ঢাকার মানুষের কাছে কেমিক্যালের আগুন এখন আর কোনও নতুন খবর নয়, বরং এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম। পুরান ঢাকার সরু গলিতে কিংবা আবাসিক ভবনের ভেতরেই লুকিয়ে থাকা এসব রাসায়নিক গুদাম যেন একেকটি বোমা। প্রশাসনের উদ্যোগ, কমিটি গঠন, টাস্কফোর্স, তদন্ত—সবকিছুর পরও আগুনের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না নগরবাসী।
২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ১২৪ জন। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চুড়িহাট্টায় কেমিক্যাল গুদামে আগুনে মারা যান ৭১ জন মানুষ। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১৪ অক্টোবর রাজধানীর মিরপুর শিয়ালবাড়িতে একটি কেমিক্যাল গুদামে অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়াও গত ২২ সেপ্টেম্বর গাজীপুরে একটি কেমিক্যাল গোডাউনে আগুনে ফায়ার ফার্ভিসের তিন সদস্যসহ পাঁচ জন প্রাণ হারান। এর আগে ২০২২ সালের ৪ জুন শনিবার রাতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড একটি কন্টেইনার ডিপোতে থাকা কেমিক্যালের অগ্নিকাণ্ডে বিস্ফোরণে ফায়ার ফাইটারসহ অন্তত ৪১ জন নিহত হন।
এসব ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড—একই শহরে, একই ধরনের কারণ, একই ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি।
নিমতলী ও চুড়িহাট্টার ঘটনার পর সরকার বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে, গুদাম স্থানান্তরের ঘোষণা দেয়, এমনকি কেরানীগঞ্জে ২০ একর জমিতে রাসায়নিক শিল্প এলাকা তৈরির পরিকল্পনাও নেওয়া হয়। কিন্তু এক যুগ পেরিয়ে গেলেও সেই প্রকল্প আজও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, অবৈধ ব্যবসার ছায়া এবং ভবন মালিকদের লোভের কারণে পুরান ঢাকায় এখনও হাজারও গুদাম সচল। আর সেই কেমিক্যাল গোডাউনগুলো এখন ছড়িয়ে পড়েছে নতুন ঢাকাতেও। যার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ মিরপুর রূপনগরের শিয়ালবাড়ির আগুন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রাথমিক তথ্যমতে, ওয়ারী, সূত্রাপুর, লালবাগ, চকবাজার, নবাবপুর, ইসলামপুর, বংশাল ও বাবুবাজার এলাকাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি রাসায়নিক গুদাম রয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের কাছে এদের কোনও নির্ভুল তালিকা নেই। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) ২০১৭ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, পুরান ঢাকায় প্রায় ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে, এর মধ্যে ১৫ হাজারই অবস্থিত আবাসিক ভবনের ভেতরে। অথচ সিটি করপোরেশন ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে—অন্যগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ।
বাপার গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ৮৭ শতাংশ গুদামে ফায়ার এক্সটিংগুইশার নেই এবং কোনও ধরনের ধোঁয়া শনাক্তকরণ বা অ্যালার্ম সিস্টেমও স্থাপন করা হয়নি। অনেক ভবনে সিঁড়ি এতটাই সরু- মাত্র ১ থেকে ৩.৫ ফুট, ফলে আগুন লাগলে দ্রুত বেরিয়ে আসা বা উদ্ধার কাজ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আগুন ছড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে হাইড্রোজেন পারক্সাইড, ব্লিচিং পাউডার, পেইন্ট থিনার, টলুইন, সোডিয়াম সালফেট ও দাহ্য রাসায়নিক পদার্থের অযাচিত মজুত।
অগ্নিকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনার পরই ‘গুদাম সরানোর’ ঘোষণা এসেছে, কিন্তু কার্যকর হয়নি একটিও। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের ভাষায়—‘এটা সময়ের অপেক্ষা মাত্র, পরবর্তী কেমিক্যাল ট্র্যাজেডি ঘটতে পারে যেকোনও দিন, যেকোনও মুহূর্তে।’
ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইঞ্জিনিয়ার আলী আহম্মেদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “একসময় পুরান ঢাকাই ছিল কেমিক্যাল ব্যবসার কেন্দ্র। সেখান থেকেই মূলত সারা দেশের কেমিক্যাল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হতো। কিন্তু মেয়রের নির্দেশে যখন ওইসব গুদাম সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন সেগুলো বিভিন্ন জায়গায়—বিশেষ করে গার্মেন্টস ও আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এখন এসব জায়গায় কোনও মনিটরিং বা তদারকি নেই। কেউ ঠিকভাবে নজরদারিও করছে না। ফলে গুদামগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই, সঠিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ নেই, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। বেশিরভাগ গুদাম মালিক ট্রেড লাইসেন্স ম্যানেজ করে চালাচ্ছে, আর ভবন মালিকরা বেশি ভাড়ার লোভে বাসা-বাড়িকে গুদাম হিসেবে দিচ্ছেন। এসবই ঘটছে প্রশাসনের অজান্তে, অনেকটা ‘ইনফরমাল ব্যবসা’ হিসেবে।”
তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দেশে কোথায় কতগুলো কেমিক্যাল গুদাম আছে, তার কোনও ডাটাবেজ নেই। ফলে দুর্ঘটনা ঘটার আগ পর্যন্ত কেউ টেরই পায় না। সিটি করপোরেশন, রাজউক, ফায়ার সার্ভিস—সব সংস্থার মধ্যেই সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের সময় ফায়ার লাইসেন্স যাচাই করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয় না। এতে ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। তাই দায় নিতে হবে সবার—সিটি করপোরেশন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ভবন মালিক থেকে শুরু করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পর্যন্ত। কেমিক্যালের আগুন বন্ধ করতে হলে সমন্বিত ও কঠোর ব্যবস্থা ছাড়া বিকল্প নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল গুদামগুলো সরানো এখন শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। যেসব ভবনে কেমিক্যাল মজুত আছে, সেগুলো একেকটা মানববোমার মতো। সরকার চাইলে দুই মাসেই এগুলো সরানো সম্ভব, কিন্তু তা হচ্ছে না প্রভাবশালীদের কারণে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, ‘কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক বলয়ে থাকায় কোনও কর্তৃপক্ষই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে না। নিমতলী ও চুড়িহাট্টার পর আমরা সরকারের কাছে গুদাম তালিকা জমা দিয়েছিলাম, কিন্তু প্রশাসন এখনও বাস্তবায়ন শুরুই করেনি। এটি নাগরিক জীবনের ওপর এক ধরনের রাষ্ট্রীয় অবহেলা।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সময় কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার। প্রথমত, আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক দ্রব্য মজুত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কেরানীগঞ্জে রাসায়নিক শিল্প নগরী দ্রুত চালু এবং তৃতীয়ত, নিয়মিত মনিটরিং, আগুন-ঝুঁকি নিরীক্ষা ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।