আসে।
বিশেষ করে অর্থমন্ত্রী ব্রুনো লে মায়েরকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে পুনর্বহালের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ ছড়ায়, যা অনেকের মতে ম্যাক্রোঁর ব্যবসাবান্ধব নীতি অব্যাহত রাখারই ইঙ্গিত।
এখন কী হতে পারে?
চরম ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি দল ও তাদের নেত্রী মেরিন লো পেন ইতোমধ্যে সংসদ ভেঙে নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। অপরদিকে বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবাউড (এলএফআই) ম্যাক্রোঁর পদত্যাগ দাবি করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ম্যাক্রোঁর সামনে এখন তিনটি ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প রয়েছে।
প্রথমত, তিনি নতুন একজন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিতে পারেন। তবে তার নিজ জোটের ভেতর থেকে কেউ এ দায়িত্ব নিতে রাজি হবেন না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। কোনও মধ্যপন্থি বাম নেতাকে বেছে নিলে তা পেনশন সংস্কারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। আর একেবারে ডানপন্থি কাউকে আনলে বাম জোট ক্ষুব্ধ হবে। এ অবস্থায় অনেকেই ধারণা করছেন, তিনি হয়তো দলনিরপেক্ষ কোনও টেকনোক্র্যাট প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, তিনি জাতীয় পরিষদ ভেঙে দিয়ে আবারও আগাম নির্বাচন ডাকতে পারেন। তবে জরিপ বলছে, তাতে দেশ আরও বিভক্ত সংসদ পেতে পারে, কিংবা ন্যাশনাল র্যালির সরকার গঠনের পথ খুলে যেতে পারে।
তৃতীয়ত, তিনি নিজে পদত্যাগ করতে পারেন। কিন্তু ম্যাক্রোঁ বারবার জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে তিনি কোনোভাবেই সরে দাঁড়াবেন না।
যেভাবেই হোক, লেকর্নুর পতন শুধু এক প্রধানমন্ত্রীর বিদায় নয়। এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ফ্রান্স এখন এক গভীর রাজনৈতিক সংকটে প্রবেশ করেছে, যেখানে সরকার পরিচালনার পথ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান