দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তিন দেশে টানা প্রবল বর্ষণে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে। রবিবার এসব তথ্য জানিয়ে কর্মকর্তারা বলেন, সপ্তাহজুড়ে চলা এ দুর্যোগে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষের জন্য উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
মালাক্কা প্রণালিতে বিরল এক গ্রীষ্মমন্ডলীয় ঝড় তৈরি হওয়ার পর প্রবল বৃষ্টি ও দমকা হাওয়া তিন দেশে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে। ইন্দোনেশিয়ায় ৪৩৫ জন, থাইল্যান্ডে ১৭০ জন এবং মালয়েশিয়ায় ৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
রবিবারও তিন দেশের উদ্ধার ও ত্রাণকর্মীরা বহু দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে পারছিলেন না। পানি নামতে শুরু করলেও হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। সরকারি হিসাবে ৪০ লাখের বেশি মানুষ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত। এর মধ্যে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় ৩০ লাখ এবং ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে ১১ লাখের বেশি মানুষ রয়েছেন।
এদিকে বঙ্গোপসাগরের ওপারে শ্রীলঙ্কায় আরেকটি ঘূর্ণিঝড়ে ১৫৩ জন মারা গেছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দেশটিতে আরও ১৯১ জন নিখোঁজ এবং পাঁচ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত।
ইন্দোনেশিয়া
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা শনিবারের ৩০৩ থেকে রবিবার বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩৫ জনে। পশ্চিম সুমাত্রার তিন প্রদেশে ব্যাপক ভূমিধস ও বন্যা পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। বহু এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত। ফলে উদ্ধারকাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পৌঁছানো যাচ্ছে না এমন এলাকায় হেলিকপ্টারে করে ত্রাণ পাঠানো হচ্ছে।
রয়টার্সের এক আলোকচিত্রী পশ্চিম সুমাত্রার প্যালেমবায়ান শহরের ওপর দিয়ে নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে দেখেছেন, বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত, বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। হেলিকপ্টারটি একটি ফুটবল মাঠে অবতরণ করলে আগে থেকেই খাদ্যের অপেক্ষায় সেখানে জড়ো হয়ে ছিলেন বহু মানুষ।
কর্তৃপক্ষ জানায়, কিছু এলাকায় ত্রাণসামগ্রী লুটপাটেরও খবর এসেছে। পশ্চিম সুমাত্রার পদাং শহরে আফরিয়ান্তি নামের ৪১ বছর বয়সী এক নারী বলেন, পানি হঠাৎ ঘরে ঢুকে পড়ল। আমরা ভয় পেয়ে পালাই। শুক্রবার ফিরে এসে দেখি ঘর নেই, ভেঙে গেছে। তিনি জানান, তার নয় সদস্যের পরিবার এখন বাড়ির অবশিষ্ট থাকা একটি দেয়ালের পাশে নিজেরাই বানানো তাঁবুতে থাকছেন। ঘর নেই, ব্যবসা নেই। দোকান সব ভেসে গেছে।
সরকারি হিসাবে এখনও ৪০৬ জন নিখোঁজ। আর বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ২ লাখ ১৩ হাজার।
থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া
থাইল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বন্যায় নিহতের সংখ্যা রবিবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭০ জনে। আহত হয়েছেন ১০২ জন। সবচেয়ে বেশি ১৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে সঙখলা প্রদেশে। শুক্রবার সঙখলার হাট ইয়াই শহরে ৩৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। যা তিন শতকের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ।
প্রতিবেশী মালয়েশিয়ায় এখনও প্রায় ১৮ হাজার ৭০০ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা। গত সপ্তাহে দেশটির বিভিন্ন অংশে ভারি বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদফতর শনিবার গ্রীষ্মমন্ডলীয় ঝড় ও টানা বৃষ্টির সতর্কতা প্রত্যাহার করে জানায়, বেশির ভাগ অঞ্চলে আকাশ পরিষ্কার থাকবে।
মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা থাইল্যান্ডে আটকা পড়া ছয় হাজার ২০০ জনের বেশি নাগরিককে উদ্ধার করেছে। একই সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম সুমাত্রায় অবস্থানরত মালয়েশীয়দের স্থানীয় কনস্যুলেটে নিবন্ধনের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। পশ্চিম সুমাত্রার এক ভূমিধসে দেশটির ৩০ বছর বয়সী এক নাগরিক নিখোঁজ রয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।