বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমাতে শুরু হয়েছে ই-পারিবারিক আদালতের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। এর মাধ্যমে দেশে কাগজবিহীন বিচারব্যবস্থার নতুন এক মাত্রা যুক্ত হলো। ই-পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে ঘরে বসেই পাওয়া যাবে মামলাসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা।
এই ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে বিচারপ্রার্থীরা অনলাইনে মামলা দায়ের করতে পারবেন, ওকালতনামায় সই করতেও পারবেন অনলাইনে। এছাড়া অনলাইনেই হবে মামলার শুনানি, বিচারপ্রার্থীরা হাজিরা দিতে পারবেন ঘরে বসেই। মামলার তারিখ পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া যাবে মোবাইল ফোনে এসএমএস’র মাধ্যমে। মামলার যাবতীয় নথি ব্যবস্থাপনা হবে ডিজিটালি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর ফলে বিচারপ্রার্থী মা ও শিশুদের বারবার আদালতে আসা-যাওয়ার সময় সাশ্রয় হবে, কমবে ভোগান্তিও।
সোমবার (২৪ নভেম্বর) ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের জগন্নাথ-সোহেল স্মৃতি মিলনায়তনে এ সেবা উদ্বোধন করেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। এসময় পরিবেশ ও বন উপদেষ্টা রেজওয়ানা হাসানসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
ই-পারিবারিক আদালতের ব্যাপারে আইনজীবীদের উৎসাহ দিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, “ডিজিটাল ব্যবস্থাকে ভয় না পেয়ে একে সাদরে গ্রহণ করতে হবে। ডিজিটাল পদ্ধতির ফলে আপনাদের আয় কমবে না, বরং বাড়বে।”
আইনজীবীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, “এটা এখন শুরুর দিকে, আপনারা যত্ন না নিলে এটা কিন্তু টিকবে না। আমাদের ধন্যবাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, আপনারা কেবল এটা সন্তানের মতো দেখে রাখবেন। আশা করি, আমাদের পরে যে পলিটিক্যাল পার্টি আসবে, তারা দেশকে ভালোবেসে এগুলো ধরে রাখবে। আমরা যে ভালো কাজগুলো করছি সেগুলো অ্যাপ্রিশিয়েট করবে।”
আইন উপদেষ্টা আরও বলেন, “বিনা পয়সায় লিগ্যাল এইডে গিয়ে আপনি বিচার পাবেন। পারিবারিক মামলার ক্ষেত্রে আমরা তা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছি। এখন ২০টা জেলায় চালু করেছি, যাওয়ার আগে ৬৪ জেলায় চালু করবো। আশা করি, আগামীতে এক-তৃতীয়াংশ মামলা লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে সমাধান হবে। পাঁচ বছরের মধ্যে মামলার জট ৫০ শতাংশ কমে যাবে। পরবর্তী সরকারের প্রতি অনুরোধ, আমাদের উদ্যোগগুলো অব্যাহত রাখবেন।”
পারিবারিক আদালতের মামলা নিয়ে নিয়মিত কাজ করা আইনজীবী অ্যাডভোকেট মহসিন রেজার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ই-পারিবারিক আদালতের সুবিধার পাশাপাশি কোনও অসুবিধা আছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এটি বর্তমান সরকারের ভালো একটি উদ্যোগ। সেবা প্রত্যাশীদের পাশাপাশি আমরা যারা আইনজীবী আছি, তাদের জন্যও এটি সুবিধাজনক বলে মনে করি।”
আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের অনলাইনভিত্তিক হাজিরা কিংবা শুনানিতে কোনও সমস্যা হবে কি-না; এমন প্রশ্নের জবাব তিনি বলেন, যেকোনও নতুন সেবা চালু হলে সবারই বুঝতে একটু সময় লাগে। কিন্তু আস্তে আস্তে তা সহজ হয়ে যায়। ই-পারিবারিক আদালত সেবাও কিছুদিনের মধ্যে সবার কাছে সহজ হয়ে যাবে মনে করছি।”
তবে ই-পারিবারিক আদালত বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও এর কার্যকারিতা আরও বৃদ্ধি করতে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যবহারকারীদের প্রশিক্ষণ এবং সাইবার সিকিউরিটি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মত দেন এই আইনজীবী।
ই-পারিবারিক আদালত কার্যক্রম প্রসঙ্গে মহানগর দায়রা জজ আদালতের নাজির মো. সুমন হাওলাদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আজ থেকে ই-পারিবারিক আদালতের টেকনিক্যাল কার্যক্রম শুরু হলো। এখন থেকে পারিবারিক আদালতের মামলার জটিলতা কমবে আশা করছি।”
এই কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য অবকাঠামোগত ও টেকনিক্যাল দিক আদালত আছে কি-না; সে বিষয়ে মহানগর নাজির বলেন, “আইন মন্ত্রণালয় আমাদের ই-পারিবারিক আদালত সংশ্লিষ্ট সব কিছু দিয়ে রেখেছেন। সুতরাং এ নিয়ে কোনও সমস্যা নেই।”
নতুন এই ব্যবস্থা সাধারণ মানুষ বুঝবে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মানুষ যখন জানবে, একজন আরেকজনকে এর সুবিধা বলবে। এভাবে সবাই ধীরে ধীরে বুঝে যাবে।”