আর মাত্র একদিন পরই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। রঙ-তুলির আঁচড় শেষে ইতোমধ্যে প্রায় সব মণ্ডপেে পৌঁছে গেছে প্রতিমা। পূজা উদযাপনের জন্য রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রমনা কালীমন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন, বনানী পূজামণ্ডপ, খামারবাড়ি পূজামণ্ডপসহ পুরান ঢাকার প্রায় সব মণ্ডপের প্রস্তুতি শেষ।
সরেজমিন দেখা যায়, দুর্গাপূজা উপলক্ষে আলোকসজ্জায় সজ্জিত হয়েছে নগরীর ছোট বড় প্রতিটি পূজামণ্ডপ। গত এক সপ্তাহ ধরে বাঁশ-কাঠ দিয়ে তৈরি করা কাঠামোতে নতুন ঝলমলে কাপড়ের আবরণে ফুটে উঠেছে এক অনন্য সৌন্দর্য। তার ওপর রঙ-বেরঙয়ের ইলেকট্রিক লাইটের সমারোহ।
রাজধানীর সনাতন ধর্মাবলম্বীরা জানান, মহাষষ্ঠীর জন্য অধীর অপেক্ষায় আছেন তারা। প্রতিবছরের মতো এবারও পরিবারের সবাইকে নিয়ে পূজায় রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী মণ্ডপগুলো প্রদক্ষিণ করবেন।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির
বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন মন্দির ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির। পলাশীর মোড়ের পাশে ঢাকেশ্বরী রোডেই মন্দিরটির অবস্থান। দুর্গাপূজায় সবচেয়ে বেশি ভক্তের সমাগম হয় এই মন্দিরে। মহালয়া থেকে পূজার প্রতিটি দিন শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে ভক্তি আর নিষ্ঠার সঙ্গে উদযাপন করা হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, মণ্ডপের ভেতরে ও বাইরে চমৎকারভাবে সাজানো হয়েছে। মণ্ডপের ভেতরে রাখা হয়েছে দেবী দুর্গা সরস্বতীসহ বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন প্রতিমা। মহাষষ্ঠীর আগেই অসংখ্য ভক্তকুলের আগমন ঘটেছে এখানে।
সেখানে উপস্থিত পার্থ সাহা নামে একজন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশ-বিদেশ থেকে অগণিত মানুষ ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পূজা দেখতে আসেন। বিজয়া দশমীতে বরণ, সিঁদুর খেলা ও সন্ধ্যা আরতি দেখার জন্যও এখানে প্রচুর মানুষের ভিড় হয়। পরিবারের সবাইকে নিয়ে প্রতিবছর আমাদের এই মন্দিরে যাওয়া হয়।’
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68d6143b998a4" ) );
রমনা কালীমন্দির
ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের পাশেই অবস্থিত রমনা কালীমন্দির। ইতিহাস ঐতিহ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, প্রায় ৫০০ বছর আগে বদরীনাথের যোশীমঠ থেকে গোপালগিরি নামে এক উচ্চমার্গের সন্ন্যাসী প্রথমে ঢাকায় এসে সাধন-ভজনের জন্য উপযুক্ত একটি আখড়া গড়ে তোলেন।
পরবর্তীতে সেখানে আরও ২০০ বছর পরে মূল রমনা কালীমন্দিরটি নির্মাণ করেন আর এক বড় সাধু হরিচরণ গিরি। তবে পরবর্তী সময়ে এই মন্দিরের প্রধান সংস্কারকার্য ভাওয়ালের ভক্তিমতী ও দানশীলা রানি বিলাসমণি দেবীর আমলেই হয়। এখনও রমনা কালীমন্দির তার ঐতিহ্য ধারণ করে আছে।
সরেজমিন দেখা যায়, দুর্গাপূজার জন্য প্রস্তুত রমনা কালীমন্দির। প্রতিবছরের মতো এবারও মন্দির চত্বরে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। পূজাকে কেন্দ্র করে মন্দির এলাকায় ছোটখাটো মেলাও বসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রাহুল চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘আমরা যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আছি তারা সবাই জগন্নাথ হলে পূজা উদযাপন করি। তবুও রমনা মন্দির আমাদের জন্য খুবই গুরুত্ব বহন করে। এলাকা থেকে পরিবারের লোকজন যখন আসে তখন আগে রমনা মন্দিরে যায়। পরবর্তীতে ঢাকার অন্য সব মন্দিরে পূজা যায়।’
রামকৃষ্ণ মিশন
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী যে কয়েকটি মন্দির আছে তার মধ্যে অন্যতম রামকৃষ্ণ মিশন। কুমারীপূজার জন্য খ্যাত রাজধানীর রামকৃষ্ণ মিশন মন্দির বিখ্যাত। টিকাটুলির রামকৃষ্ণ মিশন রোডে এর অবস্থান। প্রতিবছর মহাঅষ্টমী তিথিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা কুমারী পূজা দেখতে এই মন্দিরের ভিড় করেন।
রামকৃষ্ণ মিশনের বিষয়ে টিকাটুলির বাসিন্দা সুদেব দাশ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কুমারীপূজা দেখতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই রামকৃষ্ণ মিশনে যেতে হবে। কারণ রাজধানীতে শুধু রামকৃষ্ণ মিশনেই মহাঅষ্টমী তিথিতে কুমারী বালিকাকে মাতৃরূপে দেবী জ্ঞানে পূজা করা হয়। কুমারীপূজা দেখার জন্য বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে ভক্তরা ভিড় করেন।’
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68d6143b998e7" ) );
খামারবাড়ি পূজামণ্ডপ
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী যে কয়েকটি পূজামণ্ডপ আছে তার মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (কেআইবি) এর পাশেই খামারবাড়ি পূজামণ্ডপ। প্রতিমার সৌন্দর্য, আলোকসজ্জা, প্রবেশদ্বার, অভ্যন্তরীণ কাঠামোশৈলী ও প্যান্ডেলের কারণে আলোচিত এই পূজামণ্ডপ।
খামারবাড়ির বাসিন্দা অরূপ আচার্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার চোখে রাজধানীর সবচেয়ে সুন্দর পূজামণ্ডপ এটি। রাজধানীতে বসবাস করা সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যদি এই মণ্ডপ ঘুরতে না আসেন তাহলে বুঝবেন না এটা আসলে কতটা সুন্দর। গতকালকেই মণ্ডপের সব প্রস্তুতি শেষ। রাতের বেলায় এই মণ্ডপের সৌন্দর্য বহুগুণে বেড়ে যায়। দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীদের উচিত একবার হলেও এই মণ্ডপে ঘুরতে আসা।’
বনানী পূজামণ্ডপ
রাজধানীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল পূজামণ্ডপ হিসেবে খ্যাত বনানী পূজামণ্ডপ। প্রতিবছর বনানী খেলার মাঠে অস্থায়ীভাবে তৈরি করা হয় এই মণ্ডপ। জাঁকজমকপূর্ণ এই পূজা মণ্ডপ দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য দর্শনার্থী আসেন। অপরূপ সুন্দর প্রতিমা ও বর্ণিল আলোকসজ্জা নজর কাড়ার মতোই।
বনানী পূজামণ্ডপের বিষয়ে সেখানকার বাসিন্দা জগদীশচন্দ্র বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিবছরের মতো এবারও বনানী পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। আমরা এখানকার যারা আছি তাদের সম্মিলিত উদ্যোগেই এই মণ্ডপ। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে আমার পরিবার এর সঙ্গে যুক্ত। এই মণ্ডপে আসা অধিকাংশ রাজধানীর এলিট শ্রেণীর লোকজন। দিনের চেয়ে রাতের বনানী পূজামণ্ডপ অনেক বেশি প্রাণবন্ত।’
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী এই পাঁচটি পূজামণ্ডপ ছাড়াও প্রতিবছরের মতো এবারও দারুণভাবে সেজেছে পুরান ঢাকার পূজামণ্ডপগুলো। লক্ষ্মীবাজার, শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজারসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন অলিগলির ভেতরে তৈরি হয়েছে দুর্গাপূজার মণ্ডপ। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখো মানুষের সমাগম ঘটে এসব মণ্ডপে।