বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের জন্য কতটা চ্যালেঞ্জ হতে পারে  

বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের জন্য কতটা চ্যালেঞ্জ হতে পারে  

আজ ১৬ অক্টোবর। বিশ্ব খাদ্য দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে যখন দিনটি পালিত হচ্ছে তখন ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে খাদ্য গুদামের সংখ্যা এবং ধারণক্ষমতা অনেক কম। তাই খাদ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শক্তিশালী করতে মজুত ব্যবস্থা আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে দেশে। দীর্ঘমেয়াদে আধুনিকায়ন না হলে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামা বা বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের প্রভাব দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বাংলাদেশে আজ যখন এ দিবসটি পালিত হচ্ছে তখন চাল ও মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বাংলাদেশকে প্রকৃত ‘ভাতে-মাছে বাঙালি’ করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাংস ও সবজি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকারের অনুকূল নীতিমালা অনুসরণের ফলে বাংলাদেশ এখন দেশি চাহিদা পূরণ করে এসব পণ্য বিদেশে রফতানিরও প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এ বছর বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘উন্নত খাদ্য এবং উন্নত ভবিষ্যতের জন্য হাতে হাত রেখে’।

বাংলাদেশে প্রতিবছর মতো এবারও কৃষি মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) যৌথ উদ্যোগে দিবসটি পালনে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০তম সাধারণ সভায় হাঙ্গেরির তৎকালীন খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. প্যাল রোমানি বিশ্বব্যাপী এই দিনটি উদ্‌যাপনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৮১ সাল থেকে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিষ্ঠার দিনটিতে (১৬ অক্টোবর, ১৯৪৫) দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নিবৃত্তির লক্ষ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে এই দিনটি গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয়ে থাকে।

ক্ষুধা ও খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক সংস্থা গুরুত্ব-সহকারে দিনটি পালন করে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং কৃষি উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল তাদের মধ্যে অন্যতম।

উল্লেখ্য, ক্ষুধা মোকাবিলার প্রচেষ্টা, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় শান্তিতে অবদান, যুদ্ধ ও সংঘাতে অস্ত্র হিসেবে ক্ষুধার ব্যবহার বন্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার জন্য ‘বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি’ ২০২০ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের খাদ্য মজুত পরিস্থিতি চলতি বছরের আগস্টে অত্যন্ত সন্তোষজনক এবং ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। এর পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ৭৯ হাজার মেট্রিক টন। এই সময়ে চাল ও গমের মোট মজুত বেড়েছে, তবে চালের মজুতের তুলনায় গমের মজুত কম।

খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য (৮ অক্টোবর, ২০২৫) অনুযায়ী, দেশে এই মুহূর্তে মোট খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে ১৬ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন। ৪ অক্টোবর থেকে মা ইলিশ রক্ষায় ইলিশ ধরা বন্ধ থাকায় সরকারের তালিকাভুক্ত জেলেদের জন্য খাদ্য সহায়তা বাবদ ৪০ কেজি করে চাল দেওয়ার কার্যক্রম চলমান থাকায় খাদ্য মজুত কিছুটা কমেছে।

চলতি অর্থবছরের শুরুতে (১ জুলাই, ২০২৫) মোট মজুত ছিল ১৭ লাখ ৬৪ হাজার মেট্রিক টন, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩ লাখ টন বেশি। গত বছরের তুলনায় চালের মজুত বাড়লেও গমের মজুত কমেছে।

সূত্র জানিয়েছে, দেশের নাগরিকদের ৫টি মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাদ্য অন্যতম। এই খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ বর্তমান সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশ্বিক কর্মসূচি। আর জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অন্যতম লক্ষ্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

আমরা কী খাই, কীভাবে খাই, খাবারটা কোথা থেকে আসে, খাবারের মান কেমন, নিজেদের আয় এবং রুচি অনুযায়ী কী খেলে শরীর ভালো থাকবে- এগুলো আমাদের জীবনযাপনের অন্যতম চিন্তা। এই ভাবনার সিংহভাগই থাকে নিজেদের বা প্রিয়জনদের ঘিরে। তবে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের সমগ্র বিশ্বের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে ভাবনা জরুরি।

এ প্রসঙ্গে খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। চাল, শাকসবজি ও শস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। বর্তমানে এসব খাদ্যপণ্য রফতানিও করা হচ্ছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে খাদ্য রফতানি করতে সক্ষম হওয়া দেশের জন্য একটি বিশাল অর্জন।’

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএওর বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাধীনতা পরবর্তী ৫২ বছরে বাংলাদেশে প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে তিন থেকে পাঁচগুণ। ১২টি কৃষিপণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ পৃথিবীর শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে রয়েছে। এই সাফল্যের পাশাপাশি গত দশ বছরে কৃষির বড় ধরনের বিবর্তন সূচিত হচ্ছে। একসময় বড় বিনিয়োগমুখী শিল্প হিসেবে মানুষ গার্মেন্টস কারখানা স্থাপন করেছে। অন্যান্য শিল্পে বেশি লাভ খুঁজেছে। এখন সেই বিনিয়োগকারীরাই কৃষিতে বড় বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসছেন।

খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, বাংলাদেশ এখন প্রধান চার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। গত দশ বছরে চাল, মাছ, মাংস ও শাকসবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ অর্জন করেছে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মাছ উৎপাদনকারী দেশ।

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin