ব্রিটেনের বাম রাজনীতিতে আজীবন স্রোতের বিপরীতে হাঁটা জেরেমি করবিনের সামনে ইতিহাস যেন নির্মম পরিহাস নিয়ে হাজির হলো। রবিবার লিভারপুলে নবগঠিত বামপন্থি দল ইওর পার্টির প্রতিষ্ঠাকালীন সম্মেলনে দলের নীতিনির্ধারণী ভোটে প্রত্যাখ্যাত হলো করবিনের প্রস্তাবিত একক নেতৃত্ব কাঠামো। এর বদলে সদস্যরা বেছে নিলেন যৌথ নেতৃত্ব।
৫১.৬ বনাম ৪৮.৬ শতাংশ ভোটে গৃহীত এই সিদ্ধান্তকে বিশ্লেষকরা বলছেন এক ধরনের ব্যালট বিপ্লব। এর মধ্য দিয়ে কার্যত দলের হাল ধরলেন করবিনের একসময়ের শিষ্য, কভেন্ট্রি সাউথের এমপি জারাহ সুলতানা।
দলীয় গঠনতন্ত্র সংশোধনের ভোটে জয়ের পর আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বক্তব্য দেন জারাহ সুলতানা। আগের দিন কিছু প্রতিনিধিকে অগণতান্ত্রিকভাবে বহিষ্কারের প্রতিবাদে সম্মেলন বর্জন করলেও রবিবার তিনি মঞ্চে ফিরে স্পষ্ট বার্তা দেন।তিনি বলেন, আমরা এখানে আরেকটি লেবার পার্টি (লেবার ২.০) গড়তে আসিনি। আমাদের লক্ষ্য প্রথাগত রাজনীতির আমূল পরিবর্তন।
জারাহ সুলতানা স্লোগানে উত্তাল হলে তিনি লেবার সরকারের পররাষ্ট্রনীতির তীব্র সমালোচনা করেন। গাজায় যুক্তরাজ্যের অবস্থানকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করে তিনি বলেন, বছরে ১১ বিলিয়ন পাউন্ড প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানো এবং অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রেখে সরকার প্রকারান্তরে গণহত্যার সহযোগী হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদকে উদ্দেশ করে তার হুঁশিয়ারি, গাজায় তাদের ভূমিকার জন্য একদিন হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
ব্রিটিশ রাজতন্ত্র নিয়েও তোপ দাগেন তিনি। প্রচলিত সংসদীয় আচার ভেঙে প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে পরজীবী আখ্যা দিয়ে বলেন, করদাতার টাকায় এক অভিযুক্ত প্রিন্সকে রক্ষা করা হচ্ছে। অথচ নৌকায় আসা অসহায় শরণার্থীদের দানব হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
দলের জন্মলগ্নে নেতৃত্ব দিয়ে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও লিভারপুলের সম্মেলনে করবিন দেখলেন তার একক কর্তৃত্বের ইতি। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, জনগণের জন্য এটা বোঝা কঠিন যে ১০ জন মিলে কীভাবে দল চালায়। কিন্তু সদস্যরা তার এই পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করে ক্ষমতা তুলে দিলেন নির্বাহী কমিটির হাতে।
নতুন গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলটিতে আর কোনও একক নেতা থাকবেন না। সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত নির্বাহী কমিটি নীতিনির্ধারণ করবে। জনসমক্ষে দলকে প্রতিনিধিত্ব করবেন একজন চেয়ার, একজন ডেপুটি চেয়ার ও একজন মুখপাত্র। এছাড়া সদস্যরা এখন গ্রিন পার্টিসহ অন্যান্য সমমনা দলের সদস্যপদও রাখতে পারবেন। এটি ছিল সুলতানার দাবি এবং করবিনের কঠোর আপত্তির জায়গা।
সুলতানা রবিবার বক্তৃতায় দলের সূচনাপর্বের বিশৃঙ্খলার জন্য ক্ষমা চাইলেও এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল দলের ভবিষ্যতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আদনান হোসেন ও ইকবাল মোহাম্মদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বতন্ত্র এমপি আগেই দলীয় প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। অন্যদিকে বাম রাজনীতির শূন্যস্থান দ্রুত পূরণ করছে গ্রিন পার্টির তরুণ নেতৃত্ব।
সুলতানার দাবি অনুযায়ী ৫৫ হাজার সদস্য নিয়ে এটি এখন যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম সমাজতান্ত্রিক দল (১৯৪০–এর দশকের পর)। তবে লিভারপুলের হল ছাড়ার সময় প্রতিনিধিদের মুখে ছিল মিশ্র অনুভূতি—একদিকে জনগণের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে করবিন যুগের অবসানের বিষাদ।