নিমতলী, চুড়িহাট্টা, বনানীর এফআর টাওয়ার, বেইলি রোড—একটি ট্র্যাজেডির ক্ষত শুকানোর আগেই রাজধানী ঘটছে নতুন অগ্নিকাণ্ডে। এবার মিরপুরের রূপনগরে কেমিক্যাল গোডাউনে ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৬ জন।
গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ঢাকাবাসী একের পর এক মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের সাক্ষী। নিমতলী, চুড়িহাট্টা, বনানীর এফআর টাওয়ার ও বেইলি রোডের ভয়াবহ চারটি অগ্নিকাণ্ডেই মৃত্যু হয়েছে ২৬৮ জনের বেশি মানুষের। প্রতিবারই সরকারের আশ্বাস মেলে, দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা আসে। কিন্তু বাস্তব পরিবর্তনের চিত্র আজও অধরাই।
নীমতলী ট্র্যাজেডি (২০১০)
২০১০ সালের ৩ জুন রাত ৯টার দিকে পুরান ঢাকার চানখাঁরপুলের নিমতলীতে রাসায়নিক পদার্থের গুদামে বিস্ফোরণ থেকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ওই ঘটনায় নারী ও শিশুসহ ১২৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। সেদিন একটি বিয়ের আয়োজন চলছিল পাশের ভবনে। বৈদ্যুতিক ট্রান্সফর্মার বিস্ফোরণ থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে রাসায়নিক ভর্তি প্লাস্টিকের ড্রামে, মুহূর্তেই ভয়াবহ রূপ নেয় আগুন। পুড়ে যায় অন্তত ২৩টি বসতবাড়ি, দোকান ও কারখানা। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডি (২০১৯)
২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা এলাকায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে শুরু হয় আগুন। ওয়াহেদ ম্যানশনে মজুত কেমিক্যালের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গাড়ি, দোকান ও ভবনে।
মাত্র কয়েক ঘণ্টায় ওই আগুনে প্রাণ হারান ৭১ জন, আহত হন কয়েক শতাধিক মানুষ। ঘটনাস্থলে ১৪ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। কেমিক্যাল গুদাম ও যানজটকে ওই ভয়াবহতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এফআর টাওয়ার ট্র্যাজেডি (২০১৯)
চুড়িহাট্টার এক মাসের মাথায়, ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ দুপুরে বনানীর বাণিজ্যিক ভবন এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ২২তলা ভবনের অষ্টম তলা থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে উপরের তলায়। ভবনের ভেতরে আটকে পড়া অনেকেই জানালা ভেঙে বা রশি বেয়ে নামতে গিয়ে প্রাণ হারান। ওই ঘটনায় ২৭ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হন। তদন্তে ভবনের নকশায় ত্রুটি, অনুমোদন জটিলতা ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবকে দায়ী করা হয়।
বেইলি রোড ট্র্যাজেডি (২০২৪)
২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে বেইলি রোডের ‘গ্রিন কোজি কটেজ’ নামে বহুতল ভবনে ভয়াবহ আগুন লাগে। ভবনের প্রতিটি তলায় রেস্তোরাঁ থাকায় প্রচুর গ্যাস সিলিন্ডার মজুত ছিল। দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তেই ফাঁদে পড়েন ডজনখানেক মানুষ। ওই ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হন। দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা মান ও রেস্টুরেন্টে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়।
বঙ্গবাজার ট্র্যাজেডি (২০২৩)
২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল ভোরে রাজধানীর বঙ্গবাজারে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যায় আশপাশের চার-পাঁচটি মার্কেট। ব্যবসায়ীদের দাবি, আগুনে প্রায় পাঁচ হাজার দোকান ধ্বংস হয়েছে, ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা। তদন্তে দেখা যায়, সিগারেট বা কয়েলের আগুন থেকেই দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল। আগুনের তীব্রতায় মার্কেটের পুরোনো কাঠামো মুহূর্তেই ছাই হয়ে যায়।
তার আগে ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৩১৭টির মধ্যে ২১৭টি দোকান পুড়ে যায়। একই বছর এপ্রিলে নিউমার্কেটের নিউ সুপার মার্কেটেও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে কড়াইল বস্তি, মহাখালী সাততলা বস্তি ও ভাষানটেক বস্তিতেও অগ্নিকাণ্ডে শত শত নিম্ন আয়ের মানুষ সর্বস্ব হারান।