বাংলাদেশ দুর্যোগপূর্ণ দেশ, যেখানে প্রতিবছর প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিপর্যয় আমাদের সামাজিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। সেই নিরাপত্তা প্রশমনের জন্য সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বয় থাকাটা জরুরি হলেও প্রতিবারই দুর্যোগের সময় সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। দুর্যোগ মোকাবিলা নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশ যতটা দুর্যোগপ্রবণ দেশ ততটা ক্ষতির মুখে পড়তে হয় না। কারণ এখানকার মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়টা যদি ৫৪ বছরে এসেও করা সম্ভব না হয়, তবে বড় ধরনের ঝুঁকি সব সময়ই থেকে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে আজ পালিত হচ্ছে দুর্যোগ প্রশমন দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সমিন্বত উদ্যোগ, প্রতিরোধ করি দুর্যোগ’। ১৯৮৯ সাল থেকে প্রতিবছর ১৩ অক্টোবর সারা বিশ্বে ‘আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস’ উদযাপন হয়ে আসছে। দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসে জনগণ ও সংশ্লিষ্টদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্যই এ উদ্যোগ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও নিয়মিত দিবসটি পালন করে। বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় (যেমন: সিডর ২০০৭, আম্পান ২০২০), বন্যা (প্রায় প্রতিবছর), খরা ও নদীভাঙন, ভূমিকম্প (সম্ভাব্য ঝুঁকি), অগ্নিকাণ্ড ও বজ্রপাতের মতো দুর্যোগ ঘটে। যার কারণে প্রাণহানি, সম্পদহানি, বাস্তুচ্যুতি, খাদ্যসংকট, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির মতো দুর্ভোগগুলো ঘটে।
আমাদের দেশের দুর্যোগগুলোর মধ্যে বন্যা আর অগ্নিকাণ্ড সবচেয়ে ঘনঘন দেখা যায়। বন্যা বাংলাদেশের জন্য নতুন কিছু নয়। প্রতিবছর দেশের প্রায় ২৬ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা বন্যা কবলিত হয়। ব্যাপক বন্যা হলে সারা দেশের ৫৫ শতাংশের বেশি ভুখণ্ড বন্যার প্রকোপে পড়ে। প্রতিবছর গড়ে বাংলাদেশে তিনটি প্রধান নদীপথে মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আদ্র মৌসুমে ৮ লাখ ৪৪ হাজার মিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি প্রবাহিত হয়। বন্যা হলে একদিকে ত্রাণ, আরেকদিকে সুরক্ষিত স্থান এবং শারীরিক নানা অসুস্থতা দেখা দেয়। বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় এখানে একসঙ্গে কাজ করতে হয়। দুর্যোগ বিশ্লেষকরা বলছেন, একদল আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চায় না, তাদের নেওয়ার ব্যবস্থা করা জরুরি। আবার একদিকে ত্রাণ ঠিকমতো গেলেও বিতরণের জায়গায় নানা অভিযোগ দেখা যায়। ফলে কে আসলে কোন কাজ করবে তার একটা দিকনির্দেশনা থাকা দরকার। মোকাবিলার কমিটি আছে, কিন্তু সেটা কার্যকর হবে এমন একটা কোর কমান্ডার থাকা জরুরি, তাহলে কাজ সহজ হবে।
বন্যার পর বড় বিপর্যয় আগুন। সারা দেশে ২০২৪ সালে ২৬ হাজার ৬৫৯টি, অর্থ্যাৎ দিনে গড়ে ৭৩টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। বৈদ্যুতিক গোলযোগ, বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরা, চুলা ও গ্যাস সংক্রান্ত কারণে আগুনের ঘটনা বেশি ঘটেছে। অগ্নিকাণ্ডে সারা দেশে ৩৪১ জন আহত ও ১৪০ জন নিহত হন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া সেল থেকে এসব তথ্য জানানো হয়।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68ec7a4488a34" ) );
ডিজাস্টার ফোরামের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। জানুয়ারিতে ২ হাজার ৫৪১টি, ফেব্রুয়ারিতে ২ হাজার ৭৩৭টি, মার্চে ৩ হাজার ৪২১টি, এপ্রিলে ৩ হাজার ৪২৬টি। অর্থাৎ প্রতি মাসে দুই হাজারের বেশি আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।
এরকম বড় বড় ঘটনার ক্ষেত্রে সমন্বয়টা করে কে, এই প্রশ্ন তুলে দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘আমাদের মগজেই সমন্বয় নেই। সমন্বয় বিষয়টা মগজে থাকতে হবে। কাজটা মিলেমিশে করতে হবে। সরকারি কাজ জনগণের কাজ ভেবে মিলিতভাবে করবে। সারা বছর একা একা কাজ করবেন, আর দুর্যোগের সময় সবাইকে পাশে চাইবেন- তাহলে সেটা কার্যকর হবে না। অন্য সম্পৃক্ত অফিসগুলোতে যৌথতার চর্চা থাকতে হবে। নিয়মিত মহড়া থাকতে হবে, সেগুলো নেই।’
সমন্বয়হীনতার প্রধান জায়গা কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেকোনও দুর্যোগ পরিস্থিতি তৈরি হলে আগে ঠিক করুন কমান্ড কে দেবেন। সেটাই সমন্বয়ের বড় শর্ত। একজন কোর কমান্ডার থাকতে হবে, যেকোনও মন্ত্রণালয়ই হোক, ওই বিশেষ মুহূর্তে তার কথা শুনবে। তা না করে, কমান্ড কারটা শোনা হবে সেটা ঠিক করতে করতে প্রাকৃতিক উপায়ে দুর্যোগ প্রশমিত হতে থাকে।’
সমন্বিত উদ্যোগের কোনও বিকল্প নেই মনে বলে করেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সালাহউদ্দীন আল ওয়াদুদ। তিনি বলেন, ‘এটা কোনও একটা ডিপার্টমেন্টের কাজ না। সরকার-বেসরকারি সংস্থা-জনপ্রতিনিধি সবার সমন্বিত উদ্যোগের মধ্য দিয়ে কাজটি করতে হবে। আমাদের সমন্বয়নের কিছুটা ঘাটতি আছে।’
কোন জায়গায় ঘাটতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবকাঠামোগত, জনবল সঙ্কট, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আমাদের লোকাল লেভেল কমিটি ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত আছে। কিন্তু তাদের জন্য যে নিয়মিত মহড়ার আয়োজন থাকা জরুরি, সেটি নেই।’